দেশে অসাধু সরকারি কর্মকর্তা ও দুর্নীতিবাজ ঠিকাদাররা মিলিয়া সরকারি অর্থ লুটপাটের এক স্বর্গ তৈরি করিয়াছে। অথচ তাহাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হইতেছে না কোনো আইনগত ব্যবস্থা। পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ন দেশের সরকার বর্তমানে এক ভয়াবহ সংকটের সম্মুখীন। ইহার মধ্যেও বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনীয় কাজগুলি চালাইয়া যাওয়ার জন্য কিছু নূতন প্রকল্প গ্রহণ করিতেছে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে এমন অবস্থা দাঁড়াইয়াছে যে, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হইতেছে যেন লুটপাট করিয়া খাওয়ার জন্য। এই অবস্থা চলিয়া আসিতেছে বৎসরের পর বৎসর ধরিয়া। এই ধরনের অপব্যয়-অপচয় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে পত্রপত্রিকাগুলিতে লেখালেখি করা হইয়াছে বিচ্ছিন্নভাবে। জানানো হইয়াছে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। কিন্তু ইহার কোনো সুরাহা হয় নাই। বরঞ্চ তাহাদের শরীরে হাত দেওয়ার শক্তি আছে কাহাদের—এমন ভাব লইয়া তাহারা দিব্যি চলাফিরা করিতেছে। বড় বড় হোটেল-রেস্টুরেন্টে এই সমস্ত ঠিকাদার দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে দাওয়াত দিয়া তাহাদের ভূরিভোজ ও মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করিতেছে। সকলের চোখের সম্মুখে এই ঘটনা ঘটিলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হইতেছে না।
দুই-চারটি ক্ষেত্রে দেখা যায়, এই সমস্ত শক্তিধর ঠিকাদার কোথাও বিল পাইতে দেরি হইলে কিংবা তাহাদের দাবি অনুযায়ী বিল পরিশোধ না করা হইলে সরকারের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্মকর্তাদের অবিলম্বে সেই বিল পরিশোধের জন্য নির্দেশনাও দিয়া থাকেন। ইহা কতটা সত্য তাহা আমরা বলিতে পারি না। তবে জেলা-উপজেলায় যাহারা নিয়মিত যাতায়াত করেন, তাহারা গণমানুষের মুখে ইহা শুনিতে পান। এমনও শোনা যায়, এক কাজের জন্য তাহারা দুই বারও বিলের ব্যবস্থা করিতে পারেন। এই অনিয়ম টেন্ডারের বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেই লুক্কায়িত রহিয়াছে, যাহার কারণে তাহারা পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়া দিতে পারেন। নূতন নূতন ঠিকাদার যাহাতে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করিতে না পারেন, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়। কৌশলে নানা শর্তারোপ করা হয়। প্যাকেজ না করিয়া যদি প্রতিটি কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন টেন্ডারের ব্যবস্থা থাকিত, তাহা হইলে নূতন ঠিকাদাররা তাহাতে অংশগ্রহণ করিতে পারিতেন। ইহাতে অসৎ কর্মকর্তা ও দুর্নীতিবাজ ঠিকাদাররা এইভাবে ফুলিয়া-ফাঁপিয়া উঠিতে পারিত না। ইহার বদলে এতদিনে স্বল্পপুঁজির অনেক নূতন ঠিকাদারও গড়িয়া উঠিতে পারিত। এমন কোনো জেলা-উপজেলার মানুষ নাই, যাহারা এই কারসাজির কথা জানেন না। আশ্চর্য ও দুঃখের বিষয় হইল, বড় বড় ঠিকাদার আবার সকল কাজ করেন না। তাহার কাজ লইয়া কমিশনের বিনিময়ে সাব-কন্ট্রাকদের হস্তে তাহা তুলিয়া দেন। ইহা রসিকতা ছাড়া আর কী হইতে পারে? জনগণের পয়সা এইভাবে অভিজ্ঞ বিত্তবানদের দেওয়ার ব্যবস্থা করা হইলেও সরকারি কাজ শেষ পর্যন্ত অনেক সময় আনাড়ি লোকজন ও স্থানীয় পোলাপানদের দিয়া বাস্তবায়ন করিতে দেখা যায়—যাহাদের না আছে সম্পদ, না আছে অভিজ্ঞতা। ফলে দেখা যায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ অসমাপ্ত রাখিয়াই সাব-কন্ট্রাকটর উধাও হইয়া যাইতেছে। এই অসাধু কর্মকর্তা ও দুর্নীতিবাজ ঠিকাদারদের যোগসাজশের কারণেই রাস্তাঘাটসহ সরকারি বিভিন্ন অবকাঠামোমূলক কাজ যথাসময়ে সম্পন্ন হইতেছে না। এই জন্য অভিযুক্ত ঠিকাদারদের ব্ল্যাকলিস্ট করিবার যে নিয়ম রহিয়াছে, তাহাও মানা হইতেছে না।
গত পাঁচ দশক ধরিয়া বলা হইতেছে, এই দুর্দশা হইতে আমাদের বাহির হইয়া আসিতে হইবে। কিন্তু প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের নানা যুক্তি ও অজুহাতের কারণে এতদিনেও তাহা সম্ভব হয় নাই। যেহেতু ইহার কোনো সমাধান হয় নাই, তাই সরকারি কাজ যাহাদের দেখাশুনা, অগ্রগতি পর্যালোচনা ও সঠিকভাবে বাস্তবায়নের কথা, তাহারা নানা কারণে তাহা করেন না। এমতাবস্থায় অনেকে মনে করেন, বার্ষিক উন্নয়নের যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হইতেছে, তাহা এই সমস্ত প্রকল্পে অর্ধেক করিয়া দেওয়া হউক। কাজই যদি না হয়, তাহলে বিশ্বব্যাপী চলা এই আর্থিক সংকটকালে, অর্থ বরাদ্দ দিয়াই-বা কী লাভ? তাহারা মনে করেন, ইহাই এখন বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।
