নারী-পুরুষের সমতায়ন এবং পিতৃত্বকালীন ছুটি

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২২, ০০:৫০

দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের কর্মক্ষেত্র ও জনজীবনে অংশগ্রহণ কিংবা সামগ্রিক অগ্রগতিতে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি একটি বড় বাধা। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুশাসনের কারণে লিঙ্গনির্ভর ভূমিকা বা লিঙ্গভিত্তিক দায়িত্ববণ্টন লিঙ্গবৈষম্যের অন্যতম একটি কারণ। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও লিঙ্গসমতার অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে সাংস্কৃতিক অনুভূতি ও ধ্যানধারণা, যা এখনো অবধি প্রথাগত লিঙ্গনির্ভর ভূমিকার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। লিঙ্গভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন পিতৃতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। যার ফলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তৈরি হয় এবং নারীদের প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। পিতৃতান্ত্রিকতা নারীদের অধীন রাখার অবকাঠামো তৈরি করে এবং নারীদের অর্থনৈতিক কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করে। আবার পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলো যদি সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা নারীদের জ্ঞান ও বিশ্লেষণের দক্ষতা এবং নারী প্রতিনিধিত্বকে হেয় প্রতিপন্ন করে। তাই নারীদের সামগ্রিক উন্নয়নে লিঙ্গবৈষম্য নিরসনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা গুরুত্বপূর্ণ, একই সঙ্গে সব কাজে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি।

আমাদের শ্রম আইন, ২০০৬-এর ৪৬ নম্বর ধারা অনুসারে গর্ভবতী নারী শ্রমিক তার প্রসবের প্রত্যাশিত তারিখ পর্যন্ত দুই মাস এবং প্রসবের দিন থেকে পরবর্তী দুই মাস, মোট চার মাস বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন। আবার বাংলাদেশ চাকরি বিধিমালার ১৯৭ (১) বিধি অনুসারে নারী সরকারি কর্মচারীরা সর্বোচ্চ ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন। আমাদের দেশের বিদ্যমান আইনে নবজাত সন্তানের পরিচর্যা বা প্রতিপালনের জন্য পিতৃত্বকালীন কোনো ছুটির বিধান নেই, যদিও সন্তান জন্মদান প্রক্রিয়ায় পিতা-মাতা দুই জনেই সমান অংশীদার। বিদ্যমান আইনে সরকারি কর্মচারী কিংবা শ্রমিক কারো জন্যই পিতৃত্বকালীন ছুটির কোনো বিধান নেই, শুধু নারীকেই মাতৃত্বকালীন ছুটির অনুমোদন দেওয়া হয়। 

আমাদের নারীরা নানা ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক বাধা মোকাবিলা করে শ্রমবাজারে বা কর্মজীবনে অংশগ্রহণ করেন। সন্তান প্রতিপালনে মায়ের ভূমিকাকে যদি পরোক্ষভাবেও মুখ্য গণ্য করা হয়, তাহলে যেসব মায়েরা কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক তাদের ওপর সামাজিক ও পারিবারিক অনুশাসনগুলো আরো বেশি জোরদার হতে পারে। অন্যদিকে পিতৃত্বের দায়িত্ব পালনে পুরুষদের উত্সাহিত করা গেলে এবং সমঅংশীদার করা গেলে নারীসহ সমগ্র জাতি উপকৃত হবে। পিতৃত্বকালীন ছুটির অনুমোদন সন্তানদের জীবনে পিতার অবস্থান ও ভূমিকা দুটোতেই বিস্তর পার্থক্য তৈরি করতে পারে। এটি পারিবারিক বন্ধন আরো সুদৃঢ় করতে পারে,অধিকসংখ্যক নারীকে স্বাবলম্বী করে তুলতে পারে। সর্বোপরি এ  ধরনের উদ্যোগ শুধু কর্মক্ষেত্র নয়, সামাজিক-রাষ্ট্রীয় সব ক্ষেত্রে লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করতে পারে। সারা বিশ্বে প্রথম সুইডেন ১৯৭৪ সালে বেতনসহ পিতৃত্বকালীন ছুটির অনুমোদন দেয়। লিঙ্গসমতা নিশ্চিতে দেশটি সন্তানের পিতা ও মাতা উভয়কে অভিভাবকীয় ছুটি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ দেয়। প্রতি সন্তানে সব মিলিয়ে অভিভাবকদের ৪৮০ দিন পর্যন্ত ছুটির অনুমতি দেয় দেশটি, যার মধ্যে ৩৯০ দিন পর্যন্ত বেতনের ৮০ শতাংশ দেওয়া হয়। একজন অভিভাবক তার প্রাপ্য ২৪০ দিনের ছুটি থেকে ১৮০ দিন ছুটি অপর জনের সঙ্গে বদল করতে পারেন; কিন্তু ৯০ দিনের ছুটি বাধ্যতামূলক। সুইডেনে যেহেতু ট্যাক্সের পরিমাণ অনেক বেশি। তাই সেখানে এত বেশিসংখ্যক দিনের জন্য বেতনসহ ছুটি দেওয়া সম্ভব। আবার জার্মানিতে বিনা বেতনে তিন বছর পর্যন্ত অভিভাবকীয় ছুটি দেওয়ার বিধান আছে। এই ছুটি পিতা-মাতারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে পারবেন। যদিও অভিভাবকীয় ছুটি অবৈতনিক, সদ্যপিতামাতারা অভিভাবকীয় ভাতার জন্য আবেদন করতে পারবেন, যার পরিমাণ প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ৩০০ ইউরো এবং সর্বোচ্চ ১ হাজার ৮০০ ইউরো। এছাড়াও পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে, যেমন :অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে পিতৃত্বকালীন ছুটির বিধান আছে। এমনি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত সরকারি কর্মচারীদের জন্য ১৫ দিন পর্যন্ত পিতৃত্বকালীন ছুটির অনুমোদন দেয়।

লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করতে এবং লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক অনুশাসনগুলোর পরিবর্তন আনতে বাংলাদেশেও সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়ে পিতৃত্বকালীন ছুটির অনুমোদন দেওয়া প্রয়োজন। আমাদের সংবিধানে জনজীবনে নারী-পুরুষের সমতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, সব পর্যায়ে বৈষম্য হ্রাসের কথা বলা হয়েছে ও ন্যায়ানুগ সমাজগঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছে। বিদ্যমান সরকারি নীতিমালাসমূহেও লিঙ্গবৈষম্য নিরসনের অঙ্গীকার রয়েছে। জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) লিঙ্গসমতা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণের ওপর জোর দেয়। ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন পপুলেশন ডেভেলপমেন্ট ১৯৯৪, বেইজিং প্ল্যাটফরম ফর একশন ১৯৯৫ নারীর ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গসমতার পক্ষে। আবার কনভেনশন অন দি এলিমিনেশন অব অল ফর্মস অব ডিসক্রিমিনেশন এগেইনস্ট ওমেন, ১৯৭৯ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে নারীর প্রতি বৈষম্য রোধে প্রয়োজনীয় আইন তৈরির তাগিদ দেয়। 

শ্রমবাজারে আমাদের প্রায় ৩৮ শতাংশ নারী অন্তর্ভুক্ত আছেন। নারীরা কাজ করছেন বিভিন্ন পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠানে, কারখানায়, অলাভজনক হাসপাতাল, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠানে। এছাড়াও প্রশাসনে ও ব্যবস্থাপনামূলক কাজেও অনেক নারী সম্পৃক্ত আছেন। সরকারি চাকরিতে কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রায় ২৭ শতাংশ আছেন নারী কর্মকর্তা। সব কর্মজীবী নারীদের সমধিকার ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিতে পিতৃত্বকালীন ছুটি সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এটি নারী-পুরুষের মধ্যে বেতনবৈষম্য নিরসনে সাহায্য করবে। পিতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা নারীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তনেও সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। এটি নারীদের কর্মজীবী হতে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আরো শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে উত্সাহিত করবে এবং সন্তান প্রতিপালনেও সহায়ক হবে। শহরে অনেক ছোট পরিবারে একটি শিশু জন্মগ্রহণের পর শুধু বাবা এবং মা-ই থাকেন সন্তানের দেখভালের জন্য। সদ্যোজাত সন্তানের দেখভালের সময় প্রসূতি মা যেন নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন তার জন্য বাবার পাশে থাকা প্রয়োজন হয়। পিতৃত্বকালীন ছুটি পিতাদের সন্তানের ব্যাপারে আরো সংবেদনশীল করবে।

 প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে বিগত এক যুগে নারীর ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গসমতা নিশ্চিতে দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। এই ধারাবাহিকতাকে আরো এগিয়ে নিতে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সর্বোচ্চসংখ্যক নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পিতৃত্বকালীন ছুটি একটি বড় নিয়ামক হতে পারে। পিতৃত্বকালীন ছুটি প্রাথমিক পর্যায়ে তিন মাস পর্যন্ত দেওয়া যেতে পারে, যার মধ্যে এক মাস বাধ্যতামূলক এবং পরবর্তী দুই মাস ঐচ্ছিক রাখা যেতে পারে। আবার পুরুষেরা যেন পিতৃত্বকালীন ছুটি নেন তার জন্য উদ্দীপকও রাখা যেতে পারে। যেমন :কর্মজীবী পিতা তার বেতনের ৩০ শতাংশ সন্তানের দেখাশোনার জন্য পাবেন অথবা বিশেষ কোনো ভাতা পাবেন। যেসব ক্ষেত্রে ঘরে বসে বা দৈনিক কিছু ঘণ্টার জন্য কাজ করা সম্ভব, সেখানে কর্মজীবী পিতাকে সেই অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের শ্রম আইন এবং সরকারি চাকরি বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা যেতে পারে। 

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০১৯ সালের ঘোষণাপত্রে আয়বৈষম্য রোধ ও নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করার অঙ্গীকার করা হয়। ঘোষণাপত্রে আওয়ামী লীগের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল নারীর ক্ষমতায়ন, নারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ এবং নারীদের উন্নয়নে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে নারীর অধিকার ও সুরক্ষার ওপরেও জোর দেওয়া হয়। উপরিউক্ত অঙ্গীকারসমূহ বাস্তবায়নে গত কয়েক বছরে নতুন আইন ও বিধিমালা তৈরি হয়েছে, বৈষম্যমূলক আইনি ধারা পরিবর্তিত হয়েছে, আবার বিভিন্ন নীতিমালায় নারীর অংশগ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। শিক্ষায় নারীর শতভাগ অংশগ্রহণ নিশ্চিতে দেওয়া হয়েছে বৃত্তি, বিনা মূল্যে বই ও স্কুলের পোশাকের খরচ। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ে। প্রশাসনসহ নানা পর্যায়ে নারীদের পদচারণা বৃদ্ধিতে সহায়ক পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে আরো এগিয়ে নিতে এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণকে সর্বোচ্চ হারে বাড়াতে পিতৃত্বকালীন ছুটির অঙ্গীকার এই নারীবান্ধব দলটির কাছেই কাম্য। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহারে পিতৃত্বকালীন ছুটির অঙ্গীকার হতে পারে  কর্মজীবী  নারী  ও  পুরুষ উভয়ের জন্য আওয়ামী লীগের বিশেষ উপহার।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ মহিলা অওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক

ইত্তেফাক/ইআ