মুক্ত বিশ্বই-বা কতটা মুক্ত

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২২, ০৬:১৩

স্যামুয়েল হান্টিংটন তাহার ‘ক্লাস অব সিভিলাইজেশন অ্যান্ড দি রিম্যাকিং অব ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ গ্রন্থের দ্বিতীয় অংশে লিখিয়াছেন, The balance of power among civilizations are shifting. তিনি লিখিয়াছেন, পশ্চিমা বিশ্ব তাহার প্রভাব হারাইতেছে, অপর দিকে এশিয়ার দেশগুলি তাহাদের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি সম্প্রসারণ করিতেছে। সুতরাং বিশ্বে একটি নূতন ওয়ার্ল্ড অর্ডারের দিকে যাইতেছে। 

১৯৯৬ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের ভবিষ্যদ্বাণী ফলিতে অধিক সময় অপেক্ষা করিতে হয় নাই। বিশ্ব এখন সত্যিই নূতন ওয়ার্ল্ড অর্ডারের অধীন। আজ বিশ্ব এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন যাহা তিন-চার দশক পূর্বেও কেহ ভাবে নাই। তখন লৌহ পর্দায় আবৃত দেশগুলির অভ্যন্তরীণ সংবাদ কিছু পাওয়া যাইত না, কে মরিল কে বাঁচিল তাহাও তুচ্ছ বিষয় ছিল, যাহা বহির্বিশ্ব হইতে স্পষ্ট জানা যাইত না; কিন্তু মুক্ত বিশ্বে তখন সকল ধরনের মতামত গ্রহণ করা হইত ‘তোমার কথার সহিত আমি একমত না-ও হইতে পারি; কিন্তু তোমার বলিবার অধিকারের জন্য আমি জীবন বাজি রাখিব’—এই মানসিকতায়। আজ বিশেষ করিয়া রাষ্ট্র পরিচালনায় কোথাও এই চর্চা দেখিতে পাওয়া যায় না। ১৯৯২ সালের ৩ জানুয়ারি রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার কিছু বুদ্ধিজীবী বসিয়াছিলেন কনফারেন্সে। তাহার দুই সপ্তাহ পূর্বে লেনিনের মূর্তি ভাঙিয়া ফেলা হইয়াছে। যুক্তরাষ্ট্রের একজন বুদ্ধিজীবী দেখিলেন, লেনিনের পতাকা যেইখানে ছিল, সেইখানে তখনও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতাকা ঝুলিতেছে। তিনি রাশিয়ার একজন কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করায় ঐ কর্মকর্তা বলিলেন, এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করিতেছি। রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের শাসন শুরু হইবার পর হইতে ঐ পতাকার মতোই লৌহ পর্দার শাসন ঝুলিয়া আছে বলিয়া মুক্ত বিশ্ব মনে করিয়া থাকে; কিন্তু তাহাদের পর্দাও যে দিনে দিনে কঠিন হইয়া চলিয়াছে!

বিশ্ব পরিস্থিতি দ্রুতই পালটাইয়াছে। আজ মুক্ত বিশ্বও কতটা মুক্ত রহিয়াছে তাহা প্রশ্নের সম্মুখীন। সন্ত্রাস দমনের কারণেই হউক, নিজেদের নীতিকে উচ্চ শিখরে রাখিবার জন্যই হউক, আর নিরাপত্তার প্রশ্নেই হউক—মুক্ত বিশ্বের কোথাও এখন সেই মুক্তি নাই। এই মুক্ত বিশ্বের সহিত ‘লৌহ পর্দার অন্তরালে’ থাকা দেশগুলির প্রার্থক্য দিনে দিনে কমিয়া আসিতেছে। 

তবে ইহাও সত্যি, মুক্ত বিশ্বে আজ যেই ধরনের ঘটনাবলি দেখা যাইতেছে, তাহা পূর্বে কখনো দেখা যায় নাই। আমরা গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসাবে বিবেচিত হোয়াইট হাউজকেও আক্রান্ত হইতে দেখিয়াছি; কিন্তু তাহার পরও বলিতে হইবে, যে মুক্ত বিশ্ব সংকুচিত হইয়াছে। ১৯৯৪ সালে কসোভোর রাজধানী সারায়েভোতে জাতিসংঘ বা অন্য কাহারো পতাকা লইয়া মিছিল করার বদলে জনতা সৌদি আরব ও তুরস্কের পতাকা লইয়া মিছিল করিয়া দাবি করে, ইহারাই আমাদের প্রকৃত বন্ধু; ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ৭০ হাজার মানুষ মেক্সিকোর পতাকা হাতে লইয়া মিছিলে নামিয়াছে আমেরিকার আর্টিকেল ১৮৭-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাইয়া। তাহাতে কাহারো রাষ্ট্রদ্রোহিতার মুখোমুখি হইতে হয় নাই। 

আজকের দিনে ইহা একটি মুক্ত দেশে কতটা সম্ভব তাহা ভাবিয়া দেখিতে হইবে। অন্য দিকে যাহাদেরকে বন্ধ পৃথিবী বলা হয় তাহারাও অনেকটাই মুষ্টি শিথিল করিয়া চলিয়াছে। চীন তাহার বাজার উন্মুক্ত করিবার পাশাপাশি প্রবেশদ্বারও মুক্ত করিয়াছে। অবাধে মানুষ চীন ভ্রমণ করিতে পারিতেছে। অথচ মানুষের জন্য কঠিন হইতেছে সেই সকল দেশ, যাহাদের দরোজা অবাধ হইবার কথা ছিল। একসময় ভিসা ফ্রি মুভমেন্ট, রাইট টু মুভমেন্ট, ফ্রিডম অব মুভমেন্ট এমনকি নো বর্ডার মুভমেন্টও শুরু হইয়াছিল। এই সকল আন্দোলনের দ্বার এখন পুরাপুরি বন্ধ হইয়া গিয়াছে। সুতরাং মুক্ত বিশ্বও কতটা মুক্ত তাহা এখন প্রশ্নের সম্মুখীন।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন