বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের নাম শেখ রাসেল। মাত্র দেড় বছরের বয়সেই কারাগার দর্শন হয় তার। যে বয়সে শিশুরা মা-বাবার কোলে কোলে হাত-বদল হয়, সেই বয়সে পিতৃসান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয় এই শিশু। এরপর একবার মাসে দুয়েকবার করে বাবার কোলে ওঠার জন্য মায়ের কোলে চড়ে নিয়মিত জেলগেটে যেতে হতো তাকে। একই সঙ্গে উত্তাল রাজনীতির স্লোগান মুখরিত সময়ের সাথে সাথে বেড়ে উঠতে থাকে সে। বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত সময়ের দেশপ্রমের প্রেরণার ছাপ পড়ে ওই-প্রজন্মের শিশুদের মানসপটে, শেখ রাসেলও এর ব্যতিক্রম নয়।
১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর জন্মের পর, ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম জেলখানা দর্শন হয় শিশু রাসেলের। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু তার লেখা 'কারাগারের রোজনামচা'য় বলেছেন, '৮ ফেব্রুয়ারি দুই বছরের কম বয়সী ছেলে এসে বলে, আব্বা বালি (বাড়ি) চলো। কী উত্তর দিব ওকে? ওকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, ওতো বুঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম- তোমার মার বাড়ি তুমি যাও, আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো। ও কি বুঝতে চায়? কী করে আমাকে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে।'
শেখ রাসেলের জন্মের সময়টা অনেক কারণেই জাতির ইতিহাসের খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। ১৯৬৪ সাল। বাঙালি জাতির স্বাধীনতার অভিমুখে চূড়ান্ত যাত্রার ইতিহাসে প্রায় বিস্মৃত, অথচ অতি-গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক। কারণ, ১৯৫৮ সালে স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খান রাজনীতি নিষিদ্ধ করেন। ভয়ে মুচলেকা দিয়ে রাজনীতি ছেড়ে দেন বর্ষীয়ান নেতারা। নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় সব রকমের রাজনৈতিক দল। পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে এই ভূখণ্ডে প্রকাশ্যত রাজনীতি ছিল না বললেই চলে। কিন্তু রাজনীতি ছাড়ার মুচলেকা না দেওয়ায় বারবার জেল খাটতে হয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও যুক্তফ্রন্ট প্রাদেশিক সরকারের সাবেক মন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সাবেক ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান ততদিনে জাতিয় পরিসরে আওয়ামী রাজনীতির পোস্টারে পরিণত হয়েছেন। তাই তাকে টার্গেটে পরিণত করে পাকিস্তানি জান্তারা। স্বৈরাচারের রোষানলে পড়ে পুরো সময়টায় বারবার জেলে আটক থাকতে হয় তাকে। অবশেষে ১৯৬৩ সালে মুক্তি পান তিনি। ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি, ধানমন্ডির বাসভবনে কাউন্সিল ডেকে নিষ্ক্রিয় আওয়ামী লীগকে পুনর্জীবিত করেন। পাকিস্তানি জান্তাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, আওয়ামী লীগকে সেদিন বঙ্গবন্ধু পুনর্জীবন দিয়েছেন বলেই, এর মাত্র অর্ধযুগ পর আমরা পেয়েছি মহান স্বাধীনতা।
আওয়ামী লীগের পুনর্জীবন লাভ করার ঘটনাটি তাই বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের এক অপরিহার্য অংশ। আর ইতিহাসের এই মহালগ্নেই জন্ম হয় বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের। দলকে সক্রিয় করার পর, দেশজুড়ে যখন আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের গণসংযোগে ব্যস্ত বঙ্গবন্ধু; ঠিক তখনই, ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর জন্ম নেয় এই শিশু। পিতা মুজিবের নেতৃত্বে 'তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’ স্লোগানে জাতি তখন এক সূতোয় গেঁথে উঠছে; অন্যদিকে মা ফজিলাতুন নেছার কোলের সন্তান রাসেলের মুখেও আধো আধো বুলি ফুটতে শুরু করে।
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা ঘোষণার পর, জাগতে শুরু করে ঘুমন্ত বাঙালি জাতি; আর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের অর্ধনির্মিত বাড়িটিকে একটু একটু করে গড়ে তুলতে থাকেন বঙ্গমাতা, একইসঙ্গে ক্রমেই হাঁটি হাঁটি পা পা করে হাঁটতে শুরু করে তাদের কনিষ্ঠ সন্তান শিশু রাসেল। একই সঙ্গে মায়ের সঙ্গে নিয়মিত জেলগেটে গিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করতে অব্যস্ত হয়ে ওঠে সে।
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার লেখা 'আমাদের ছোট রাসেল সোনা' বইয়ে তিনি সেই সময়ের প্রসঙ্গে লিখেছেন, ''আব্বার সঙ্গে প্রতি ১৫ দিন পর আমরা দেখা করতে যেতাম। রাসেলকে নিয়ে গেলে ও আর আসতে চাইত না। খুবই কান্নাকাটি করত। ওকে বোঝানো হয়েছিল যে, আব্বার বাসা জেলখানা আর আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি। আমরা বাসায় ফেরত যাব। বেশ কষ্ট করেই ওকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হতো। আর আব্বার মনের অবস্থা কী হতো, তা আমরা বুঝতে পারতাম। বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা ওকে বোঝাতেন এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। মাকেই আব্বা বলে ডাকত।'
রাসেলকে নিয়ে 'কারাগারের রোজনামচা'র ২৭ এবং ২৮ মে ১৯৬৭ সালের স্মৃতিচারণায় বঙ্গবন্ধু নিজে লিখেছেন, 'আড়াই বৎসরের ছেলে আমাকে বলছে ৬ দফা মানতে হবে- সংগ্রাম, সংগ্রাম- চলবে চলবে।' জিজ্ঞাসা করলাম, 'ও শিখল কোথা থেকে'। রেণু বলল, 'বাসায় সভা হয়েছে, তখন কর্মীরা বলেছিল, তাই শিখেছে।'
জাতীয় মুক্তির মুখরিত স্লোগান শুনে যার কথা বলা শুরু, গণজাগরণের তীব্র গতি থেকে যে হাঁটার সামর্থ অর্জন করেছিল; ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক যার বেড়ে ওঠার সিঁড়ি হয়েছে। সেই শিশুর নাম শেখ রাসেল। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের তুমুল স্লোগান ফুটেছে তার কচি কণ্ঠে। ১৯৭১ এর ২৩ মার্চ, বঙ্গবন্ধুর হাত দিয়ে স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলনের পর, জনগণের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে জয় বাংলা স্লোগান দিয়েছে শিশু রাসেল। এরপর নিজের সাইকেলে সেই পতাকা লাগিয়ে ঘুরেছে।
ওই সময়ের বাঙালি শিশুরাও, ঠিক এভাবেই, অগ্রজদের মুক্তি সংগ্রামের তীব্র আবেগে মথিত হয়েছে। রাসেল তাই আমাদের মুক্তি সংগ্রামের উত্তাল সময়ের শিশুদের মানসপটের প্রতিনিধিত্ব করে। সত্তরের দশকে, ঘরে ঘরে বাঙালি শিশুরা এভাবেই দেশপ্রেমের আবেশ মেখে বেড়ে উঠেছে। নিজেদের কল্পজগতজুড়ে, একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়ার স্বপ্নের চারা বুনেছে।
২৫ মার্চ, ১৯৭১। রাত নামার সাথে সাথে ঢাকা শহরে গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তানিরা। ২৬ মার্চ, প্রথম প্রহর; বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু। সাথে সাথেই আক্রান্ত হয় তার বাড়ি। জান্তাদের গুলি এসে পড়ে ঘুমন্ত রাসেলের পায়ের কাছে। পিতা মুজিব তাকে নামিয়ে নেন বিছানা থেকে। তাই সেবার পাকিস্তানিদের হিংস্র থাবা থেকে প্রাণে বেঁচে যায় সে।
তবে স্বাধীনতার পর পরাজিত শক্তির আক্রোশ থেকে আর বাঁচতে পারেনি রাসেল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারের হত্যার পর শিশু রাসেলকেও নির্মমভাবে হত্যা করে পিশাচরা। এরপর এভাবেই হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে ঘাতকচক্র। আমাদের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের বাঁক ছুঁয়ে আসা একটি প্রজন্মের কাউকে শারীরিক- কাউকে মানসিকভাবে- নিঃশেষ করে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে বাঙালি জাতি এগিয়ে যাচ্ছে। বর্বরতামুক্ত বাংলাদেশে সুন্দর স্বপ্ন নিয়ে আগামী শিশুদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত হয়েছে। রাসেল বেঁচে থাকবে সমৃদ্ধ তারুণ্যের অফুরাণ প্রাণশক্তিজুড়ে।
বেঁচে থাকলে শেখ রাসেলের বয়স এখন ৫৮ বছর হতো। পরিণত মানুষ হিসেবে হয়তো শেখ রাসেল আজ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের 'সোনার বাংলা' বিনির্মাণে সামিল হতেন। ভিশন ২০২১, ২০৩০, ২০৪১, ডেল্টা প্ল্যান, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, সজীব ওয়াজেদ জয় এখন যেমন দেশের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন, তিনি বেঁচে থাকলে নিঃসন্দেহে নিজেকে সেভাবেই দেশের জন্য নিয়োজিত রাখতেন। কিন্তু শিশু রাসেলকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে ঘাতকরা শুধু মানব সভ্যতার ইতিহাসে ঘৃণ্যতম অপরাধই করেনি; সেই সঙ্গে ধ্বংস করেছে একটি সম্ভাবনাময় শিশুর সব ধরনের অবিকশিত সম্ভাবনা।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, শেখ রাসেলের জীবনের পরিধি ছিল খুবই কম সময়ের। এত ছোট জীবনে সে কোনো রাজনীতি বুঝতো না, বৈষম্য বুঝত না। কিন্তু মনের অবচেতনেই দুরন্ত রাসেল তার আশেপাশের সব মানুষকে ভালোবাসতে শিখেছিল। বাঙালির চিরন্তন পারিবারিক সম্পর্কের বন্ধনে অনাবিল উচ্ছ্বাস নিয়ে বেড়ে উঠতে শুরু করেছিল। চঞ্চল পাখির মতো এই ছোট্ট মায়াবী শিশুটি যেভাবে প্রচণ্ড নির্মমতম শিকার হয়েছিল, তা এখনো বিশ্ব মানবতাকে বিচলিত করে। ৫৯-তম জন্মদিন তথা ৫৮-তম বার্ষিকীতে, শেখ রাসেলকে স্মরণ করি গভীর আবেগ, ভালোবাসা ও বেদনামথিত হয়ে। আসুন সবাই মিলে অঙ্গীকার করি- আর কোনো শিশুর জীবনে যেনো এমন বর্বরতা না আসে। দেশের প্রতিটি শিশুই বেড়ে উঠুক প্রাণোচ্ছ্বল পরিবেশে।
লেখক: কবি ও সদস্য, জাতীয় কবিতা পরিষদ।
