তারা অপরাজনীতিকেই বেছে নেবে

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২২, ০২:২৫

রাজনৈতিক ধারাভাষ্য দেওয়ার সক্ষমতা প্রদানে তৃতীয় চোখ গুরুত্বপূর্ণ। সে চোখ দিয়ে সত্য বলার আপ্রাণ চেষ্টা না থাকলে, প্রহসন করা হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বাম-ডানপন্থিদের আবেগকে ধারণ করতে পেরেছে; নিজেদের উপযোগী শাসনব্যবস্থা কায়েমে পরিকল্পনা করে বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। তবে ৫১ বছর পর দেখা গেছে যে, দেশের বাম বলয়ের তাঁবুর আকার ও অবয়ব দিনে দিনে খর্বকায় হয়ে পড়েছে। কিন্তু তাদের গুটিকয়েক গুরুত্বপূর্ণ দাবিরূপে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একজন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে  সরকার পরিচালনা করার মধ্য দিয়ে তা বাস্তবায়িত হয়েছে। একইভাবে শেখ হাসিনা দীপ্ত উচ্চারণে থেকে বিশ্বনবি হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর নির্দেশনায় ভর করে জীবন-পরিক্রমা সাজানোর তাগিদ রেখে দেশের অপশক্তির আস্ফাালনকেও দমিয়ে রাখতে পেরেছেন। অন্যদিকে মানুষ রাজনৈতিকভাবে তাকে অসাম্প্রদায়িক চেতনাধারী ও এই পথের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দেখে।

আওয়ামী লীগের নিজেদের গঠনতন্ত্রকে সক্রিয় রাখা ও জনস্বার্থ বিবেচনায় দেশের অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থবহ অনুভূতিগুলো দূরে না সরিয়ে কার্যকর ভূমিকা নিতে পেরেছে, তা প্রমাণিত সত্য হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বিএনপি কি গেল দেড় যুগের বেশি সময় ধরে মূলধারার রাজনীতি হয়ে থাকতে পেরেছে? ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট থেকে গ্রেনেড হামলার মধ্য দিয়ে তারা রাজনৈতিক দল হিসেবে আর বিরাজ করতে পারেনি। কত সময় তারা পেয়েছে! অথচ, আওয়ামী লীগের মতো ২১০০ সালের ডেলডা প্ল্যানের রূপরেখা তুলে ধরার মতো করে দেশের মানুষকে তারা বোঝাতে সক্ষম হয়নি যে, আমরা তোমাদের জন্য ভাবছি।

এই ভাবতে না পারার কারণেই মানুষ সত্যিকারভাবে শেখ হাসিনা ও তার নেতৃত্বের আওয়ামী লীগের ওপর আস্থা রেখেছে। তাও টানা তিন বার। মুষ্টিমেয় পর্যায়ে কাউকে কাউকে দেখি, কটাক্ষ করে কথা বলেন। সত্যি বলতে, আওয়ামী লীগ জনমানুষের দল না হলে এত দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকতে পারত কি? অতি অবশ্যই নয়।

বিএনপি, হালে দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে মহাসমাবেশের সূচি রেখেছে। আমি বলব, দল প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা হিসেবে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান কিংবা মশিউর রহমান যাদু মিয়াদের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে কথা বলাটা আজকের প্রাসঙ্গিক ধারা ভাষ্যে অর্থহীন।

প্রকৃতির দুই রূপ। ইতিবাচক ও নেতিবাচক। সমাজ ও রাষ্ট্রেও এমন প্রভাব পড়েছে, পড়বে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপিকে নেতিবাচক শক্তি হিসেবে দেখার অযুত কারণ রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতির নেতিবাচক শক্তিও তো ইতিবাচকের সঙ্গে লড়ে। এখানেও তাই। যারা আওয়ামী লীগের চেয়েও কখনো কখনো উন্নত চিন্তা করবে, সেই প্রত্যাশিত রাজনৈতিক বলয় আর এলোই না।

বিএনপি ইতিমধ্যে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে সমাবেশ করেছে। বৈশ্বিক প্রভাবে চলমান কিছু সংকটকে পুঁজি করে  গলা ফাটিয়ে চিত্কার করে জন-আস্থা নেওয়ার এমন কদর্য উদ্যোগকে কি রাজনীতি বলা যায়? তাদের রাজনীতি করতে হতো আগামী দিনের বাংলাদেশে তারা কী কী  কাজ করতে চায়, তা তুলে ধরে।

অতিমারি কোভিড-১৯ ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে উপেক্ষা করে  হালের বিদ্যুত্সংকট, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে বিএনপি শিশুতোষ আচারকে সঙ্গী করেছে। অর্থাত্, কিছু বলার দরকার, তাই চিত্কার করে অর্থহীন বক্তব্যে বলা হচ্ছে। মানুষের জন্য রাজনীতি নেই। তাদের লক্ষ্য, অন্য। বিএনপি বুর্জোয়া শ্রেণির প্রতিনিধি হয়ে নাশকতার রাজনীতিকেই বেছে নিতে যাচ্ছে।

আমার শঙ্কা হয়, তারা আগামী বছরে বহু মানুষের প্রাণের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। কেননা বাংলাদেশ নিয়ে  কী করবে তার ধারাবাহিক কোনো সূচি নেই। তাদের বলয়ে প্রয়াত সাইফুর রহমানের মতো এখন ট্যালেন্ট ইকোনমিস্টও নেই। তিস্তাচুক্তি নিয়ে এক-দুই বার লোক দেখানো লং মার্চ করেছে। ফলোআপে থাকেনি। সারাক্ষণ তারা ভারতবিরোধী বক্তব্য বিবৃতিতে থেকেছে। অথচ ৫১টি অভিন্ন নদীর সমাধান চেয়ে তারা রাজনৈতিক দল হওয়ার শর্ত পূরণে ব্যস্ত থাকতেই পারত, যা আওয়ামী লীগের জন্য একটা প্রেশার হয়ে থাকত। তাও তো পারেনি তারা।

বিএনপি কার্যত সেই রাজনৈতিক প্রতিনিধি, যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তনে সোচ্চার হয় বা হবে। তারা বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক সমাজের কিংবা শ্রমিক শ্রেণির বঞ্চনাকে ৪৪ বছরে ধারণ করতে পারেনি। তারা এখন বলছে, নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন হতে হবে, যা পশ্চিমা শক্তির প্রেসক্রিপশনে অসাংবিধানিক আয়োজনের পাঁয়তারা ছাড়া কিচ্ছু নয়।

বিএনপি মূলত নখদন্তহীন নেকড়ে। জামায়াতে ইসলামীর গোপন সংগঠকদের দিয়ে কিছু মানুষ, চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের স্বজন এবং তাদের উদ্যোগে কিছু ভাড়াটে লোক, তথা মিছিল-মিটিংয়ে যোগ দিয়ে অর্থ কামানোর এক শ্রেণিকে দিয়ে তাদের মহাসমাবেশগুলো চালিয়ে নিতে থাকবে। এক পর্যায়ে তারা সশস্ত্র অবস্থায় রাজপথে আসবে। বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান আছে। সুশীল জামা পরিধান করে যারা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের পেছনে বহুদিন ধরে লেগে আছে, কথিত তারাই বিএনপিকে ব্যবহার করবে। মাঝখান থেকে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয়ে যাবে। রাজনৈতিক অপশক্তির তকমা থেকে বিএনপি তাই বেরোতে পারছে না। সমাজের জন্য নেতিবাচক এই শক্তিটিকে রোধ করার নিশ্চয়ই পথ রয়েছে। বিএনপিকে যুক্তির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে কী বলা যায় না—তোমরা ৪৪ বছরে সত্যিই কি রাজনৈতিক দল হতে পেরেছ?

লেখক: সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন