অনেক দিবসের মতো গতকাল ৭ অক্টোবর একটি দিবস ছিল। দিবসটি হইল ‘বিশ্ব মৃদু হাসি দিবস’। খুবই ভালো কথা। মৃদু হাসির মুখ বা স্মাইলি ফেইস সকলেই পছন্দ করে। মৃদু হাসি প্রশান্তির চিহ্ন বহন করে। ১৯৬৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হারবি বেল বাণিজ্যিক কারণে একটি হাসিমুখের সিম্বল তৈরি করিয়াছিলেন। কয়েকটি মাত্র দাগ দিয়া সেই হাসিমুখটি এঁকেছিলেন। তাহার ধারণা ছিল, এই হাসিমুখ হয়তো মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য হইবে না। কিন্তু তাহা প্রকাশের পর মুহূর্তেই বিশ্বব্যাপী ছড়াইয়া পড়ে। বলা যায়, তাহা বিশ্বব্যাপী বিস্ফোরিত হইয়াছিল। ইহার কারণ মানুষ হাসি পছন্দ করে, হাসিতে চাহে এবং অপরকেও হাসাইতে চাহে। বিশ্বব্যাপী বহুল প্রচলিত একটি উক্তি হইল, জীবন সংক্ষিপ্ত, যতক্ষণ পারো হাসিখুশি থাকিতে চেষ্টা করো। ভুবনখ্যাত শান্তিকামী মিশনারি মাদার তেরেসা বলিয়াছেন, ‘প্রশান্তি শুরু হয় মৃদু হাসির মধ্য দিয়া।’ চিকিত্সাবিজ্ঞানীরা বলিয়া থাকেন, হাসিলে শরীরস্বাস্থ্য ভালো থাকে, রোগ ও শোকমুক্ত থাকা যায়। তাই পার্কে, মাঠে আমরা সকালে উঠিয়া অনেককে হাসির অভিনয় করিতে দেখি। অন্তরে দুঃখ, শোক, দুশ্চিন্তা লইয়া হাসিবার প্রাণান্তকর চেষ্টা! কষ্টের মধ্যেও মানুষ হাসে না, তাহা নহে। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি বলিয়াছেন, সেই মানুষগুলিই আমার সবচেয়ে প্রিয়, যাহারা কষ্টের মধ্যেও হাসিতে পারেন। কিন্তু বর্তমান দেশে দেশে একটি বড় বাস্তবতা হইল, এখন আর অনেকের জীবন স্বাভাবিক সচরাচর কষ্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। দুশ্চিন্তা, জীবনের অনিশ্চয়তা ভিঞ্চির বলা কষ্টকেও ছাড়াইয়া গিয়াছে। ঘরে দুশ্চিন্তা, বাহিরে দুশ্চিন্তা, সর্বক্ষেত্রে অনিশ্চয়তায় মানুষ হাসিবার কথা ভুলিয়া গেলে অবাক হইবার কিছু থাকিবে না।
কথা হইল, মানুষের, বিশেষ করিয়া উন্নয়নশীল বিশ্বের মানুষের কি হাসিবার জো আছে? কী করিয়া মানুষ দুশ্চিন্তা মাথায় লইয়া হাসিবে? উন্নয়নশীল দেশগুলিতে মানুষের স্বাস্থ্যবিমা নাই, সামাজিক নিরাপত্তা নাই। চিকিত্সা করিতে গেলে যে বিপুল ব্যয় নির্বাহ করিতে হয়, তাহার জোগান আসিবে কোথা হইতে? নির্দিষ্ট সময় চাকুরি করিবার পর যাহারা পেনশন পান, তাহাদের সেই পেনশন এতটাই অপ্রতুল যে সংসার চলিবার প্রশ্নই আসে না। আর যাহাদের পেনশন নাই, তাহাদিগকে শতভাগ সন্তানাদির মুখাপেক্ষী হইয়া থাকিতে হয়। মানুষের মৃত্যুরও কোনো গ্যারান্টি নাই। বেশির ভাগ মানুষ জানে না তাহার মৃত্যু হইলে পরিবার-পরিজন কী করিয়া চলিবে! সন্তানের লেখাপড়া চলিবে কী করিয়া। এই রকম অবস্থায় কি মানুষ হাসিতে পারে? এই সকল কারণেই যাহারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, যাহারা রাষ্ট্রের নাগরিকদের অভিভাবকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাহাদের উচিত, মানুষের কিছু মৌলিক অধিকারের প্রতি সচেতন হওয়া। আমাদের সংবিধানেই নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিত্সাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থার কথা বলা হইয়াছে। কিন্তু তাহা কতটা অর্জন করা গেছে, তাহা ভাবিয়া দেখিতে হইবে। যাহার ঘরে অন্ন নাই, যিনি বেকারত্বের জালে জড়াইয়া আছেন, যাহার চিকিত্সার সংস্থান হইবে কী করিয়া জানা নাই, যাহার সন্তানদের লেখাপড়ার সুব্যবস্থা নাই, তিনি হাসিবেন কী করিয়া? উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক কার্যক্রম। তাহা চলিতে থাকিবে। কিন্তু যদি মৌলিক প্রয়োজনগুলি অনুপস্থিত থাকে, যদি মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা না যায়, তাহা হইলে উন্নয়নসহ অন্য সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইতে বাধ্য। মনে রাখা দরকার, সর্বাগ্রে প্রয়োজন মৌলিক প্রয়োজনগুলি মিটানোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া।
