রোববার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া প্রতিটি গুলির হিসাব আছে’

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২২, ০৩:০৪

বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল সাকিল আহমেদ বলেছেন, উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সীমান্তে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া প্রতিটি গুলির হিসাব বিজিবির কাছে আছে। মর্টারশেল নিক্ষেপ, আকাশসীমা অতিক্রমসহ প্রত্যেক ঘটনায় তাত্ক্ষণিক প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। তারা কূটনীতিকভাবে উত্তরও পাঠিয়েছে। তিনি আরো বলেন, এ নিয়ে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপির সঙ্গে পতাকা বৈঠকের চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে যোগাযোগ হয়েছে। শিগিগর ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

সোমবার দুপুরে কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের (৩৪ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ তুমব্রু বিওপি, কোনাপাড়া বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা ক্যাম্প, বাইশফাঁড়ি বিওপি এবং রেজুপাড়া বিওপি পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমকে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাকিল আহমেদ এসব কথা বলেন।             

পরিদর্শনকালে বিজিবি মহাপরিচালক সীমান্তে দায়িত্বরত বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক, প্রশিক্ষণ ও বর্তমানে গৃহীত অপারেশনাল কার্যক্রম দেখে ভূয়সি প্রশংসা করেন। এ সময় বিজিবির অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ এম এম খাইরুল কবির, কক্সবাজার রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমউজ শাকিব ও কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক কর্নেল মেহেদী হাসান কবিরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা  উপস্থিত ছিলেন।

মিয়ানমার থেকে এপারে কেউ যেন ঢুকতে না পারে এ ব্যাপারে বিজিবির কড়া নজরদারি বাড়ানো হয়েছে জানিয়ে মেজর জেনারেল সাকিল আহমেদ বলেন, গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। সুবিধাজনক সময়ে ক্যাম্প কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠক হবে। এছাড়া মিয়ানমারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়েও বৈঠকের মাধ্যমে সবকিছু উপস্থাপন করা হবে। সীমান্তের ওপারে কি ঘটছে তা নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথা নেই। এরপরও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ঘটন-অঘটন আমরা বিবেচনায় রাখছি। আমাদের সীমান্তের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় আমরা অতন্দ্র প্রহরী। কোনো অনৈতিক হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করব না আমরা।

এদিকে, টানা ১০ দিন বন্ধ থাকার পর ঘুমধুম-উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি ফের গোলাবর্ষণ ও মর্টারশেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। বিজিবি মহাপরিচালকের সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনের দিনে হেলিকপ্টার থেকে নিক্ষেপিত গোলার বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে সীমান্তের এপারও। ফলে ভয় ও আতঙ্ক আবারও ভর করেছে সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের ওপরে।

সোমবার ভোর রাত ৩টা থেকে নাইক্ষংছড়ির ঘুমধুম ও উখিয়ার পালংখালি এলাকার সীমান্তে গোলাবর্ষণ শুরু হয়। একই সময়ে টেকনাফের হোয়াইক্যং ও হ্নীলা ইউনিয়নের সীমান্ত এলাকায়ও হেলিকপ্টার থেকে গোলাবর্ষণের ঘটনা সকাল ৬টা পর্যন্ত চলেছে বলে জানিয়েছেন সীমান্তে থাকা লোকজন।

তবে, বিজিবি মহাপরিচালকের আগমনের মধ্যে মিয়ানমার সীমান্তের অভ্যন্তরে ফের গোলাবর্ষণ শুরু হওয়ায় এপারে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

হোয়াইক্যং ২ নম্বর ওয়ার্ডের জেলে জবত আলী (৪০) বলেন, মিয়ানমারের ওপারে হোয়াইক্যং সীমান্তের কাছাকাছি হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া ভারী গোলা ও মর্টারশেলের শব্দে ঘুম ভাঙে। ঘুম থেকে উঠে শুনি প্রচণ্ড শব্দ আর দেখি হেলিকপ্টার থেকে ভারী গোলা ফেলার দৃশ্য। ভয় ও আতঙ্কে চিংড়ি ঘেরে মাছ শিকারে যেতে পারিনি। সীমান্ত এলাকার এ অংশে আজই এমন ঘটনা দেখলাম। গোলায় ওপারে ধোঁয়ার কুন্ডলী দেখা যাচ্ছে।

হোয়াইক্যং ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাঞ্জরপাড়া এলাকার বাসিন্দা নুরুল আমিন (৪৫) বলেন, হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমারের ওপারে চলমান ঘটনা আমাদের নতুন করে শঙ্কিত করেছে।

হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর আহমদ আনোয়ারী বলেন, মিয়ানমারের ওপারে সীমান্তের কাছে নতুন করে থেমে থেমে গোলাবর্ষণের ঘটনায় হোয়াইক্যং ইউনিয়নের এপারের সীমান্তবাসীর মাঝে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তবে ইউনিয়নের সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

উখিয়ার পালংখালী সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা নুরুল বশর (৩৫) বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরকান আর্মির (এএ) মাঝে চলমান সংঘাতের গোলাগুলি ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ থাকায় একটু স্বস্তিতে ছিলাম। কিন্তু সোমবার ভোর থেকে আবারও সীমান্ত ঘেঁষে গোলার শব্দ আতঙ্কগ্রস্ত করেছে।

পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমার ইউনিয়নের সাথে মিয়ানমারের স্থলসীমান্ত অনেক দূর। এর আগেও কয়েক অংশের ওপারে গোলাগুলি হয়েছে। আজকেও কয়েক জায়গায় গুলির শব্দ এসেছে বলে সীমান্তের লোকজন জানিয়েছে।

ঘুমধুম জিরো পয়েন্টের রোহিঙ্গা আবুল কালাম (৩৬) বলেন, গত ১০ দিন শঙ্কাহীন অবস্থায় ঘুমাতে পেরেছি। কিন্তু সোমবার ভোর হতে সীমান্তের ওপারে ফের গোলাগুলির আওয়াজে আবারও অস্থির অবস্থা বিরাজ করছে। মিয়ানমারের মংডুর মোলভী বাজার, পুর্মা, চাকমা পাড়া, বালুখালি, কুমরখালি, চামবনা এলাকায় প্রচণ্ড গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে।

ইত্তেফাক/ইআ