বাঙালি সমাজে পিতৃ-প্রধান পরিবারব্যবস্থা প্রচলিত থাকলেও আধুনিক বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বর্তমান যুগে পরিবারে বাবার পাশাপাশি মায়ের প্রাধান্যও প্রায় সমপর্যায়েই পৌঁছে গেছে। সরকারিভাবেও সন্তানের পরিচয়ে বাবা-মা উভয়কেই প্রাধান্য দেওয়ার বিধান রয়েছে। বর্তমানে জাতীয় পরিচয়পত্রে একজন পুরুষের ক্ষেত্রে যেমন বাবা-মায়ের নাম উল্লেখ করতে হয় তেমনি একজন নারীকেও বাবা-মায়ের নামই উল্লেখ করতে হয়। এমনকি বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রেও স্বামীর নাম ব্যবহারের বিধান বর্তমানে নেই। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত আমাদের পারিবারিক কাঠামোতেই শুধু ব্যাপক পরিবর্তন আসেনি বরং পরিবারে নারীর অধিকার, ক্ষমতা এবং দায়িত্বও অনেক বেড়েছে। এছাড়া নারীশিক্ষার ব্যাপক প্রসার এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের ফলে পরিবারেও তাদের প্রাধান্য বাড়ছে। পরিবারের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সম্পদ ক্রয়-বিক্রয়, সন্তানের ভবিষ্যত্সহ সব বিষয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীও সমান ভূমিকা রাখছে।
পরিবার ব্যবস্থায় এই পরিবর্তনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের প্রভাবই লক্ষ করা যায়। আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে পারিবারিক কলহ বাড়ছে। আর এই পারিবারিক অশান্তির এক ভয়ংকর প্রভাব পড়ছে সন্তানের ওপর, যা কোনো পরিবারের জন্যই কাঙ্ক্ষিত নয়। সন্তান সবসময় মা-বাবা উভয়ের স্নেহ, মায়া-মমতা ও ভালোবাসা পেতে চায়। একমাত্র সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশেই সন্তানকে সুশিক্ষিত করে উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। তবে পরিবারে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের প্রাধান্য ও সমমর্যাদা বজায় না থাকলেও পরিবারে ক্ষমতার ভারসাম্য ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর এ থেকেই দাম্পত্য কলহ, পারিবারিক অশান্তি, বিবাহ বিচ্ছেদ, পরিবার ভেঙে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। ভেঙে যাওয়া পরিবারে শুধু মা অথবা বাবার পক্ষে সন্তানকে যথাযথভাবে লালন-পালন করা, লেখাপড়া শিখিয়ে যোগ্য ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব।
‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’ অর্থাত্ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর প্রাধান্য, প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়লেও বাংলায় প্রচলিত এই সত্যটি এখনো অনেক গুরুত্ব বহন করে। একজন নারী পরিবারে শুধু একজন পুরুষের স্ত্রী নন বরং সন্তানেরও মা। এই আধুনিক সভ্য জগতেও সন্তানের কাছে তার মা সবচেয়ে প্রিয়, পবিত্র ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল। একইভাবে একজন পুরুষকে স্বামী ও সন্তানের পিতা হিসেবে উভয় দায়িত্বই পালন করতে হয়। তবে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, স্নেহ, মায়া-মমতা ও ভালোবাসা বজায় রেখে সুখের সংসার গড়ে তোলা এবং পরিবারের সদস্যদের সঠিক পথে পরিচালিত করার প্রধান দায়িত্ব নারীকেই পালন করতে হয়। এ কারণেই পরিবারের শান্তি-শৃঙ্খলা এবং সন্তানের ভবিষ্যত্ অনেকাংশেই মায়ের ওপর নির্ভরশীল।
দুঃখজনক বিষয় হলো, মূল্যবোধহীন শিক্ষাব্যবস্থা, আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অপব্যবহার, নানা ধরনের ধর্মীয় কুসংস্কার ইত্যাদির নেতিবাচক প্রভাবে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করায় সন্তান বিপথে চলে যাচ্ছে এবং পরিবারেও অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। আবার পিতা বা পরিবারের অন্য সদস্যের দায়িত্বহীনতার কারণেও এমন হতে পারে।
যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন দেখা দিলেও পরিবারে নারীর ভূমিকা ও সন্তানের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে মায়ের গুরুত্বের কোনো পরিবর্তন হয়নি। পরিবারে নারীর দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও নেতিবাচক ভূমিকা শুধু পরিবারকেই নয় বরং পুরো সমাজব্যবস্থাকেই প্রভাবিত করে। দেশ ও জাতির মঙ্গলের জন্যই শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ যেমন প্রয়োজন, তেমনি পরিবার ও সন্তানের প্রতিও নারীকে যথাযথ দায়িত্ব পালনে সচেতন থাকতে হবে। আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে সত্, আদর্শবান, দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে একমাত্র মায়েদের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
