অভিনয়ে এলাকাকে তুলে ধরেছেন মাসুম আজিজ

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২২, ২০:০৯

চলচ্চিত্রে একুশে পদকপ্রাপ্ত অভিনেতা ও নাট্য নির্মাতা মাসুম আজিজ ছিলেন নির্লোভ, নিরহংকারী ও একজন ভালো মনের মানুষ। ছোট থেকে বড় সবার সঙ্গে ছিল তার হৃদিক সম্পর্কের বন্ধন। প্রতিবেশীসহ আত্মীয়স্বজনদের মুখে মুখে তার প্রশংসার কথা।

স্থানীয়রা বলছেন, তিনি নাট্য জগতে প্রবেশের পর নিজ এলাকাকে যেভাবে রঙ্গিন পর্দায় তুলে ধরেছেন সেই গুণী মানুষকে আমরা হারালাম। সনাতন গল্প সিনেমার শুটিং করেছেন নিজ এলাকাতে। ওই সিনেমায় নিজ উপজেলা পাবনার ফরিদপুর উপজেলার নিজ বাড়ি খলিশাদহসহ বন্যাকান্দি, গোপালনগর, সোনাহারা, বনওয়ারীনগর বাজার ও খাগড়াবাড়িয়ার বিভিন্ন লোকেশনে শুটিং করেছেন।

মাসুম আজিজের মৃত্যুর সংবাদ নিজ এলাকায় পৌঁছালে প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ও সুহৃদদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। গ্রামের বাড়িতে মাসুম আজিজের কেউ না থাকলেও মনের সান্ত্বনা দিতে ও পেতে ছুটে আসেন তারা।

নাট্যকার ও অভিনেতা মাসুম আজিজের গ্রামের বাড়ি পাবনার ফরিদপুর উপজেলার পৌর সদরের খলিশাদহ গ্রামে গিয়ে দেখা পাওয়া যায় বিজয় আহমেদ শাহান নামের এক যুবকের। সে ওই বাড়ির কেয়ারটেকার। ২৬ বছর ধরে এই বাড়িটি দেখা শোনা করছেন তিনি। এ এলাকায় সাহান মানেই মাসুম আজিজের ডাক বাক্স। মাসুম আজিজের কোন খোঁজ খবর বা তথ্য আদান প্রদানে সাহানই একমাত্র ব্যক্তি।

আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়া সাহান বলেন, করোনার পর গ্রামে আসা কমিয়ে দিয়েছিলেন। আগে ২/৩ মাস পরপর আসতেন। আর নাটক ও সিনেমার জন্য ছুটে আসতেন নিজ বাড়িতে। এতো ভালো মনের মানুষ তিনি এটা কেমনে বোঝাই।

সাহান বলেন, ছোট থেকে তিনি  ছোট ভাইয়ের মতো দেখে আসছিলেন আমাকে। আমি এই বাসার সবকিছু দেখাশোনা করতাম। আমি অভিভাবক হারালাম।

প্রতিবেশী কৃষক হেলাল উদ্দিন বলেন, এতো ভালো মানুষ এটা বলে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। এ গ্রাম বা এলাকাকে তিনি তার নাটকের মাধ্যমে যেভাবে তুলে ধরেছেন। আর হয়তো কেউ তুলে ধরবে না।

প্রতিবেশী আব্দুল হানিফ বলেন, আমি বিদেশ থাকতাম। আমার সঙ্গে হিন্দি ভাষায় কথা বলতেন। খুব মজা করতেন। তার সামনে বললে অনেক হাসি ঠাট্টা রহস্য করতেন। প্রধান শিক্ষক এসএম আব্দুর রব বলেন, বনওয়ারীনগর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানের রেজিস্ট্রেশন করার জন্য সর্বশেষ আসছিলেন প্রয়াত মাসুম আজিজ। এটাই ছিল তার নিজ এলাকাতে শেষ আসা।

ফরিদপুর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মেহেদী হাসান বলেন, নিজ এলাকাতে শেষবারে এসে তিনি আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসছিলেন। আমাকে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তার সঙ্গে যতটুকু মেশার সুযোগ পেয়েছি তাতে মনে হয়েছে এতোটা উদার, ভালো মন আর সামাজিক মানুষ। তাকে দেখে ও কথা বলেই বোঝা যেত।

স্থানীয় মুরুব্বীরা বলেন, মাসুম আজিজ এলাকা থেকে ঢাকাতে গেছে প্রায় ৫০ বছর। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়গুলো তিনি শৈশব ও কৈশোর কেটেছে তার। কিন্তু এ এলাকার অনেক মানুষ ঢাকাতে বা গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়ে নিজ এলাকায় তেমন যোগাযোগ রাখেনি। কিন্তু মাসুম আজিজ ভুলে যাননি নিজ এলাকাকে।

স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের কর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, তিনি নিজেই একটা সংগঠক। নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। এই গুণী মানুষ নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও নিজেকে জড়িয়েছিলেন। একজন সাদামনের মানুষ ছিলেন মাসুম আজিজ।

গত বৃহস্পতিবার সকালে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় অভিনেতাকে স্কয়ার হাসপাতালের ‘লাইফ সাপোর্টে’ নেওয়া হয়। সেখানে সোমবার বিকেলে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মাসুম আজিজ অভিনেতা ছাড়াও চিত্রনাট্যকার ও নাট্য নির্মাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি থিয়েটারে কাজের মাধ্যমে অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি প্রথম টিভি নাটকে অভিনয় করেন। হুমায়ূন আহমেদের ‘উড়ে যায় বকপক্ষী’, সালাউদ্দিন লাভলুর ‘তিন গ্যাদা’সহ দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ৪ শতাধিক নাটকে অভিনয় করেছেন। ‘ঘানি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ২০০৬ সালে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে রাইসুল ইসলাম আসাদের সঙ্গে যুগ্মভাবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান মাসুম আজিজ। এ বছর (২০২২) তিনি অভিনয়ে একুশে পদক লাভ করেন।

পারিবারিকভাবে তিনি ১ ছেলে ও ১ মেয়ের জনক। মঙ্গলবার ঈশার নামাজের পর বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়াজিউদ্দিন খান পৌর মুক্ত মঞ্চ মাঠে মরহুমের নামাজে জানাযার পরে তাকে ফরিদপুর কেন্দ্রীয় গোরস্থানে দাফন করা হবে বলে পারিবারিকভাবে জানানো হয়।

ইত্তেফাক/বিএএফ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন