একসময় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সেশনজটের কথা উচ্চারিত হইত বিভিন্ন মহলে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় একসময় সেশনজটের জন্য দুর্নাম কুড়াইয়াছিল। এখন এই সমস্যা হইতে আমরা অনেকটাই বাহির হইয়া আসিয়াছি। এখন আমাদেরকে দুইটি জট খুব পীড়িত করিতেছে। এক. যানজট ও দুই. বিসিএস জট। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা যখন ক্রমবর্ধমান, তখন বিসিএসসহ বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার জট লইয়া শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকগণ যারপরনাই বিরক্ত ও উদ্বিগ্ন। করোনার দোহাই দিয়া বিসিএস জট আর কত দিন ধরিয়া রাখা হইবে? এই জট অবিলম্বে খুলিয়া যাক, লক্ষ লক্ষ বেকার যুবকের এখন ইহাই বড় প্রত্যাশা।
পাবলিক সার্ভিস কমিশন তথা পিএসসিতে বর্তমানে চারটি বিসিএস পরীক্ষা আটকা রহিয়াছে। ইহাতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দপ্তর ও অধিদপ্তরে প্রথম শ্রেণির পদগুলিতে নিয়োগ দেওয়া যাইতেছে না। যাহারা ইতিমধ্যে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হইয়াছেন, তাহাদের নিয়োগ প্রদানে কেন বিলম্ব করা হইতেছে তাহাও আমাদের বোধগম্য নহে। পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ সকল কিছুই সম্পন্ন, কিন্তু নিয়োগ প্রদানে অযথা কালক্ষেপণ করা হইতেছে। ভাবিতেও অবাক লাগে, চার বত্সর পার হইয়া গিয়াছে, অথচ ৪০তম বিসিএসের নিয়োগ এখনো শেষ করিতে পারে নাই পিএসসি। তিন বত্সর ধরিয়া আটকা রহিয়াছে ৪১তম বিসিএসের নিয়োগ পরীক্ষা। ৪৩তম বিসিএস চলিতেছে দুই বত্সর ধরিয়া। আর ৪৪তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা নিতেই মূল্যবান এক বত্সর অতিক্রান্ত হইয়া গিয়াছে। স্বভাবতই ইহাতে চাকুরিপ্রার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িতেছে। একমাত্র স্বাস্থ্য ক্যাডারের ৪২তম বিসিএসের (বিশেষ) নিয়োগ প্রক্রিয়া তুলনামূলক কম সময়ে সম্পন্ন করিতে পারিয়াছে পিএসসি। প্রিলিমিনারি ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে এই নিয়োগ দেওয়ার কারণে ইহা সম্ভব হইয়াছে। গত পাঁচ বত্সরে পিএসসি পাঁচটি বিসিএসের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করিয়াছে। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী এক বত্সরের মধ্যে একটি করিয়া বিসিএসের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করিতে পারে নাই। পিএসসির এই অক্ষমতার পিছনে সমস্যা কোথায় তাহা লইয়া গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করিয়া দেখিতে হইবে। সংবিধিবদ্ধ এই প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াইতে প্রয়োজনে বৃদ্ধি করিতে হইবে জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট।
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে সরকারি চাকুরিতে প্রথম শ্রেণির মোট পদসংখ্যা ২ লক্ষ ৩৯ হাজার ১৫টি। তন্মধ্যে কর্মরত ১ লক্ষ ৯৫ হাজার ৬৭৯ জন। ইহার মধ্যে শূন্য রহিয়াছে ৪৩ হাজার ৩৩৬টি পদ। যদি আটকাইয়া থাকা চারটি বিসিএসের মাধ্যমে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে ১৬ হাজার পদ পূরণ করা সম্ভব হইবে। বাকি পদগুলি পূরণের জন্য পরবর্তী একাধিক বিসিএসের নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি অবিলম্বে শুরু করা প্রয়োজন। প্রতি বত্সরই সরকারি চাকুরি হইতে অবসর নিতেছেন বিসিএস কর্মকর্তারা। কিন্তু চাকুরিপ্রত্যাশীদের চাপ বাড়িলেও সেই শূন্য পদগুলিতে যথাশীঘ্রই নিয়োগ দেওয়া হইতেছে না, যাহা আমাদের মতে উন্নয়নশীল দেশের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিসিএস জট খুলিতে হইলে অনলাইনে প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার ব্যবস্থা করিতে হইবে এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ অন্যান্য প্রক্রিয়ার সহজীকরণ করিতে হইবে। এইভাবে বত্সরে দুইটি বিসিএস সম্পন্ন করা যাইতে পারে। চাকুরিপ্রত্যাশীদের হতাশা ও ক্ষোভ দূর করিতে হইলে পিএসসিকে এই ব্যাপারে সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। একই সঙ্গে তাহাদের চাকুরির বয়স বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্বের সহিত আমলে নেওয়ার সময় আসিয়াছে।
