শনিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আনন্দময় সম্প্রীতির উৎসব

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২২, ০৭:৪১

ষষ্ঠীপুজোর আগের দিন অর্থাৎ শারদীয় উত্সব শুরুর প্রাক্কালে সুদূর কানাডা থেকে এক বন্ধু শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছেন। যাতে লিখেছেন ‘এবার পুজো কাটুক ভালো।’ কাটুক ভালো মানে! ভালো না কাটার আশঙ্কা আছে নাকি? আমি ঘরপোড়া গরু, তাই পুজো ভালো কাটবে কী কাটবে না এ নিয়ে প্রতি বছরই দুশ্চিন্তায় থাকি। গত বছর কুমিল্লা-নোয়াখালী-চাঁদপুর-চট্টগ্রামে দুর্বল স্ক্রিপ্টের নাটক সাজিয়ে শারদীয় উত্সবের আনন্দই কেবল নষ্ট করেনি, পূজারি, ভক্ত এবং সাধারণ মানুষকে পর্যন্ত হত্যা করেছে। প্রশাসন-আইন রক্ষাকারীদের দায়িত্বের কথা বাদ দিলাম, পাড়া-প্রতিবেশী, এলাকার মানুষ এগিয়ে আসেনি কেন? যারা গলা ফুলিয়ে নিজেদের পরিচয় দেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক, তারা কোথায় ছিলেন? যারা নিজেদের দাবি করেন ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ হিসেবে তারা! অসাম্প্রদায়িকতা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের সর্বোত্তম কবির জীবন দর্শন সম্পর্কে যাদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই তারা কেমন সৈনিক! ভাবলে কষ্ট লাগে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে!

আমার কানাডা প্রবাসী বন্ধু হয়তো সহজভাবেই পুজোর আনন্দ উপভোগ করার কথা বলেছেন। তবে আমি বা আমার মতো অন্যদের যদি শঙ্কায় ভ্রু কিছুটা কুঁচকেই যায় তাতে দোষ নেই। স্বাধীনতা অর্জনের পর প্রায় বায়ান্নটি বছর কেটে গেল। ‘নাদের আলী আমি আর কত বড় হব!’

লেখার শুরুতে নিজেকে ঘর পোড়া গরু বলেছি। জন্মেছি সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারে। পাকিস্তান আমলে বেড়ে উঠেছি এবং বড় হয়েছি। ছয়ের দশক জুড়ে শেখ মুজিবুর রহমানের মহা জাগরণী নেতৃত্ব স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছি। শারদীয় উত্সবের আনন্দ নষ্ট করতে গ্রামে-গঞ্জে প্রতি বছরই দু-একটা অঘটন ঘটত। নিকটবর্তী শহর থেকে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ মুহূর্তেই ছুটে যেতেন আক্রান্ত অঞ্চলে। একটু লায়েক হবার পর বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গী হয়ে অনেকবার আমিও গিয়েছি। শেখ মুজিবুর রহমানের অলিখিত নির্দেশ ছিল তার দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি। সেখানে রাজনীতির হিসাব কতটুকু ছিল জানি না, তবে তার চোখেমুখে স্পষ্ট প্রকাশ পেত জীবন নিঃসৃত অসাম্প্রদায়িক, মানবিক এক মৌলিক চেহারা। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের প্রতি শতভাগ বিশ্বাস ও আস্থা ছিল বলেই মহান মুক্তিযুদ্ধে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে জীবন বাজি রেখেছিলেন ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষ। আজ হূদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানিয়া এসব সত্যকে কেন যে বারবার উচ্চারণ করতে হয়! মাঝে মাঝে সুযোগ পেলেই হিংস্র বিষধর নাগিনিরা ছোবল মারতে চেয়েছে, ছিনিয়ে নিয়েছে সরলপ্রাণ, দেশভক্ত বহু আলোর পথযাত্রীকে। বুঝতে পারি, মরণ কামড় দেওয়ার জন্য দিনে দিনে মরিয়া হয়ে উঠেছে হিংস্র শ্বাপদের দল। আমার শত শত বছরের ঐতিহ্যিক সংস্কৃতি, আমার অহংকার প্রায়শই হুমকির মুখে পড়তে দেখে আমি মোটেই ঘাবড়াই না। জয় বাংলা বলে সম্মিলিতভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েই যাচ্ছি বছরের পর বছর।

এটা সবাই জানি যে, দুর্বৃত্তের ছলের অন্ত নেই। মহান মুক্তিযুদ্ধের পরপরই স্বাধীন বাংলাদেশে তারা সাম্প্রদায়িকতার আঘাত করার দুঃসাহস করেছে বঙ্গবন্ধুর জীবিতকালেই। গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে রাতের গভীরে অরক্ষিত মন্দির আক্রমণ করেছে, দুর্গার বিগ্রহ ভেঙেছে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত পাকিস্তানি অপশক্তির স্থানীয় দোসর, তথাকথিত শান্তি বিনষ্টকারী অতি বিপ্লবী এবং মুক্তিযুদ্ধ ফেরতদের সমন্বয়ে সদ্য গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দলের মিলিত অপকর্ম ছিল সে সব। বঙ্গবন্ধু এবং তার সরকার এবং আওয়ামী লীগকে বিবর্ণ করার জন্যই এসব অপকর্ম করা হতো।

কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির-বিগ্রহ ভাঙাই নয়, দুর্বৃত্তের দল ঈদের জামাতে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়েছে, পাটের গুদামে একের পর এক আগুন দিয়েছে, অতর্কিত আক্রমণে থানার অস্ত্র লুট করেছে, বেশ কয়েক জন সংসদ সদস্যকে হত্যা করেছে। এ সবই ছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সোনার বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে পরিণত করার ষড়যন্ত্র। কিন্তু নিজেরাই বারবার ব্যর্থ হয়ে অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে যেতে মরণ কামড় দেওয়ার জন্য অতর্কিতে ভেসে উঠে আজও দু-চারটা অঘটন ঘটায়। অঘটন ঘটানো সম্ভব হওয়ার পেছনে আমাদেরও দায় আছে না কি! আমাদের অসতর্কতার মুহূর্তগুলোকে ওরা কাজে লাগায়। আমরা তখন হতভম্ব হয়ে সদ্য ঘুম ভাঙা পরিস্থিতিতে চোখ কচলাই।

সুতরাং দুর্বল হিন্দু সম্প্রদায়ের শারদীয় উত্সব ব্যাহত ও বাধাগ্রস্ত করতে যারা বারবার সচেষ্ট হয় তাদের বিরুদ্ধে কামান দাগাবার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন ইতিহাসের শিক্ষায় সবাইকে সচেতন করা আর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আস্থাশীল থাকার আহ্বান জানানো। মনে রাখতে হবে যে শারদীর উত্সব বাঙালির কাছে চিরায়ত ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এক অনুপম প্রীতিময় আনন্দ উত্সব। এই উত্সবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণ, যাতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এই ভূমিতে নিজ নিজ ধর্ম নির্বিঘ্নে পালন করতে পারেন।

শারদীয় উত্সবের শান্তি বজায় রাখার দায়িত্ব কেবল সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নয়। এগিয়ে আসতে হবে শুভবোধসম্পন্ন বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাশ্রিত সব নাগরিককে। গড়ে তুলতে হবে নিজ নিজ এলাকায় অসাম্প্রদায়িক চেতনায় শানিত সাধারণ জনগণের সবল ঐক্য। ধর্মান্ধ, উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে আধুনিক মনস্ক সংস্কারমুক্ত নতুন প্রজন্মকে।

সবশেষে কামনা করি শারদ উত্সব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হোক।

লেখক: আহ্বায়ক, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন