জয়নগর ইউনিয়নের বড় সমস্যা নদীভাঙন 

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২২, ০৪:৩৪

জয়নগর ইউনিয়ন বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার নদীভাঙনকবলিত একটি প্রান্তিক জনপদ। বরিশাল জেলার উত্তর-পূর্ব প্রান্তের দুটি উপজেলা হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ। সর্বগ্রাসী রাক্ষুসী মেঘনা অববাহিকার নিম্ন প্রবাহ হিজলা ক্রসে দু ভাগ হয়ে এক ভাগ মেহেন্দীগঞ্জের পূর্বপাশ ঘেঁষে উলানিয়া-চানপুর হয়ে ভোলার দিকে চলে গেছে। 

মেঘনার স্রোতধারার আরেক ভাগ লালখারাবাদ হয়ে জয়নগর-দড়িচর খাজুরিয়া ইউনিয়ন দুটির পূর্বপাশ ঘেঁষে পশ্চিম দিকে আছড়ে পড়েছে। গজারিয়া নদী নামে পরিচিত লোয়ার মেঘনার এই বিশাল স্রোতধারা একটি হাড়িয়া বা খালের মতো ছিল। সেই খাল বা হাড়িয়া ভাঙতে ভাঙতে পশ্চিমে প্রায় ৩-৪ কিলোমিটার নদীগর্ভে পরিণত হয়েছে। এতে বিলীন হয়ে গেছে নলবুনিয়া, শরীফের চর, চুনারচর এবং দড়িচর খাজুরিয়া ইউনিয়নের সিংহভাগ। একসময় নলবুনিয়া বন্দর ছিল পাতারহাট বন্দরের মতো নৌপথে ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম আকর্ষণ। এগুলো এখন ইতিহাস। এবার দুঃখের কথা বলি। বর্ষাকালে উজান থেকে ধেয়ে আসা বানে মেঘনা যখন ভয়ংকর হয়ে ওঠে, তখন মেহেন্দীগঞ্জের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনপদের একটি এই জয়নগর ইউনিয়ন। নদীর উন্মুক্ত কূল  প্ল­াবিত হয়ে স্রোতধারা আছড়ে পড়ে এই অরক্ষিত জনপদের উপর। বানের জলে ভেসে যায় খেটে-খাওয়া দিনমজুর মানুষের সহায়-সম্বলটুকু। নষ্ট হয় সারা বছরের খোরাক এক ফসলি জমির ধান। মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। এ তো গেল বর্ষাকালের কথা। শুকনো মৌসুমেও রেহাই নাই। বরিশাল থেকে ঢাকাগামী বড় বড় লঞ্চ-স্টিমার, কার্গো সব নৌযানের রুট যেন জয়নগরের পাশ দিয়ে এ নদীটি। ভারী ইঞ্জিনচালিত এ নৌযানগুলোর আছড়ে পড়া ঢেউয়ে নদীর পাশ ক্ষয়ের দ্বারাও প্রায় ৫০০ মিটারের মতো নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে চুনারচরের একতাবাজার বা নতুন নলবুনিয়া বাজার, মাদ্রাসা, মসজিদ, স্কুল ইতিমধ্যে নদীগর্ভে উজাড় হয়েছে। নদীর পার্শ্বক্ষয় ঠেকানোর জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও তা আর বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।

এই লোকালয়ের প্রধান উপাদান তথা জনগোষ্ঠীর জীবনমানের খবর রাখে কেউ? কথায় বলে, ‘যার নাই ভিটে- বাড়ি, তার আবার ভোজ-ভুরি’! নদীপাড়ে বসতি হওয়ায় ইউনিয়নের ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষ জেলেজীবন বেছে নিয়েছে। পুরো ইউনিয়নে একটাও কার্পেটিং বা পাকা রাস্তা নাই। নলবুনিয়া লঞ্চঘাট থেকে দিঘির পাড়, রহমানের হাট থেকে তুলাতলির খেয়াঘাট সব মিলিয়ে ইউনিয়নের সড়কের মোট দৈর্ঘ্য হতে পারে ২০ কিলোমিটার। তার মধ্যে পশ্চিম ওরাকুলের চৌমাথা থেকে রহমানের হাট পর্যন্ত কাঁচা রাস্তাটি কয়েকবার বন্যার পানিতে এবং দুর্বল গঠনের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। তাছাড়া নলবুনিয়া লঞ্চঘাট থেকে চুনারচর গ্রামের বান্দের পাড় যাওয়ার কাঁচা রাস্তাটি দীর্ঘদিন ধরে  অসম্পূূর্ণ। ফলে ঐ গ্রামের প্রায় হাজারখানেক মানুষকে (যেখানে একটি প্রাইমারি স্কুল এবং দুটি মসজিদ রয়েছে) ঝুঁকি নিয়ে কোমর পানি ডিঙিয়ে নলবুনিয়া বাজারে আসতে হয়। রাস্তাটির কাজ কেন অসম্পূর্ণ অবস্থায় ফেলে রেখেছেন জিগ্যেস করলে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্থানীয় ঠিকাদাররা বলেন, প্রয়োজনীয় টাকা না থাকায় তারা কাজ শেষ করতে পারছেন না!

জয়নগর ইউনিয়ন নবগঠিত কাজীরহাট থানার অন্তর্ভুক্ত করায় ভোগান্তি আগের চেয়েও বেড়েছে। নলবুনিয়া, চুনারচর, রহমানের হাটের লোকজনের কাজীরহাট যাওয়ার জন্য তুলাতলির খেয়া পার হতে হয়। অথচ প্রায়ই এ ঘাটে খেয়া পাওয়া যায় না। মাঝে মাঝে থাকলেও ১৫ মিনিটের পথের জন্য ২-৩ ঘণ্টাও লেগে যায়। একই দশা নলবুনিয়া খেয়া পার হয়ে পাতারহাট যাওয়ার জন্যও। আবার তুলাতুলি খেয়াঘাট যেতে জয়নগরের পশ্চিম ওরাকুলে খেজুরতলি খালের উপর সেতুটি দু-তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে জীর্ণ-শীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। অথচ কাজীরহাট যাওয়ার পথে জয়নগর এবং পার্শ্ববর্তী দড়িচর খাজুরিয়া দুটি ইউনিয়নের জনগণের একমাত্র মাধ্যম এই  সেতু প্রাণহানির ফাঁদ এখন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এ বিষয়ে জিগ্যেস করলে কৌশলে এড়িয়ে যান অথবা আজ হবে, কাল হবে, টেন্ডার হয়ে গেছে বলে দায়সারা জবাব দেন। জয়নগর ইউনিয়নে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা। রূপকল্প-২০২১, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ, এমডিজি ও এসডিজি-এর লক্ষ্য যেখানে  মানসম্মত শিক্ষা ও নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ গড়া, সেখানে এ ইউনিয়নের একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় ‘নাদের আলী স্মৃতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়’-এর এসএসসিতে পাশের হার মাত্র ৫০ শতাংশ। এর অন্যতম কারণ, এখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশ শিক্ষক পাতারহাট থেকে গিয়ে ক্লাস এবং এলাকায় অবস্থান না করা। মানসম্পন্ন পর্যাপ্ত শিক্ষকেরও অভাব রয়েছে। অনেকে উপজেলা শিক্ষা অফিসে বা অন্যভাবে তদবির করে দিনের পর দিন অনুপস্থিত থাকেন।

ইত্তেফাক/এএইচপি