রোববার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নৌ-দুর্ঘটনা ও নৌপথের শৃঙ্খলা

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২২, ০৩:৩৭

সম্প্রতি করতোয়ায় নৌ-দুর্ঘটনায় প্রায় শত লোকের মৃত্যু ঘটেছে। এ ঘটনা আমরা এখন ভুলতে বসেছি। এভাবেই এক-একটা দুর্ঘটনা ঘটে, কয়েক দিনের জন্য আমাদের টনক নড়ে। তারপর আবার সবকিছু আগের মতো হয়ে যায়। এ নিয়ে আর কারো থাকে না কোনো মাথাব্যথা। তবে যাদের জীবন চলে যায়, তাদের পরিবার-পরিজনকে দায় বহন করতে হয় জীবনভর।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌ-দুর্ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। নৌ-দুর্ঘটনায় প্রতি বছরই অনেক মানুষ আহত, নিহত ও নিখোঁজ হচ্ছেন। এ দেশে বড় ধরনের নৌ-দুর্ঘটনা ঘটলে কিছুদিন হৈচৈ হয়, গণমাধ্যমগুলোও এ নিয়ে কিছুদিন সরগরম থাকে। আর এ জাতীয় নৌ-দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যথারীতি গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। নৌ-দুর্ঘটনার কিছুদিন পরে দেশে যদি অন্য কোনো বড় ধরনের ঘটনা বা সহিংসতা অথবা অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তখন স্বাভাবিকভাবেই চাপা পড়ে যায় ঐ নৌ-দুর্ঘটনার বিষয়। পরবর্তী সময়ে আর কেউ জানতে পারে না ঐ নৌ-দুর্ঘটনার পেছনে দায়ী ব্যক্তি কে অথবা দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা। বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ধরনের নৌ-দুর্ঘটনা ঘটে চললেও নৌ-দুর্ঘটনা রোধে এখন পর্যন্ত তেমন একটা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, চালকদের অশুভ প্রতিযোগিতা, নৌপথে বিরাজমান নৈরাজ্য দূর না করা, নৌযান চালকদের দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা, অদক্ষতা, ফিটনেসবিহীন নৌযান চলাচল করার ‘সুযোগ’ পাওয়াসহ বিভিন্ন নৌযানে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করাই হচ্ছে এসব নৌ-দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে এসব অনিয়ম দেখভাল করার দায়িত্ব কার এবং রুট পারমিট ছাড়া কীভাবে দেশে প্রায় ১ হাজার স্পিডবোট চলাচল করছে? এক জরিপে দেখা গেছে, ১৯৯৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ছোটবড় প্রায় হাজারখানেক নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছে। আর প্রাণ গেছে প্রায় আড়াই হাজার। কতজন নিখোঁজ হয়েছেন তার কোনো হিসাব নেই। আহত হয়েছেন অনেকে। দেশে বর্তমানে যেসব নৌপথ রয়েছে, তার বেশির ভাগই অরক্ষিত। এসব নৌপথে বৈধভাবে প্রায় ৩ হাজার ছোটবড় লঞ্চ, জাহাজ চললেও স্পিডবোটসহ অনুমোদনহীনভাবে চলছে কয়েক গুণ নৌযান। তাছাড়া নৌপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যতসংখ্যক নৌ-পুলিশ থাকা প্রয়োজন, তা নেই। এসব নৌ-পুলিশকে বিআইডব্লিউটিএয়ের কিছু সার্ভে জাহাজ ও স্পিডবোট দেওয়া হলেও এসব নৌযানে নৌপথের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন আধুনিক যান। অনেক সময় দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা আটক বা গ্রেফতার হলেও শেষ পর্যন্ত টাকার জোরে বা প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে অথবা নানা কৌশলে ছাড় পেয়ে যায়, যা দুঃখজনক। নৌ-দুর্ঘটনায় স্বজন হারানোদের বুকফাটা আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তি খুব একটা হয় না। নৌ-দুর্ঘটনার জন্য দায়ী স্পিডবোট মালিক বা লঞ্চ মালিক কিংবা মাস্টারদের বিরুদ্ধে মামলা হয় নৌ-আদালতে। বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ (আইএসও-১৯৭৬) অনুযায়ী, রাষ্ট্রপক্ষ দোষী ব্যক্তিদের বিষয়ে শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারে না। মামলাগুলো দীর্ঘদিন চলার পর নিষ্পত্তি হলেও দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে এমন নজির নেই বললেই চলে। তাছাড়া দুর্ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরাসরি নৌ-আদালতে মামলা করতে পারেন না। তাকে সংশ্লিষ্ট এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে মামলা করতে হয়। ফলে দায়ী কেউই শেষ পর্যন্ত শাস্তি পায় না।

বিদ্যমান আইনে লঞ্চ মালিক ও চালকদের শাস্তির যে বিধান আছে, তা কার্যকর করা খুবই কঠিন। তাছাড়া এ আইনের ফাঁকফোঁকরও অনেক বেশি। বাস্তবতা বিবেচনায় বিদ্যমান আইনটির এখন উপযুক্ত পরিবর্তন বা সংশোধন হওয়া অত্যাবশ্যক। দেশের নৌপথে লঞ্চ দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন ধরনের নৌ-দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিয়মিতভাবে সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রচারসহ নদীবন্দর-টার্মিনালে মেগাফোনের মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক প্রচার চালানো জরুরি। পাশাপাশি অতিরিক্ত যাত্রীবহন রোধ করা, স্পিডবোটে বা লঞ্চে জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামাদিসহ সার্ভে সনদ অনুযায়ী মাস্টার ও ড্রাইভার যথাযথভাবে আছে কিনা তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোনো স্পিডবোট বা লঞ্চ বা অন্য কোনো নৌ-যান অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করলে এবং ঐ নৌ-যানগুলোয় জীবনরক্ষাকারী পর্যাপ্ত সরঞ্জামাদি না থাকলে ঐ নৌ-যানগুলোর যাত্রা স্থগিত করাসহ সংশ্লিষ্ট নৌ-আদালতে মামলা করা আবশ্যক। আর নৌ-দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে লঞ্চসহ বিভিন্ন নৌযানের ফিটনেস পরীক্ষাপূর্বক ফিসনেসসংবলিত নৌযানগুলোতে দক্ষ, সত্ ও দায়িত্ববান চালক নিযুক্ত করা অত্যাবশ্যক। সেই সঙ্গে চলাচলকারী নৌযানে কর্মরত মাস্টার, ড্রাইভার, সুকানি ও আনসারদের জন্য নিয়মিতভাবে নদীবন্দরগুলোতে নৌ-নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কর্মশালার আয়োজন করাও প্রয়োজন। দরকার দেশের বিভিন্ন নৌ-পথে নিরাপদে চলাচলের স্বার্থে পর্যাপ্ত পরিমাণে আধুনিক নৌ-সহায়ক যন্ত্রপাতি স্থাপন। পাশাপাশি নৌপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজন পর্যাপ্তসংখ্যক সত্, মেধাবী ও দক্ষ নৌ-পুলিশ। এসবের পাশাপাশি ঈদসহ বিভিন্ন ছুটি ও উত্সবের সময়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন পরিহারের লক্ষ্যে বিশেষ নৌ-যান, যেমন—স্পেশাল লঞ্চ সার্ভিসের সুব্যবস্থা করা যেতে পারে।

কোথাও স্পিডবোট বা লঞ্চডুবি বা অন্য কোনো নৌযানডুবির ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধারাভিযানের লক্ষ্যে প্রয়োজন আধুনিক জাহাজ, উদ্ধারকারী স্পিডবোট, হেলিকপ্টার। এসব পদক্ষেপ ছাড়া দেশের বিশাল নৌপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সেই সঙ্গে সঠিক নকশা অনুযায়ী লঞ্চ নির্মাণ করা হচ্ছে কিনা, নৌযান বা লঞ্চের ফিটনেস ঠিক আছে কিনা নিয়মিতভাবে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে তদারকি করাও আবশ্যক। সর্বোপরি যাত্রীদেরও সতর্ক হতে হবে, তাদের জীবনের মূল্য বুঝতে হবে। যাত্রীদের সর্বদা স্মরণে রাখা প্রয়োজন, তারা যেন কখনোই স্পিডবোটের বা লঞ্চের বা অন্য কোনো নৌযানে অতিরিক্ত যাত্রী হিসাবে না ওঠেন। সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিক প্রচেষ্টায় উপরোক্ত বিষয়গুলো সুনিশ্চিত করা সম্ভব হলে দেশে নৌ-দুর্ঘটনা নিশ্চয়ই অনেকাংশে কমে আসবে। নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ।

লেখক :বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কো. লি.

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন