আজ মহানবির (সা.) আদর্শ অনুসরণ কেন প্রয়োজন

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২২, ০০:৫৯

মানুষের হেদায়েতের জন্য যুগে যুগে আল্লাহ এই ধরণীতে অসংখ্য নবি-রসুল পাঠাইয়াছেন। নবি-রসুলদের আগমনধারায় সর্বশেষ নবি হইলেন মুহম্মদে মুস্তফা আহমদে মুজতাবা হজরত মুহম্মদ (স.)। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার সুবহে সাদিকের সময় মহাকালের এক মহাক্রান্তিলগ্নে আরবে আইয়্যামে জাহিলিয়াতের যুগে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আবার ৬৩ বৎসরের এক মহান আদর্শিক জীবনের সমাপ্তি টানিয়া ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে এই একই দিনে তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি যেদিন জগতে আসিয়াছিলেন, সেই দিনটি ছিল বিশ্ব জাহানের জন্য এক মহা আনন্দের দিন। নবিজির এই জন্মদিন উপলক্ষ্যে এই দিনের সম্মানার্থে প্রতি বৎসর ১২ রবিউল আউয়াল পালিত হইয়া থাকে পবিত্র ‘ঈদে মিলাদুন্নবি (স.)। এখানে ‘ঈদ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ খুশি বা আনন্দ উদযাপন করা, ‘মিলাদ’ অর্থ জন্ম, ‘আন-নাবি’ অর্থ নবি মুহম্মদ (স.)। সুতরাং ‘ঈদে মিলাদুন্নবি’ বলিতে নবিজির আগমনের খুশি উদযাপনকে বোঝায়। জগত আলো করিয়া প্রিয় নবির শুভাগমনে কিছু উল্লেখযোগ্য বিস্ময়কর ঘটনাও ঘটিয়াছিল, যাহা ছিল তাহার নবুওয়তের পূর্বাভাস। যেমন—তাহার শুভ জন্মের মুহূর্তে কিসরার প্রাসাদের ১৪টি সৌধচূড়া ভাঙিয়া পড়ে। প্রাচীন পারসিক ধর্মযাজকমণ্ডলীর উপাসনাগারগুলোতে যুগ যুগ ধরিয়া প্রজ্বলিত হইয়া আসা অগ্নিকুণ্ডগুলো নিভিয়া যায়। বাহিরা পাদরিদের সরগম গির্জাগুলো নিস্তেজ ও নিষ্প্রভ হইয়া পড়ে। এমনকি তত্কালে কাবা শরিফে রক্ষিত বড় প্রতিমাটিও ভাঙিয়া পড়ে। 

মহানবি (স.) জন্মের আগেই পিতাকে হারান। তৎকালীন আরবের রীতি অনুযায়ী তায়েফে দুধ মা হালিমা সাদিয়ার (রা.) ঘরে লালিত-পালিত হন। মাত্র ছয় বৎসর বয়সে তিনি মাতৃহীন হইয়া পড়েন এবং পরবর্তীকালে দাদা ও চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে বাড়িয়া উঠেন। ছোটকাল হইতেই তিনি মহান আল্লাহ ও তার সৃষ্টিরাজি সম্পর্কে চিন্তা করিতেন। বালককালে খ্রিষ্টান পাদরি বুহাইরা তাহার পিঠে মোহরে নবুয়ত দেখিয়া যে ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন তাহা পরবর্তীকালে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হইয়াছে। মহান আল্লাহ এই পৃথিবী সৃষ্টির বহু আগে রোজে আজলে অর্থাৎ রুহের জগতে অন্যান্য নবিদের নিকট তাহার প্রিয় হাবিবের পরিচয় করিয়া দিয়াছেন। সুরা আল ইমরানের ৮১ নম্বর আয়াতে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, ‘হে প্রিয় রসুল! আপনি স্মরণ করুন ঐ দিনের ঘটনা, যখন আমি সকল নবি হইতে এইভাবে অঙ্গীকার নিয়াছিলাম যে, যখন আমি তোমাদের কিতাব ও হিকমত অর্থাৎ নবুওয়াত দান করিব, অতঃপর তোমাদের নিকট এক মহান রসুলের শুভাগমন হইবে। যিনি তোমাদের প্রত্যেকের নবুওয়াতের সত্যায়ন করিবেন, তখন তোমরা সকলে অবশ্যই তাহার উপর ইমান আনিবে এবং সর্বোত্তমভাবে তাহাকে সাহায্য করিবে। তোমরা কি এই কথার উপর অঙ্গীকার করিতেছ এবং আমার এই প্রতিশ্রুতির দায়িত্ব পালন করিবে বলিয়া অঙ্গীকার করিলে? তাহারা বলিল, হ্যাঁ আমরা অঙ্গীকার করিতেছি। আল্লাহ বলিলেন, তাহলে তোমরা সাক্ষী থেকো এবং আমিও তোমাদের সঙ্গে এই অঙ্গীকারে সাক্ষী হইয়া রহিলাম।’ কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, হজরত মুসা (আ.), হজরত ঈসা (আ.)-সহ অন্যান্য নবিদের অনুসারীদের অনেকে আজ এই প্রতিশ্রুতির ওপর প্রতিষ্ঠিত নাই বলিয়া ভিন্ন মত ও পথের সৃষ্টি হইয়াছে। অথচ মহান আল্লাহ তাহার প্রিয় হাবিবকে শুধু এই পৃথিবীর জন্য নহে, সমস্ত জগদ্বাসীর জন্য রহমতস্বরূপ পাঠাইয়াছেন। সুরা আল-আম্বিয়ায় আল্লাহ তায়ালা সেই কথারই সাক্ষ্য দিয়াছেন, ‘ওয়ামা আরসালনাকা ইল্লা রহমাতাল্লিল আলামিন’। তিনি ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সকল জগতের সকলের জন্যই রহমত স্বরূপ। আজ কলহপূর্ণ ও অস্থির বিশ্বে তাহার আদর্শ অনুসরণ করিলে অশান্তি, অনৈক্য, যুদ্ধবিগ্রহ, হানাহানি ইত্যাদি থাকিবার কথা নহে।  

রসুল (স.) আল্লাহর পক্ষ হইতে সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত। তবে কেবল রবিউল আউয়াল মাস আসিলে আমরা নবিজিকে স্মরণ করিব তাহা নহে। জীবনের প্রতিটি ক্ষণে ও প্রতিটি মুহূর্তে তাহাকে আমাদের অনুসরণ-অনুকরণ করিতে হইবে। আল্লাহকে ভালোবাসিতে হইলে রসুল (সা.)-কে মানিয়া চলিতে হইবে। আল্লাহ আমাদেরকে মহানবি হজরত মুহম্মদ (স.)-এর শান-মান জানিয়া তাহার পদাঙ্ক অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন