নিরাপদ খাদ্য, সে কি জাদুঘরে?

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২২, ০৩:৫১

সবার উপরে পেট সত্য। তার উপরে খাদ্য সত্য। কিন্তু খাদ্যের নিরাপত্তা না থাকলে বাঁচার উপায় কী? অনেকে বলেন জীবন-জীবিকার অতি গতিময়তা আর বিজ্ঞানের অপব্যবহারে বর্তমানে শস্যের চেয়ে আগাছা বেশি, খাদ্যের চেয়ে ঔষধ বেশি, অঙ্কের চেয়ে আতঙ্ক বেশি, চিন্তার চেয়ে চেতনা বেশি। অর্থাত্ পরিবেশ বিপর্যয় ঘটিয়ে আমরা নিজেরাই নিজেদের বিপদ ডেকে আনছি।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, যুদ্ধের প্রভাব, করোনার প্রভাব ইত্যাদি নানাবিদ বিষয়ে ‘ভবিষ্যত্ হিস্যাই’ এখন  চেতনার হট ইস্যু। তবে খাদ্য নিরাপত্তা এখন পর্যন্ত সর্বজনগ্রাহ্য কোনো ধারণা নয়। শুধু খাদ্য উত্পাদনের পরিসংখ্যানকেই  খাদ্য নিরাপত্তা বোঝায় না। বিশ্ব খাদ্য উত্পাদন, বাণিজ্যনীতি, বাণিজ্য  সম্পর্কিত নীতি, কৃষি সম্পর্কিত আইন ও নীতি, আয়সংক্রান্ত ধারা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশের মতো একটি শ্রেণিবিভাজিত রাষ্ট্রের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা আরো বহু পাক্ষিক ও বহুমাত্রিক ব্যাখ্যার বিষয়।  পারিবারিক কৃষি সংস্কৃতি ও বিন্যাস ভেঙে পড়েছে। প্রতিদিনই কৃষি থেকে বিচ্ছেদ হচ্ছে তরুণ প্রজন্মের। বাজারের মর্জিতেই ব্যবহূত হচ্ছে কৃষিজমি। খাদ্য বাণিজ্যের প্রতিপক্ষ নয়। খাদ্য এক বিরাজমান শ্রেণিসংস্কৃতি যার সঙ্গে মিশে আছে জীবনযাপনের রূপ-রস-বিহঙ্গ।

কিন্তু আমরা যা খাচ্ছি তা কি নিরাপদ? আমার এক বন্ধু বলল—খাদ্যে ভেজাল নাই, ভেজাল মানুষে। খারাপ মানুষই খাদ্যকে খারাপ করছে। এই গুটি কয়েক খারাপ মানুষের খপ্পরে কোটি কোটি মানুষ? নাকি সিন্ডিকেট?  আমরা জানি মিনিকেট নামে ধানের কোনো ‘জাত’ নেই। তাহলে মিনিকেট চাল আসছে কোথা থেকে? ইদানীং সবাই জানতে পারল ইতিহাস। ব্যবসায়ীরা ফেলে দেওয়া বা নষ্ট চাল কেটে ছোট করে পুষ্টি উপাদান সব ফেলে দিয়ে চকচকে বানিয়ে বছরের পর বছর ভদ্রলোকদের খাওয়াচ্ছে। হঠাত্ ভদ্রলোকরা টের পেয়েছে—এ কী! সরকার ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। এ তো পান্তাভাতে ঘি-র কাহিনি। মাছে ও ফলে ফরমালিন, রং লাগানো, সবজিতে কীটনাশক—এ আর নতুন কী। তবে এইসব নিয়ে সচেতনতার ব্যাপারেও আমরা সবাই অবগত। তাহলে উপায় কী? একজন বিজ্ঞানের ছাত্র মন্তব্য করলেন, ‘আইনের উপরে ঔষধ নাই, মাইরের উপরে ঔষধ নাই।’ যেমনটি ছিল লকডাউনের সময়। করোনায় অল্প সময়ে মরার ভয়টি ছিল ভীতিকর। ফলে লকডাউনে সেনাবাহিনীর আইনের প্রয়োগটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আর ভেজাল খাদ্যে যেহেতু দীর্ঘ সময় পরে কিডনি, লিভার নষ্ট এমনকি ক্যানসার সৃষ্টি হয়, এক্ষেত্রে যথাযথ আইন ও এর প্রয়োগে গাফলতি তো হবেই। তবে এটা সত্য যে নৈতিকতাবোধ জাগ্রত না হলে আইন কিংবা সচেতনতা কোনো কাজে আসবে না।

নিরাপদ খাদ্য বলতে আমরা কী বুঝি? ভৌতিক, জৈবিক ও রাসায়নিক—এই তিন স্তরেই খাদ্যের গুণগত মান বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। উত্পাদন, পরিবহন ও সংরক্ষণে সবক্ষেত্রে মানব-স্বাস্থ্যের ‘ক্ষতিকর’ উপাদান থেকে খাদ্যকে মুক্ত রাখা। রান্নার প্রক্রিয়ায় এবং ফ্রিজিংয়ে তাপমাত্রার বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি খাদ্য গ্রহণের সময় হাত নিরাপদ রাখার বিষয়েও বলা হয়েছে। বিষয়গুলোর কোনো একটির ব্যত্যয় ঘটলে খাবার নিরাপদ থাকার সুযোগ থাকে না। বাংলাদেশের মানুষের বিজ্ঞানের জ্ঞান ও সচেতনতা কতটুকু তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর পরও চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। হাতে হাতে ইন্টারনেট। উত্পাদনের সমস্ত ক্ষেত্রে ট্রেসিবিলিটি ট্র্যাক করতে হবে। জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য পরিবহনে কুল চেইন মেইনটেন করতে হবে। সংরক্ষণের ক্ষেত্রে খাদ্য ও পরিবেশের বিজ্ঞানসম্মত  নিয়ম-নীতি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে কৃষক তথা উত্পাদক, পরিবহন ও  সংরক্ষণের সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সাধারণ জনগণকে খাদ্য, পুষ্টি ও পরিবেশ বিষয়ে কমিউনিটিভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।  হয়তো একদিন এ বিষয়ে পরিপূর্ণ চেতনাবোধ জাগ্রত হবে। সর্বোপরি খাদ্য নিরাপত্তা ও নিরাপদ খাদ্যের অন্যায্য বাণিজ্যের কারাগার থেকে খাদ্যকে মুক্ত করতে দরকার খাদ্যবান্ধব রাষ্ট্রীয় নীতি ও আইন এবং এর যথাযথ প্রয়োগ। গত এক দশকে দেশের অবকাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। উর্বর মাটি, রকমারি পানি, পর্যাপ্ত সূর্যের আলো, অফুরন্ত শ্রম শক্তি আর আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তিতে হতে পারে বাংলাদেশই ভবিষ্যত্ খাদ্য নিরাপত্তার বিশ্বনায়ক।

পুষ্টিবিদ ও মত্স্য বিশেষজ্ঞ, যশোর

ইত্তেফাক/এএইচপি