শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ধৈর্য ধারণ ও সন্তুষ্টির বিকল্প নাই

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২২, ১২:৫৩

বিশ্ব-অর্থনীতির অবস্থা টালমাটাল। কবে নাগাদ এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটিবে তাহা বলা মুশকিল। করোনা মহামারির তীব্রতা যখন বাড়িয়া গিয়াছিল, তখন মানুষ দাঁতে দাঁত কামড়াইয়া ইহার অবসানের জন্য অপেক্ষা করিতেছিল; কিন্তু বিধি বাম। ইউক্রেন যুদ্ধ আসিয়া পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করিয়া দিল। রাশিয়া এমন একটি দেশে হামলা করিয়াছে যাহা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম শস্য রপ্তানিকারক দেশ হিসাবে পরিচিত। আবার আগ্রাসি রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র  ও সৌদি আরবের পরই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। ফলে যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে এক দিকে খাদ্য, অন্য দিকে জ্বালানিসংকটে বিশ্ব-অর্থনীতি পড়িল মহাবিপাকে। সেই মহাবিপদ আজো আমাদের পিছু ছাড়িতেছে না। বিশেষত জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাইবার কারণে পরিবহন খরচ বাড়িয়া গেল। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্য বৃদ্ধিতে দেশে দেশে দেখা দিল মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি বাড়াইয়া দিল বিভিন্ন দেশের দারিদ্র্য হার। এখন অনেকে বিশ্বমন্দার পদধ্বনি শোনা যাইতেছে বলিয়া মনে করেন। মন্দার হাত ধরিয়া আসিতে পারে দুর্ভিক্ষ, এই আশঙ্কাকেও উড়াইয়া দেওয়া যায় না। এই পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ আর অল্পে সন্তুষ্টির দাওয়া প্রদান ছাড়া আমাদের আর কি কোনো বিকল্প আছে?

অর্থনীতিবিদরা বলিতেছেন, বিশ্বের দেশে দেশে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করিতেছে এখন। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির কথা নাই-বা ধরিলাম, খোদ উন্নত দেশগুলি পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাইতেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার বাড়িয়া ৮ দশমিক ৬ শতাংশে উঠিয়াছে। যুক্তরাজ্যে ইহা ৯ শতাংশ। নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, কানাডা, সুইডেন, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি উন্নত দেশের অবস্থাও আশাব্যঞ্জক নহে। ধনী-গরিব দেশ নির্বিশেষে বিশ্ব জুড়িয়াই এখন মূল্যস্ফীতির চাপ ক্রমবর্ধমান। ভোক্তা ও সাধারণ মানুষ এখন স্যান্ডউইচের মতো চিড়াচ্যাপটা হইবার জোগাড়। এশিয়ায় ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ প্রায় সকল অঞ্চলেই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়াছে, চলতি বৎসরে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়িয়া ৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াইবে। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দৈনন্দিন জীবনের ব্যয়নির্বাহ করা কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। এইভাবে বিশ্বের দিকে তাকাইলে আমরা দেখিতে পাই, প্রত্যেক দেশেই কম আর বেশি সমস্যা রহিয়াছে। সেই তুলনায় আমরা খারাপ আছি-এমনটি বলিবার সময় এখনো আসে নাই। আমরা কত দিন এই অবস্থায় থাকিব তাহার কোনো নিশ্চয়তা নাই বটে। তবে এই মুহূর্তে ধৈর্য ও অল্পে সন্তুষ্টির মহৎ গুণ অর্জন করিতে পারিলে আমরা আরো কিছুটা ভালো থাকিব। এই ঘটনাটা আমাদের অজানা নহে-এক পা হারা এক ব্যক্তি তাহার দুর্গতির জন্য সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করিতেছিল; কিন্তু যখন সেই রাস্তায় বাহির হইয়া দেখিল একজনের দুই পা-ই নাই, তখন সে নিজেকে প্রবোধ দিল এই বলিয়া যে, সে অন্তত তাহার তুলনায় ভালো রহিয়াছে। আমাদের এখন সেই ব্যক্তির ন্যায় ধৈর্যশীল হইতে হইবে।

পরাশক্তিগুলি পৃথিবীকে লইয়া নিত্যদিন ছিনিমিনি খেলিতেছে। পৃথিবীবাসীকে তাহারা করিয়া ফেলিয়াছে জিম্মি। এই জিম্মিদশার অবসান না হওয়া পর্যন্ত আমাদের ধৈর্য ধারণের কোনো বিকল্প নাই। ব্যয়সংকোচন নীতি অবলম্বনের পাশাপাশি এই দুঃখকষ্টের মধ্যেই একধরনের আÍতুষ্টি লাভ করিতে হইবে এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ থাকিতে হইবে। ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী হইল-নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সহিতই থাকেন। ইহা ছাড়া যে ব্যক্তি অল্পে তুষ্ট, সেই ব্যক্তিই সফল। এই দুইটি গুণে গুণান্বিত না হইলে পৃথিবীর বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমাদের হতাশাগ্রস্ত, অস্থির ও উম্মাদ হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকিবে বলিয়া প্রতীয়মান হয় না।

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন