টিভি চ্যানেলগুলোর দর্শক কমছে কেন?

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২২, ০৫:৪১

বাংলাদেশের টিভি নাটক এবং ধারাবাহিকের একসময় দারুণ সুনাম এবং বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল, যা দিনে দিনে বিলুপ্ত হয়েছে বলা চলে। নিম্নমানের কাহিনি, দুর্বল অভিনয়, যাচ্ছেতাই নির্মাণ, অহেতুক কাহিনিকে টেনে লম্বা করার প্রবণতা দর্শকদের ভিনদেশি সিরিয়াল দেখতে উত্সাহিত করেছে।

বাংলাদেশের টেলিভিশন দর্শকসংখ্যা দিনে দিনে কমছে। ক্রমেই দর্শক বিদেশি চ্যানেলমুখী হচ্ছে। আগে এই প্রবণতা শহরাঞ্চলের দর্শকদের মধ্যে পরিলক্ষিত হলেও এখন গ্রামীণ এলাকার টিভি-দর্শকরাও ব্যাপক হারে বিদেশি চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখার প্রতি ঝুঁকছে। বাংলাদেশি টিভি চ্যানেলে কোন দিন কোন সময় কোন ধারাবাহিক নাটক কিংবা টিভি-শো প্রচারিত হয় তা না জানলেও স্টার প­াস, স্টার জলসা, জিটিভি, সনি কিংবা কালারস, জি বাংলা চ্যানেলে কখন কোন সিরিয়াল দেখানো হয় তা ঠিকই জানে বেশির ভাগ দর্শক। স্যাটেলাইট সংস্কৃতির অপচ্ছায়া গ্রাস করেছে আমাদের সহজ সরল সাধারণ টিভি দর্শকদের। এর মাধ্যমে পারিবারিক কলহ, পরকীয়া, প্রতারণা, লোভ-লালসা, অসততা, পারস্পরিক সন্দেহ, সংশয়, অবিশ্বাস, যৌন বিকৃতি, সংঘাত, ইত্যাদিকে উসকে দেওয়া হচ্ছে। নারী চরিত্রগুলোকে খলনায়িকা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সাধারণ ঘরোয়া পারিবারিক দৃশ্যেও নারীরা উদ্ভট উগ্র সাজসজ্জা নিয়ে উপস্থিত হয়ে দর্শকদের রুচিবিকৃতি ঘটাচ্ছে। এভাবে বিদেশি টিভি চ্যানেলগুলো বাঙালির চিরায়ত পারিবারিক সম্পর্কের শেকড় নষ্ট করে দিতে দিনরাত চেষ্টা চালাচ্ছে। অপসংস্কৃতির মাধ্যমে তারা আমাদের সন্তানদের জীবন থেকে সুন্দরতম স্বপ্নগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। পরিবারের ছোট থেকে বড়, সবাই অপসংস্কৃতির গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে। আরেকটি কূটকৌশল হলো পোশাকের বাজার প্রসারিত করা। ঐসব সিরিয়ালের নায়িকাদের দেখে নানা সাজপোশাকে এখন আসক্ত এখানকার তরুণীরা। বাংলাদেশি টিভি চ্যানেলের অভাব না থাকলেও এই সময়ের দর্শকদের মন ভরানোর মতো উন্নতমানের উপভোগ্য টিভি সিরিয়াল এবং বিনোদনমূলক টিভি শোর যথেষ্ট অভাব রয়েছে—এ কথা সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন। কয়েকটি প্রাইম টিভি চ্যানেল মাঝেমধ্যে মানসম্পন্ন উপভোগ্য ধারাবাহিক নাটক প্রচার করলেও মাত্রাতিরিক্ত বিজ্ঞাপনের চাপে অতিষ্ঠ দর্শক সেগুলো দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে খুব স্বাভাবিকভাবেই। বিভিন্ন চ্যানেলের ঈদ আয়োজন ঈদের আনন্দ, খুশির মাত্রাকে বাড়িয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও আনন্দের এ বিশেষ আয়োজন এখন রীতিমতো যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে। বিরক্তির উদ্রেক করছে। দেশীয় কৃষ্টি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, শুদ্ধ বাংলা ভাষাকে হেয় করছে। নতুন প্রজন্মকে জগাখিচুড়ি মার্কা ভাষা, অপসংস্কৃতি শেখানো হচ্ছে। কমেডি নাটকের নামে ভাড়ামি, পেটে সুড়সুড়ি দিয়ে, বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে হাসানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আমাদের এখানকার টিভি চ্যানেলের ইদানীং গোটা আয়োজনের বেশির ভাগই হয় অন্ধ অনুকরণ কিংবা বিজাতীয় সংস্কৃতির আদলে।

আমরা সবাই উপলব্ধি করছি, ভিনদেশি সিরিয়ালগুলো বেশির ভাগ বাড়ির দর্শক নিয়মিতভাবে দেখছে, যার ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমাদের আর্থিক, পারিবারিক তথা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এজন্য দায়ী কে বা কারা, তা আমাদের ভাবতে হবে সিরিয়াসভাবে। দেশীয় চ্যানেলগুলো ক্রমেই দর্শক হারিয়ে নিঃস্ব, রিক্ত হয়ে পড়ছে, অথচ এ নিয়ে চ্যানেলগুলোর যেন মাথাব্যথা নেই, তাদের টনক নড়ছে না—যা দেখে আমরা অবাক হয়ে যাই। দর্শক হারানোর কারণ খুঁজে বের করে তার প্রতিকারে উদ্যোগী হতে দেখা যাচ্ছে না কোনো দেশি টিভি চ্যানেলকে। বাংলাদেশের টিভি নাটক এবং ধারাবাহিকের একসময় দারুণ সুনাম এবং বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল, যা দিনে দিনে বিলুপ্ত হয়েছে বলা চলে। নিম্নমানের কাহিনি, দুর্বল অভিনয়, যাচ্ছেতাই নির্মাণ, অহেতুক কাহিনিকে টেনে লম্বা করার প্রবণতা দর্শকদের ভিনদেশি সিরিয়াল দেখতে উত্সাহিত করেছে বললে অন্যায় হবে না। একসময়ে বিটিভিতে প্রচারিত ধারাবাহিক নাটক এবং ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখার জন্য দর্শক প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সেরে যথাসময়ে ঘরে ফিরতেন, যখন এই ধারাবাহিক নাটক এবং অনুষ্ঠানগুলো দেখানো হতো রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যেত, অথচ এখন কোন টিভি চ্যানেলে কোন দিন কখন কী নাটক, ধারাবাহিক দেখানো হয় তার খোঁজ রাখে না বেশির ভাগ দর্শক।  আমাদের দেশীয় টিভি চ্যানেলগুলোর অতি বাণিজ্যিক মনোভাব তাদের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনছে। দেশি চ্যানেলগুলোর শোচনীয় ব্যর্থতা আমাদের দর্শকদের মনোযোগ, আগ্রহ কৌতূহলকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করছে। ফলে বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন প্রকট আকার ধারণ করেছে। মাত্র কয়েকটি বিদেশি টিভি চ্যানেলের কাছে আমাদের প্রায় তিন ডজন চ্যানেলের পরাজয় দুঃখজনক। যে কোনো বিবেকবান, দেশপ্রেমিক সচেতন মানুষ তাতে ব্যথিত, আলোড়িত না হয়ে পারে না। অতি বাণিজ্যিক মানসিকতা ত্যাগ করে দর্শকদের কাছে দেওয়া কমিটমেন্ট অনুযায়ী সময়োপযোগী বিনোদনসম্ভার টিভি পর্দায় আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরার মাধ্যমে বিদেশি চ্যানেলে উত্সাহী দর্শকদের ফিরিয়ে আনতে হবে। তা না হলে আমাদের সিনেমা শিল্পের মতো চরম বিপর্যয় নেমে আসবে টিভি অঙ্গনেও। একসময়ে অধিকাংশ টিভি চ্যানেল পরিত্যক্ত হিসেবে বিবেচিত হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। দিনে দিনে অনেক নতুন নতুন টিভি চ্যানেল চালু হয়ে নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রচার করে গেলেও সব দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারছে না দুর্বল এবং অনুন্নত মানের অনেকগুলো চ্যানেল। এমন অনেক দর্শক রয়েছে যারা বাংলাদেশের  টিভি চ্যানেলের মাত্র কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলো একেবারেই দেখে না। এসব চ্যানেলের প্রতি তাদের তেমন আকর্ষণ নেই। অথচ চ্যানেলগুলো নিয়মিতই ধারাবাহিক নাটক, টক শো, সংগীতানুষ্ঠান এবং ঘণ্টায় ঘণ্টায় সংবাদ প্রচার করে যাচ্ছে। তাহলে এখন প্রশ্ন, এত ঢাকঢোল পিটিয়ে নিত্য নতুন টিভি চ্যানেল চালুর যথার্থতা কোথায়?

এখন ঘরোয়া বিনোদনে দর্শকদের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে ওটিটি প্ল্যাটফরম। কিছুদিন আগেও দর্শক দেশি-বিদেশি বিভিন্ন টিভি চ্যানেলনির্ভর থাকলেও এই মুহূর্তে টিভি যেন দর্শকদের আগের মতো টানতে পারছে না, বরং দর্শক টিভিবিমুখ হয়ে পড়ছেন নানা সংগত কারণে। দেশি-বিদেশি সব টিভি চ্যানেলের কনটেন্টের বৈচিত্র্যহীনতা, একঘেয়ে পুরোনো ট্র্যাকের গল্প-কাহিনি পরিবেশন, ঘুরে ফিরে কিছু নির্দিষ্ট জনপ্রিয় তারকা অভিনেতা-অভিনেত্রীর পারফরম্যান্স সর্বোপরি অনুষ্ঠান প্রচারকালে কিছুক্ষণ পরপর বিজ্ঞাপনের মাত্রাতিরিক্ত যন্ত্রণা দর্শকদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে। অনেক দিন ধরেই দর্শক বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের স্বেচ্ছাচারিতার কবল থেকে মুক্তি পেতে হাঁসফাঁস করছিলেন। দর্শকদের সেই অবস্থা থেকে বিকল্প ঘরোয়া বিনোদন প্ল্যাটফরম হিসেবে ওটিটি (ওভার দ্য টপ) স্বস্তির সুবাতাস বয়ে এনেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দর্শকরা এখন আমাজন প্রাইম ভিডিও, নেটফ্লিক্স, ডিজনি হটস্টার, জি ফাইভ, হইচই, সনি লিভ প্রভৃতি জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফরমে নিয়মিতভাবে নিত্যনতুন সিনেমা, ওয়েব সিরিজ এবং অন্যান্য কনটেন্ট দেখছেন।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক

ইত্তেফাক/এএইচপি