ইহা কেমন পৃথিবী! এখানে দানবরাই দাপট দেখাইয়া বেড়াইতেছে!! কবি বলিয়াছেন, ‘এই পৃথিবী মানবের তরে, দানবের তরে নহে’; কিন্তু কবির বাণী আজ বুঝি ভুল প্রমাণিত হইতেছে। গোটা পৃথিবী যেন ক্রমান্বয়ে দানবের করতালগত হইয়া পড়িতেছে। ইউক্রেনের ওপর অন্যায়ভাবে যুদ্ধ চাপাইয়া দিয়া সেই দেশটিকে আজ ছিন্নভিন্ন করা হইতেছে। রাজধানী কিয়েভে চালানো হইতেছে উপর্যুপরি হামলা। বড় বড় বিস্ফোরণে কাঁপিয়া উঠিতেছে একটি আধুনিক শহর। ইহার পূর্বে গত রবিবার ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর জাপোরিঝিয়ার একটি আবাসিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হইলে নিহত হয় ১৭ জন ও আহত হয় অন্তত ৪০ জন। এইভাবে ইউক্রেনে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হইতেছে। ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামো মাটির সহিত মিশাইয়া ফেলা হইতেছে। যেন-বা একটি দেশকে দুনিয়া হইতে মুছিয়া ফেলিবার আয়োজন চলিতেছে। এইভাবে যুদ্ধে বেসামরিক মানুষ ও স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু বানানো ন্যক্কারজনক।
যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের মানুষ যে যাহার মতো দেশ ছাড়িয়া পালাইয়া যাইতেছে। এই দেশান্তরী হইবার মর্মজ্বালা আমাদের চাইতে আর কাহারা ভালো বুঝে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর আক্রমণে এই দেশের মানুষ দলে দলে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল। শরণার্থীর জীবন সর্বদাই দুর্বিষহ ও দুর্ভাগ্যজনক। যুদ্ধে সৈন্য হিসাবে ব্যবহৃত হইবার আশঙ্কায় আক্রমণকারী দেশটির কোনো কোনো নাগরিকও দেশ ছাড়িয়া চলিয়া যাইতেছেন। এই দেশান্তরী পরিবারগুলির দুর্দশা বর্ণনাতীত। শুধু ইউক্রেন-রাশিয়ার নাগরিকরাই এই যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে তাহা নহে। এই যুদ্ধ পৃথিবী জুড়িয়া রক্তক্ষরণের সৃষ্টি করিয়াছে। ইহাতে অনেক অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মানুষ সীমাহীন দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হইয়াছে। জ্বালানি ও খাদ্যসংকট এবং দেশে দেশে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রাণ আজ ওষ্ঠাগত। এই সকল মানুষ এখন ভাবিতেছেন, আমাদেরও যখন মরিতে হইবে, তখন মরিবার পূর্বে অন্তত দেখে যাই এই যুদ্ধ নামক মরণখেলায় শেষপর্যন্ত কাহারা জিতে। আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশ এই যুদ্ধ হইতে সৃষ্ট বিশ্বমন্দার কারণে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়িতে পারে বলিয়া আশঙ্কা করা হইতেছে। বিশ্বমোড়লরা তাহাদের কথা ভাবিতেছেন না। এমনকি তাহাদের জন্য খাদ্য সরবরাহের কথা বলিয়া তাহা অন্যত্র চলিয়া যাইতেছেন এবং তাহা দ্বারা তৈরি করা হইতেছে ইথানিল ফুয়েল। কী বিচিত্র ও নিষ্ঠুর এই পৃথিবী! এমন পৃথিবী আমরা কেহই দেখিতে চাহি নাই।
বিশ্ববাসীর জন্য অশান্তির অগ্নিশিখা সৃষ্টিকারী এই যুদ্ধ থামানো দরকার; কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা কে বাঁধিবে? আশ্চর্যজনকভাবে এই ব্যাপারে সমস্ত পৃথিবীই আজ নির্বিকার ও নিশ্চুপ! অথচ পৃথিবী জুড়িয়াই আজ হাহাকার তৈরি হইয়াছে। ভুখা-নাঙ্গা মানুষের ক্রন্দন রোল শুনা যাইতেছে। তাহার পরও কি বিশ্ববিবেক জাগ্রত হইবে না? বিশ্বব্যবস্থা, নিয়মশৃঙ্খলা সকল কিছু আজ ধূলিসাৎ হইয়া যাইতেছে। অথচ কয়েক বৎসর পূর্বেও গরিব ও উন্নয়নশীল দেশগুলির পারফরম্যান্স ভালো ছিল। তাহারা কোভিড-১৯-এর ধাক্কা সামলাইয়া মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইবার স্বপ্ন দেখিতেছিল; কিন্তু এক সর্বনাশা যুদ্ধ আসিয়া আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করিয়া দিতেছে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, কানেকটিভিটি ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে পৃথিবী আজ একটি গ্লোবাল ভিলেজ বা বৈশ্বিক গ্রাম। এই কারণে পৃথিবীর কোনো প্রান্তে কোনো অশান্তির দাবানল সৃষ্টি হইলে তাহা সকল দেশের মানুষকে আজ বিচলিত ও উদ্বিগ্ন করিয়া তুলে। ইহার পূর্বে বিদেশি দখলদারিত্ব হইতে সদ্যমুক্ত বুচাসহ বিভিন্ন শহরে গণকবর, রাস্তায় রাস্তায় পড়িয়া থাকা লাশের সারি দেখিয়া আমরা যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি করিতে পারিয়াছি; কিন্তু মানুষের অধিকার হরণ করিবার অধিকার কাহারো নাই। নিরপরাধ নারী-শিশুসহ বেসামরিক মানুষের হত্যা নিঃসন্দেহে যুদ্ধাপরাধের শামিল। আজ যাহারা এই যুদ্ধাপরাধ করিতেছে তাহাদের একদিন না একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াইতে হইবে এবং ইতিহাস তাহাদের ক্ষমা করিবে না।
