বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট চলিতেছে। বাংলাদেশও উহার ব্যতিক্রম নহে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সংযমের কথা, কৃচ্ছ্রসাধনের কথা খোদ প্রধানমন্ত্রীও বারংবার উল্লেখ করিয়াছেন; কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতিটা কী? বিভিন্ন ক্ষেত্রে কতটা সংযম আমরা দেখিতে পাইতেছি? বরং সকল ক্ষেত্রেই ব্যয় এবং সেই ব্যয়কে ভিত্তি করিয়া অপচয় যেন আরো বেগবান হইয়াছে। সোমবার ইত্তেফাকের এক রিপোর্টে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প লইয়া স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অনিয়মের চিত্র উঠিয়া আসিয়াছে। এমনকি এক প্রকল্পের অর্থ নিয়ম না মানিয়া অন্য প্রকল্পে ব্যবহারের অভিযোগও রহিয়াছে। অথচ সরকারের আদেশে পরিষ্কার বলা আছে, এক প্রকল্প হইতে অন্য প্রকল্পে পুনঃ উপযোজনের মাধ্যমে বরাদ্দ প্রদান করা হইলে সেই ক্ষেত্রে অর্থ ছাড়ে অর্থ বিভাগের সম্মতি গ্রহণ করিতে হইবে [বলা আছে, উন্নয়ন বাজেট/এডিপি চূড়ান্ত হইবার পর রাজস্ব ও মূলধন খাত পরিবর্তন করিতে হইলে পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থ বিভাগের সম্মতি গ্রহণ করিতে হইবে এবং আইবাস (ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট সিস্টেম) সিস্টেমে তাহা অন্তর্ভুক্ত করিতে হইবে।] অথচ এই সকল কোনো নিয়মই মানা হয় না, যাহা চৌর্যবৃত্তিরই শামিল।
এই সকল খবর নূতন কোনো খবর নহে; কিন্তু ইহা রোধ করিবে কে? সরকার উন্নয়নমূলক কাজে, সংস্কারমূলক কাজে বরাদ্দ দিয়া থাকে। সেই ক্ষেত্রে সকল নিয়মকানুনই দাপ্তরিক। কাজির গরুর মতো, যাহা গোয়ালে নাই। প্রস্তাবিত অর্থের বিষয়ে অর্থ বিভাগের অনুমোদন গ্রহণ হইতে শুরু করিয়া দরপত্র আহ্বান পর্যন্ত সকল নিয়ম মানিয়াই করা হয়; কিন্তু প্রতি পদেই শুভংকরের ফাঁকি দেখিতে পাওয়া যায়। বহু ক্ষেত্রে কাজ অসমাপ্ত রাখা, নিম্নমানের কাজ করা, দরপত্রের সহিত সংগতি রাখিয়া দ্রব্য ব্যবহার না করা, নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পন্ন করিয়া হস্তান্তর না করিয়া বিল তুলিয়া লওয়া যেন নিয়ম হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ইহার মধ্যে সবচাইতে প্রকট হইল দরপত্র অনুসারে কাজ পুরাটা না করিয়া বিল তুলিয়া লওয়া। অথচ এই সকল কাজ যাহাতে সুষ্ঠুভাবে, নিয়মানুসারে এবং যথাযথভাবে সম্পন্ন হয় তাহা তত্ত্বাবধানের জন্য রহিয়াছে প্রান্তিক পর্যায়ের ওয়ার্ক অ্যাসিসট্যান্ট, উপসহকারী প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকৌশলী; জেলা পর্যায়ে সহকারী প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী হইতে শুরু করিয়া তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, প্রকল্প পরিচালকসহ চেইন অব অফিসার্স। তাহাদের মাথার উপর রহিয়াছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। তাহাদের জন্য রহিয়াছে দৃষ্টিনন্দন সকল ভবন। এই সকল ‘বজ্র আঁটুনি, ফসকাগেরো’র মধ্য দিয়াই এক শ্রেণির ঠিকাদার কোনো কোনো কর্মকর্তার সহিত যোগসাজশে সরকারি অর্থের অপচয় ঘটাইতেছেন। এই চিত্র কাহারো অজানা নহে। অথচ যেই সকল সরকারি কর্মকর্তা এহেন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হইতেছেন তাহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে দেখা যায় না কেন? দেশ স্বাধীন হইয়াছে ৫২ বৎসর হইতে চলিল, আর কত? এই যে অপচয়, ইহা যদি ৫০ শতাংশও কমাইয়া আনা যাইত, তাহা হইলে সংকট অনেকাংশেই সামাল দেওয়া যাইত।
আমরা জানি, একটি নিবন্ধিত লাইসেন্সধারী ঠিকাদার বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো কাজ গ্রহণ করিয়া দেখা যায়, অন্য কোনো ব্যক্তি সেই কাজ করিয়াছেন অথবা কাজ অর্ধসমাপ্ত রাখিয়া নয়ছয় করিয়া অর্থ তুলিয়া লইয়াছেন। এই ধরনের ঘটনা সচরাচর দেখা যায়। অথচ ঠিকাদারের সেই লাইসেন্স কেন কালো তালিকাভুক্ত করা হয় না! ইহাতে কোনোই সন্দেহ নাই যে, যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করিলে, যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিলে এই বিশৃঙ্খল অবস্থা থাকিতে পারে না। তবে ইহাও কাহারো অজানা নহে যে, এই সকল ক্ষেত্রে প্রশ্রয় যাহারা দেন তাহারা উচ্চ আসনে সমাসীন। তাহাদের দিকে নজর দেওয়াটা অতি জরুরি। দেশব্যাপী যেই প্রতিষ্ঠানগুলির লাইসেন্সে অর্ধেক বা তাহারও কম কাজ করিয়া অর্থ তুলিয়া লইতেছে, যাহারা কাজ লইয়া দরপত্র অনুসরণ করিতেছে না এবং যেই সকল কর্মকর্তা এহেন কুকর্মের সহিত জড়াইয়া পড়িতেছেন তাহাদের যথোপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনিলে দেশের এই অর্থ ধ্বংস খানিকটা রোধ করা যাইবে বটে।
