রোববার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উন্মাদনার লাগাম টানতে হবে

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২২, ০৫:২১

উত্তর কোরিয়া দেশটির এযাবত্কালের সবচেয়ে বড় আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের (আইসিবিএম) পরীক্ষা চালিয়েছে। আইসিবিএম এমন এক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, যা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম। যদিও আইসিবিএমের পরীক্ষা চালানো উত্তর কোরিয়ার জন্য নিষিদ্ধ, তবু ২০১৭ সালের পর এই প্রথম নিষিদ্ধ আইসিবিএমের পরীক্ষা চালাল উত্তর কোরিয়া।

প্রতিবেশী দেশের মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে এমন দাবি ও ক্ষোভের মধ্যেই উত্তর কোরিয়ার উেক্ষপিত ব্যালিস্টিক মিসাইল ‘হোয়াসং-১৭’ জাপানের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে পড়েছে বলে বলা হচ্ছে। এর ফলে ‘জে-অ্যালার্ট (স্যাটেলাইটভিত্তিক এমন একটি সিস্টেম, যা সরাসরি লাউড স্পিকারের মাধ্যমে সতর্কবার্তা দেয়)’ মিসাইল অ্যালার্মের তীব্র শব্দে প্রকম্পিত হয় চারপাশ। জাপানের উত্তরে হোক্কাইডো দ্বীপ এবং আওমোরি শহরের বাসিন্দাদের ঘুম ভাঙে সাইরেনের প্রচণ্ড আওয়াজ শুনে। স্বভাবতই উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে, এলামেলো হয়ে যায় মানুষের দৈনন্দিন শান্তিপূর্ণ সকালের রুটিন। আতঙ্কিত জনগণ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। জনসাধারণের মোবাইল ফোনে টেক্সট মেসেজ পাঠায় কর্তৃপক্ষ, যাতে বলা হয়, ‘উত্তর কোরিয়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে মনে হচ্ছে। আপনারা দয়া করে বিভিন্ন ভবনে বা ভূগর্ভে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান।’ আকাশের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ খসে পড়ে ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে বলে লোকজনকে সতর্ক করে দেওয়া হয়।

প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের (ইইজেড) কাছাকাছি পড়ার আগে ক্ষেপণাস্ত্রটি জাপানের সরকারি দপ্তর আওমোরি প্রিফেকচারের কাছাকাছি একটি অঞ্চলের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। মিসাইলটি আনুমানিক ৪ হাজার ৬০০ কিলোমিটার পাল্লার ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা সম্ভবত উত্তর কোরিয়ার পরীক্ষামূলকভাবে উেক্ষপণ করা ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘতম দূরত্ব অতিক্রমকারী। ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছেছিল, যা উত্তর কোরিয়া থেকে ছোড়া কোনো ক্ষেপণাস্ত্রের স্মরণকালের সর্বোচ্চ।

ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের পর সৌভাগ্যবশত কোনো ধ্বংস বা ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি। জাহাজ কিংবা বিমানের ক্ষতি হয়েছে এমন কোনো খবরও পাওয়া যায়নি। তবে যেহেতু পিয়ংইয়ং থেকে পূর্ব সতর্কতা জারি ছাড়াই এরূপ বড় পরীক্ষা চালানো হয়েছে, কাজেই এর ফলাফল খারাপ পরিস্থিতি ডেকে আনলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওলের অভিষেকের পর থেকে সিউল, ওয়াশিংটন ও টোকিও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ইউন সুক-ইওলের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা হয়েছে, যিনি পিয়ংইয়ংকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেন। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাকে সাম্প্রতিক মার্কিন-দক্ষিণ কোরিয়া এবং মার্কিন-দক্ষিণ কোরিয়া-জাপানের যৌথ সামরিক মহড়ার বিপরীতে পালটা জবাব বলে মনে করা যেতে পারে। এটি নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।

সত্যিকার অর্থেই সাম্প্রতিক সময়ে পিয়ংইয়ং ক্ষেপণাস্ত্রের তোড়জোড় শুরু করেছে। যদিও আগের সবগুলোই স্বল্পপাল্লার ছিল, কিন্তু বর্তমানে ক্ষেপণাস্ত্র বহরে ট্র্যাজেক্টোরি-শিফটিং টাইপ (গতিপথ পরিবর্তনে সক্ষম) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে শত্রুর চোখে ধুলো দেওয়া সহজ, যা ট্র্যাকিং (শনাক্ত) এবং ইন্টারসেপশনকে (প্রতিরোধ বা ধ্বংস) কঠিন করে তুলতে সক্ষম। এসব বিষয় প্রত্যক্ষ করে মনে হচ্ছে, সামনে আরো পারমাণবিক পরীক্ষা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে উত্তর কোরিয়া।

২০১৭ সালের পর আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা স্থগিত রেখেছিল উত্তর কোরিয়া। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার উচ্চপর্যায়ের একাধিক কূটনৈতিক বৈঠককে কেন্দ্র করে ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা বন্ধ রাখে পিয়ংইয়ং। সেই সময় থেকেই পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষাও বন্ধ রাখে দেশটি। তবে ২০১৯ সালে এক মাসে সর্বোচ্চসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায় দেশটি। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলোচনা ভেস্তে গেলে মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পথ বেছে নেয় পিয়ংইয়ং। ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার কারণ হিসেবে সে সময় দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতাপূর্ণ নীতিকে দায়ী করেছিল। এরই ধারবাহিকতায় চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সাত বার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালান কিম। এক মাসে সর্বোচ্চসংখ্যক বার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানোর ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি উল্লেখযোগ্য নজির। সর্বশেষ ছোড়া মিসাইল ‘হোয়াসং-১৭’ ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত এক সামরিক কুচকাওয়াজে প্রথম প্রদর্শন করা হয়। ক্ষেপণাস্ত্রটি এতটাই ‘অতিকায়’ আকৃতির যে, তা দেশটির অস্ত্র বিশ্লেষকদের পর্যন্ত বিস্মিত করেছিল।

উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণের এবারের ঘটনাটি পাঁচ বছর আগে প্রথমবারের মতো জাপানের ওপর দিয়ে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা মনে করিয়ে দেয়। ভুলে গেলে চলবে না, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পিয়ংইয়ং এর আগে বারবার ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণ করেছে। এমনকি পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে বহুবার। মিসাইল পরীক্ষার এ ধরনের ইচ্ছাকৃত পুনরাবৃত্তি কিংবা পারমাণবিক বাড়াবাড়িকে ক্ষমা করা যায় না কোনো যুক্তিতেই। পিয়ংইয়ংয়ের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণ ও পারমাণবিক পরীক্ষা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কাজেই এই অপতত্পরতা বন্ধে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সৃষ্ট বিভক্তি উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বিকাশ ত্বরান্বিত করতে সুযোগ করে দিচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন দীর্ঘমেয়াদি নীতি হিসেবে অস্ত্র বিস্তারের পথে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে নিজের অভিলাষের কথা উচ্চারণ করেছেন বহুবার। গত মাসে এক বক্তৃতায় কিম ঘোষণা করেছিলেন, কোনো শর্তেই এবং কখনোই তিনি পারমাণবিক কর্মসূচির পথ থেকে সরে আসবেন না। কিম এরূপ একগুঁয়ে-উগ্র কথা বলার সাহস পেয়েছিলেন সম্ভবত এটা অনুমান করে যে, তিনি বড়সড় ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা পারমাণবিক পরীক্ষা চালালে উত্তর কোরিয়ার ওপর যেসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে, তার প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া ও চীন, যারা পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সংঘর্ষে আবদ্ধ, উত্তর কোরিয়ার পাশে থাকবে এবং নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করবে।

এমতাবস্থায় কিমের পরিকল্পনা ও অনুমানকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করতে এবং অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি এড়ানোর স্বার্থে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সহযোগিতায় দৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকা। পিয়ংইয়ংয়ের ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের প্রশ্নে তিনটি দেশেরই যথেষ্ট শক্তিমত্তা ও সুযোগ রয়েছে। কাজেই আশা করা অমূলক হবে না যে, দেশগুলো নিজেদের মধ্যে ব্যাপকভাবে তথ্য আদান-প্রদান করবে এবং বেসামরিক নাগরিকদের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে।

এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, কঠোর পদক্ষেপসমূহ যেমন—নিষেধাজ্ঞা এবং যৌথ সামরিক মহড়ার মতো বিষয়গুলো আরো বেশি জোরদার করার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়াকে কোণঠাসা করে তাকে তার পথ থেকে সরাতে কিংবা নিজেকে সংশোধনে বাধ্য করতে যে ধরনের কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক, তার কোনোটাই করা হয় হয়নি। পিয়ংইয়ংয়ের উসকানি ও আঘাত মোকাবিলা করার জন্য শত্রুর ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যাপারে স্বভাবসুলভ হালকা আহ্বান জানানো হয়েছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার তরফ থেকে। কিন্তু সত্যি বলতে, শুধু এগুলোই পর্যাপ্ত নয়; আরো ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে ভাবতে হবে। খুব ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে সমাধান বের করতে হবে।

অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে সামনের দিনগুলোতে। কাজেই আগেভাগেই যা করার করতে হবে। এটা যে রাশিয়া ও চীনের জন্যও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে, তা দেশ দুটিকে বোঝাতে হবে। উত্তর কোরিয়ার এই উগ্র-অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড রাশিয়া ও চীনের জাতীয় স্বার্থের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে না কোনোভাবেই—পুতিন ও শির উচিত হবে এই সত্য অনুধাবন করা। সর্বোপরি, পিয়ংইয়ংকে বিশ্বনেতৃত্বের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করতে উত্সাহিত করার জন্য কার্যকর হিসেবে পরিগণিত ‘ক্যারট-অ্যান্ড-স্টিক পলিসি (কথা শুনলে পুরস্কার, না শুনলে শাস্তি)’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর জোর দিতে হবে।

জাপান থেকে প্রকাশিত ও বিশ্বের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য আসাহি শিম্বুন’-এর সম্পাদকীয়

ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: সুমৃত্ খান সুজন

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন