বিশ্বমন্দার প্রতিধ্বনি ও বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় দেশে দেশে ব্যয়সংকোচন ও কৃচ্ছ সাধনের নীতি অবলম্বন করা হইতেছে। সাম্প্রতিক কালে আমরা সম্পাদকীয় স্তম্ভে এই ব্যাপারে বারংবার তাগিদ ও ইঙ্গিত দিয়া আসিতেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও গত মঙ্গলবার দেশবাসীর উদ্দেশে সেই কথারই প্রতিধ্বনি তুলিলেন; কিন্তু এই মর্মবাণী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী হইতে শুরু করিয়া সর্বস্তরের মানুষের কর্ণকুহরে কতটা পৌঁছাইতেছে, সেই ব্যাপারে আমরা যথেষ্ট সন্দিহান। আমরা এই ব্যাপারটা উন্নত দেশের নাগরিকদের মতো কতটা আমলে নিতেছি সেই প্রশ্নও রহিয়া গিয়াছে। আমরা এখনো জমিদারি কায়দায় চলিতেছি। চুরি, দুর্নীতি, অনিয়ম, সিস্টেম লস ইত্যাদি পূর্বের মতোই বহাল তবিয়াতে আছে। ইত্তেফাকের খবরে বলা হইয়াছে, চট্টগ্রামে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার গ্যাস বিল বকেয়া পড়িয়াছে। অবৈধ সংযোগ লইয়া গ্যাস চুরির মহোত্সবও বন্ধ হয় নাই। ইহা চট্টগ্রাম কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানির একটি চিত্র। এইভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা খাতে সমগ্র দেশে কী পরিমাণ অর্থ বকেয়া পড়িয়া রহিয়াছে তাহা চিন্তা করিতে গেলে বিস্মিত না হইয়া পারা যায় না।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে একনেকের এক সভা সূত্রে জানা যায়, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দেশে বিদ্যুতের বিল বকেয়া রহিয়াছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। গ্যাসের বিল বকেয়া রহিয়াছে ৬ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। এখন এই পরিসংখ্যানের হেরফের হইতে পারে; কিন্তু বকেয়া বিল আদায়ে সাফল্য অর্জিত হইয়াছে এমনটি বলিবার অবকাশ নাই। গ্যাস চুরি বন্ধ, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ ও বকেয়া আদায়ে অভিযান পরিচালনার জন্য আলাদা ভিজিল্যান্স বিভাগ রহিয়াছে। তবে সেই বিভাগ কতটা কাজ করিতে পারিতেছে সেই প্রশ্ন উঠাটাও অস্বাভাবিক নহে। উল্লেখ্য, খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানেই যখন সরকারি বিভিন্ন নাগরিক পরিষেবার বিল বকেয়া থাকে, তখন অন্যরা ইহাতে উত্সাহিত না হইয়া পারে না। অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতে যেই পরিমাণ অর্থ বকেয়া পড়িয়া রহিয়াছে তাহা নিয়মিত পরিশোধ করা হইলে দেশে সিস্টেম লস কমিয়া আসিবে বহুলাংশে; কিন্তু সেই ব্যাপারে আমাদের তেমন কোনো উদ্যোগ নাই বলিলেই চলে। তাহার পরিবর্তে কেবল বেসরকারি পর্যায়ে অভিযান পরিচালিত হইতেছে। যেভাবে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিকট হইতে গলায় পাড়া দিয়া বিল আদায় করা হইতেছে, তাহাতে তাহা এই সকল কলকারখানা চলিবে কীভাবে? পাওনা টাকা পরিশোধের সুবিধার্থে প্রয়োজনে বিভিন্ন ইনস্টলমেন্ট বা কিস্তিতে প্রদানের সুযোগ দেওয়া উচিত।
আমরা মনে করি, সরকারি পরিষেবার বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানকেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করিতে হইবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পে চুরি, দুর্নীতি, অপচয়, অনিয়ম ও সিস্টেম লসের কারণে যে ক্ষতি হইতেছে তাহা উলটা জনগণের নিকট হইতে অতিরিক্ত ভ্যাট-ট্যাক্স বা টোল আকারে আদায় করা হইতেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা ও অনিয়মের কারণে জনগণকে তাহার মাশুল গুনিতে হয়। চৌর্যবৃত্তির পাশাপাশি কাজের মান খারাপ হইলেও টোলের হার বাড়ানো হইতেছে যাহা দুঃখজনক। দুর্নীতির বোঝা শেষমেশ জনগণের স্কন্ধে চাপাইয়া দেওয়ার কারণে আপাতদৃষ্টিতে মনে হইতে পারে যে, সরকারি লোকেরা কখনো দুর্নীতি করেন না। সাধারণ জনগণ এত হিসাব বোঝেন না বলিয়াই তাহারা বৎসরের পর বৎসর ইহার ঘানি টানিয়া যাইতেছেন। ব্রিটিশ আমলে বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরি হইলে তাহার ক্ষতি পুষাইতে উপরন্তু সেই এলাকার জনগণের নিকট হইতে চাঁদা আদায় করা হইত। এখনো যে এমনটা হয় না এবং চোর চক্রের সহিত একশ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর যে যোগসাজশ নাই, তাহা নিশ্চিত হইয়া বলা যায় না। একইভাবে সরকারি অপচয় ও দুর্নীতির অর্থ উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ের মতো ১৭ কোটি মানুষের কাঁধে চাপানোর প্রবণতা বন্ধ করিতে হইবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে বকেয়া বিল আদায়ের জন্য অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনিতে হইবে।
