ঘুষ বৈধকরণের দাবি কোনো নতুন দাবি নয়। অনেক গুরুজনও এমন কথা বলে গিয়েছেন, কেউ মজার ছলে তো কেউ কিছুটা রাগে-অভিমানে। সাধারণ চায়ের আড্ডাতেও কেউ কেউ এমন কথা বলে বসেন, হেসে খুন হন আশপাশের ‘আড্ডার্থিরা’। তবে আমি এসেছি সিরিয়াস হয়ে, রাগ-অভিমান নেই, মজা করার তো প্রশ্নই নেই। আমজনতার এসব বদঅভ্যাস নাকি থাকতে নেই।
অনেকেই হয়তো ভাবছেন—যারা ঘুষ নেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তো তারা শক্তিশালী পক্ষ, বৈধ-অবৈধ তাদের কীই-বা আসে যায়? আসলে তাদের নয়, আসা-যাওয়াটা বহুলাংশেই আপনার-আমার। ২০১১ সালে ভারতের তত্কালীন প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা তার এক গবেষণাপত্রে বলেছিলেন, অন্তত একটা ক্ষেত্রে ঘুষ প্রদান বৈধ করা উচিত, বিশেষত যারা ঘুষ দেন (বা বলা যায় ঘুষ দিতে বাধ্য হন) তাদের উপকারেই। যেসব ক্ষেত্রে ঘুষ না দিলে সেবাগ্রহীতাকে তার ‘প্রাপ্য ন্যায্য সেবা’ পেতেও নানান ধরনের ঝুট-ঝামেলা সইতে হয়, সেগুলোকে ‘হ্যারাসমেন্ট ব্রাইব’ আখ্যা দিয়ে কৌশিক বসু নামের সেই ভদ্রলোক দিয়েছিলেন অবাক করা তত্ত্ব। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় নিয়োজিত এই অর্থনীতিবিদের মতে যেহেতু ঘুষ আদান-প্রদান অবৈধ এবং যেহেতু এই ধরনের ঘুষ না দিলে সাধারণ নাগরিকের নানা ঝামেলায় পড়তে হয়, তাই এক্ষেত্রে ঘুষ প্রদানকে বৈধতা দেওয়াই মঙ্গল।
তিনি বলেছেন, তাতে যারা ঘুষ দিতে পছন্দ করেন না কিন্তু বাধ্য হয়ে দেন, তাদের ঘুষের ব্যাপারে অভিযোগ জানাতে সুবিধা হবে, ঘুষ আদান-প্রদান কিছুটা কমবে। বসু সাহেবের সব কথা না মানলেও ‘হ্যারাসমেন্ট ব্রাইব’ নামক ঘুষের যে পোক্ত অবস্থান আমাদের দেশেও আছে, সেটা না মেনে উপায় নেই। সুতরাং, নিজেদের পিঠ বাঁচাতেই আগে এই বৈধতা আমাদের দরকার। কারণ শুধু ভারত নয়, বিশ্বের আর দশটা দেশের মতো আমাদের দেশেও ঘুষ দেওয়া অপরাধ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দেশের কোন খাতে মানুষজন কী পরিমাণ ঘুষ দেন, তার হিসেব দিয়ে সম্প্রতি একটা রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। খানা বা পরিবারভিত্তিক সেই রিপোর্টের পরিসংখ্যান দেখে আমরা অনেকেই টিভি সেট বা সংবাদপত্রের পাতার দিকে একটু ঝুঁকে গিয়েছিলাম। টিআইবির রিপোর্ট বলেছে, দেশে পুলিশ, পাসপোর্ট, বিচারিকসহ বিভিন্ন দপ্তরে সেবা গ্রহণ করতে যাওয়া লোকদের সর্বোচ্চ ৭৪ ভাগ পর্যন্ত ঘুষ দিয়ে সেবা পেতে হয়েছে। অর্থাত্, প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবারকে ঘুষ দিয়ে সেবা নিতে হয়েছে। বিভাগ আর দপ্তরভেদে সেটা কমবেশি হয়েছে বটে, তবে খুব বেশি কমেনি।
টিআইবির এই রিপোর্ট আমাদের অন্যভাবে দেখারও সুযোগ রয়েছে। রিপোর্ট থেকে এটা বলাই যায়, আমাদের সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলো শত ভাগ ক্ষেত্রেই সেবা প্রদানে সক্ষম। যদিও সেখানে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সময় ঘুষ দিতে হয়েছে, তা সত্ত্বেও সেবা কিন্তু পাওয়া গিয়েছে। সেবা প্রদানে সফলতা শতভাগ! তো এই সেবা পেতে জনসাধারণ যে প্রকারের ঘুষ দিয়েছেন, সেগুলোর প্রায় সবই ‘হ্যারাসমেন্ট ব্রাইব’-এর অন্তর্ভুক্ত, তা সহজেই অনুমেয়। ৭৪ ভাগ লোকে ঘুষ দিয়ে সেবা নিয়েছেন বটে, তবে এটাও তো সত্য যে, বাকি ২৬ ভাগ লোকে সেবা পেয়েছেন একেবারে ফ্রি, মানে ঘুষ ছাড়াই।
এই যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রেই ঘুষ দেওয়া লাগল, এই ঘুষ বেশির ভাগ অনিচ্ছাকৃতভাবে দেওয়া। দ্রুত সেবা পেতে বা সেবা না পাওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্তির জন্যই এই ঘুষ। আর এটাও সহজেই অনুমেয়, যারা ঘুষ দিয়েছেন তারা বেশির ভাগই স্বল্প কিংবা সুনির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। তাদের আয়ের টাকা নির্ধারিত এবং তাদের টাকাটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ‘সাদা’ অর্থাত্ বৈধ । আর এখানেই শুরু আরেক সমস্যার। বাধ্য হয়ে দেওয়া এসব ঘুষের টাকা সাদা থেকে কালো হয়ে। কারণ ঘুষ তো অবৈধ আর অবৈধ কাজের টাকা সাদা থাকে না।
‘টাকার আবার রং, টাকা তো টাকাই!’ এমন ভাবাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে কালোটাকা সাদা করার যে একটা বিধান প্রতি বছরই সরকার করে দেয়, সেখানে আপনার-আমার কিন্তু লাভের হিসেব ঋণাত্মক। সরাসরি টের পাওয়া না গেলেও, এই ক্ষতি স্লো পয়জনের মতোই। সরকার উচ্চহারে কর বসিয়ে কালোটাকা সাদা করে, সেই সাদা হওয়া টাকাই আবার আপনার কাছে ফিরে আসে আর আপনি সেই সদ্য সাদা হওয়া টাকাই কোনো সরকারি অফিসে ফিরিয়ে দেন ঘুষ হিসেবে। সাদা টাকা আবার কালো হয়ে যায়। তবে এটা মনে করার কারণ নেই যে, শুধু ঘুষের কারণেই টাকা সব কালো হয়ে যাচ্ছে, যদিও এই কালো হয়ে যাওয়া সাদা টাকার পরিমাণ টিআইবির রিপোর্টে উল্লেখ আছে, প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা, তাও শুধু ২০২১ সালেই।
কালোটাকা যে মুদ্রাস্ফীতিতে বড় ভূমিকা রাখে, সেটাও অনেক গবেষণায় উঠে এসেছে। ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং গাণিতিক অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক সুব্রামানিয়াম স্বামী সেই ২০১১ সালেই বলেছিলেন, কালোটাকা ভারতের মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধিতে এতটাই প্রভাব বিস্তার করছে যে, তাতে সেদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ৯ ভাগ পর্যন্ত কমে যাচ্ছে। আমরা আমজনতা অর্থনীতি বুঝি না, তবে ঘুষের টাকায় যদি কেউ বাজার করেন, দরদামের তারতম্যে তার কিছু আসবে-যাবে না, এটুক সহজেই বোঝা যায়। ৮০ টাকার লাউ যখন দরদাম করতে করতে আপনি ৬০ টাকায় প্রায় নিয়েই নিয়েছেন, তখন পাশের জন ১০০ টাকায় নিয়ে নেবে। একদিকে ঘুষও দেব, অন্যদিকে বেশি দামে জিনিস কিনব। পরদিন কোনো সেবা নিতে গিয়ে দেখব ‘দ্রব্যমূল্য চড়া’, তাই ঘুষের রেটও ‘বড়’ অর্থাত্ বেশি। তার ওপর আবার ঘুষ দিয়েছি বলাও যাবে না, পাছে আবার জেল-জরিমানা হয়।
কৌশিক বসুর আগে আমাদের সর্বজনশ্রদ্ধেয় ড. আকবর আলি খান তার পরার্থপরতার অর্থনীতি বইয়ে ঘুষ নিয়েও যারা কাজ করে দেয় না, সেসব সরকারি কর্মচারীদের নিকৃষ্ট প্রজাতির কর্মচারী বলে তুলে ধরেছেন, গল্পের ছলে। তবে ঘুষ দিয়ে যারা বিরক্ত হন, তাদের চেয়ে ঘুষ দিয়েও যাদের কাজটা হয় না, তারা আরো বেশি বিরক্ত হবেন, সেটাই স্বাভাবিক।
যেহেতু ঘুষের দৈরাত্ম্য উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে, যেহেতু প্রতি দশবারে সাড়ে সাতবার ঘুষ দিতেই হচ্ছে, কিন্তু ঘুষ দিয়ে কাজ না হলে জেল-জরিমানার ভয়ে কোথাও অভিযোগ করারও আমাদের সুযোগ নেই, সুতরাং এ ধরনের ঘুষকে বৈধই করে দেওয়া হোক। পূর্ব ইউরোপের দেশ রোমানিয়ার সংসদে কিন্তু এ ধরনের একটা প্রস্তাব পাশও হয়েছিল, অতএব কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।
ন্যায্য সেবা দিতে যারা ঘুষ নেবেন তাদের টাকায় উচ্চ কর আর যারা ঘুষ দেবেন, তাদের টাকায় কর রেয়াতের ব্যবস্থা করে দিলে কেমন হয়! সেবাদানকারীদের ‘উপরি ইনকাম’ও জারি থাকুক, সাদা টাকা সাদাই থাকুক (বছরে অন্তত ১১ হাজার কোটি টাকা) আর আমরাও ‘অবৈধ’ কাজ করা থেকে মুক্তি পাই!
লাভ আরো আছে। আমরা তখন ঘুষের রেট নিয়ে দরদামও করতে পারব, ঘুষের রেট চড়ে গেলে রাস্তায় আন্দোলন করতে পারব, ‘আমি অনেক টাকা ঘুষ দিই’ বলে কেউ কেউ কলার নাচাতে পারব, আর যারা এমন ‘বৈধ’ ঘুষ নেবেন তারাও দামি কোনো পণ্য কিনে ফেসবুকে লিখতে পারবেন, ‘ঘুষের টাকায় আজ এটা কিনলাম!’ বোনাস পাওনা, অবৈধ ঘুষের খবর না পেয়ে টিআইবিরও তখন কাজ কমে যাবে, দেশের দুর্নীতির একটা খাতও কমে যাবে!
আখেরে সরকারেরও নাম হবে আর আমাদেরও পিঠ বাঁচবে।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী
