আমাদের যাত্রা হোক আলোকিত পথে

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২২, ০৩:৩২

বাঙালির জীবনে আনন্দোপলক্ষ্য খুব বেশি নেই। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে নারীরা যে অবিস্মরণীয় জয় নিয়ে এলো, সেটি বড় আনন্দের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। প্রায় ১৮ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ছাদখোলা বাস প্রস্তুত করা হয়েছিল তাদের জন্য। এই বাসে চড়ে বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন পর্যন্ত যেতে সময় লেগেছে চার ঘণ্টারও বেশি।

আবালবৃদ্ধবনিতা রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে সাবিনা-সানজিদা-কৃষ্ণাদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এই আনন্দ ছড়িয়ে যায় সবখানে। সারা দেশ যেন উচ্ছ্বাসে ভাসে। বলা যায়, এদিন থেকে ফুটবল আবার নতুন করে কথা বলা শুরু করেছে।

সাবিনাদের এই জয় হঠাত্ করে আসেনি। তারা দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অনুশীলন করে আর বিভিন্ন পর্যায়ে খেলে গোটা টিমটি একটি পরিবারে রূপ নেয়। দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে তারা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাফল্য দেখায়। 

সমাজের চোখরাঙানি, টিপ্পনী, বাঁকা চাহনিকে উপেক্ষা করে এগিয়ে গেছেন তারা। দারিদ্র্যের কশাঘাতও দমাতে পারেনি তাদের। কলসিন্দুর গ্রামে ফুটবলের সঙ্গে এদের অনেকেরই ভোর হয়েছে। নারী ফুটবলের সেই আঁতুড়ঘর থেকেই জন্ম নিয়েছে এক-একটি অগ্নস্ফুিলিঙ্গ।

সাফ জয়ে আমরা যে আনন্দে ভাসছি, তা যেন বুদ্বুদের মতো মিলিয়ে না যায়। জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। পাইপলাইনে তৈরি করতে হবে আরো খেলোয়াড়। বিশেষ করে, স্কুল পর্যায় থেকেই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। শারীরিক সুস্থতা এবং মানসিক বিকাশের জন্যও তা অত্যন্ত জরুরি।

খেলার মাঠেরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। যেসব মাঠ রয়েছে সেগুলোও দিনদিন বেদখলে চলে যাচ্ছে। খোদ রাজধানীতেই নেই খেলার মাঠ। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য মাঠ থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। 

নারী ফুটবল দল ইতিহাসগড়া জয় পাওয়ার পর নারীর আর্থসামাজিক অবস্থানের বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে। শুধু খেলাধুলা নয়, বাংলাদেশ নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় অনেকটাই এগিয়ে, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার নারী, বিরোধীদলীয় নেত্রী নারী, সে দেশে নারীর অবস্থান কী, তা সহজেই অনুমেয়। এছাড়া সমাজের সব পেশার ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে প্রশাসন, বিচার বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিভিন্ন কারিগরিতেও নারী উচ্চপদে আসীন রয়েছে।

সত্যি বলতে কি, বর্তমান বিশ্বে নারী-পুরুষ এভাবে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কবির ভাষায়, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী,/ অর্ধেক তার নর’—এই কবিতার মর্মার্থ এই সময়ে আরো প্রাসঙ্গিক। বর্তমান বাস্তবতায় নারী-পুরুষ সমতার  বাংলাদেশ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। সমাজ পরিবর্তনের প্রতিনিধি হিসেবে নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি, শিক্ষাসহ তাদের ক্ষমতায়নে একসঙ্গে কাজ করাই হবে কর্তব্য।

প্রতিটি উপজেলা পরিষদে একজন নির্বাচিত নারী ভাইস চেয়ারম্যানের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তৃণমূল পর্যায়ে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ৩৩ শতাংশ আসন নারীর জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। একজন ইউপি সদস্যও রাখা হয়েছে সংরক্ষিত। এছাড়া সংসদেও সংরক্ষিত আসনে নারীরা নির্বাচিত হচ্ছেন। নারীর স্বাস্থ্য রক্ষায়ও নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। তবে বাংলাদেশ তো বটেই, বিশ্বব্যাপী এখনো নারীর অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত নয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রেই রয়েছে নানা বৈষম্য। এ বৈষম্য কমিয়ে এনে নারী-পুরুষের সমতার বিশ্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, নারী-পুরুষের সমতার বিশ্ব ছাড়া কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধি অসম্ভব। এজন্য সবার আগে পরিবর্তন আনতে হবে মানসিকতায়।

বাল্যবিবাহ নারীর অগ্রযাত্রার পথে বিরাট অন্তরায়। এটা খুবই দুঃখজনক যে, সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগের পরও বাল্যবিবাহ বন্ধ হচ্ছে না। আইন অনুযায়ী পুরুষের বিয়ের বয়স ২১ ও নারীর ১৮। ব্যতিক্রম হলে বিয়ের সঙ্গে জড়িত বর-কনের অভিভাবক, আত্মীয়, স্থানীয় কাজিসহ সবার শাস্তির বিধান রয়েছে। বর ও কনে দুই জন নাবালক হলে তাদের কোনো শাস্তি হবে না। বর সাবালক ও কনে নাবালিকা হলে ছেলের এক মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ১ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

নানা ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হবে—এমন স্বপ্ন দেখছি আমরা। সেটা করতে হলে প্রতিবন্ধকতাগুলি দূর করতে হবে সর্বাগ্রে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও মানসিকতার পরিবর্তনও অত্যন্ত জরুরি।

প্রতি বছর নারী দিবসে তাদের অধিকার নিয়ে সভা-সেমিনারে নানা কথা উচ্চারিত হয়। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত নারীর শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না যাবে, ততক্ষণ নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে না। উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হলেও লিঙ্গসমতা অত্যন্ত জরুরি। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাকে পশ্চাতে রেখে কোনোভাবেই দেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারে না।

সংবিধানে পুরুষ-নারী সমান অধিকার। কাউকে ছোট বা কাউকে বড় করে দেখা হয়নি। সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। প্রতিটি ক্ষেত্রে সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার নিশ্চিত করা গেলে নারীর অধিকারও প্রতিষ্ঠা পাবে। তখন আর আলাদা করে নারীর অধিকারের কথা বলতে হবে না। আমাদের যাত্রা হোক সেই আলোকিত পথে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট

 
ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন