বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

‘ডেঙ্গু’ ছোঁয়াচে রোগ নয়

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২২, ০১:১০

বাংলাদেশের মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে অনেক বছর থেকে। এখন প্রকোপ চলছে। ডেঙ্গু একধরনের ভাইরাস জ্বর। জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংশপেশিতে ব্যথা এবং র্যাশ ওঠাই ডেঙ্গুর প্রধান লক্ষণ। সব বয়সের শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে থেকে যারা শারীরিক বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছে, তাদের জন্য ডেঙ্গু মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। তাই শরীরে জ্বর বা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মূলত চলতি বছর ডেঙ্গুতে অনেকে মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু আর না। এই জ্বরের হাত থেকে বাঁচতে হলে আমাদের সচেতন হতে হবে। 

এই জ্বরের ধরন চারটি—ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। বিশেষ করে ভাইরাস জ্বর স্বাভাবিকভাবে বোঝা যায় না বলে জ্বর হলে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ডেঙ্গু হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ে বাংলাদেশের সব ডাক্তারই কম-বেশি জানেন। এতে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যাওয়ার তেমন প্রয়োজনীয়তা নেই। জেনারেল ফিজিশিয়ান বা প্রাইভেট প্র্যাকটিশনার, যে কারো কাছ থেকেই পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ কোনো জটিলতা থাকলে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যাওয়া যেতে পারে। ডেঙ্গুর বিশেষায়িত চিকিত্সাব্যবস্থা নেই। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অল্প কয়েক দিনেই সুস্থ হওয়া যায়।

আমি মনে করি, অসুস্থ হলে এমনিতেই মানুষ দুর্বল হয়ে যায়। ডেঙ্গু জ্বর শরীরকে অনেক কাহিল করে ফেলে। ১০৪-১০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত জ্বর উঠতে পারে। শরীরে ব্যথা, মাথাব্যথা, জয়েন্টগুলোয় ব্যথা অনুভূত হবে। চার-পাঁচ দিন পর শরীরে র্যাশ বের হয়। দাঁত ব্রাশ করলে রক্তক্ষরণ হয়, নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়, প্রস্রাব-পায়খানার সঙ্গেও রক্ত যেতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে পিরিয়ডকালীন রক্তক্ষরণ স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে হয়। এ সময় বিশ্রামের কোনো বিকল্প নেই। বিশ্রাম ছাড়া ডেঙ্গু থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অসম্ভব। এছাড়া ভারী কাজ থেকেও রোগীর শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে পারে।

এই জ্বর হলে খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই। তবে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে। রোগীর প্লাজমা লিকেজ হয়ে শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দেয়। নিয়মিত ফলের রস, পানি, ওরাল স্যালাইন, ডাবের পানি ইত্যাদি ইলেকট্রোলাইট সমৃদ্ধ তরল পান করলে প্লাজমা লিকেজ কম হবে। শর্করা, প্রোটিন ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ সাধারণ খাবার বন্ধ করা যাবে না। স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ঘরে বানানো খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন। পানি পানের বিষয়ে অবহেলা করলে কিডনির জটিল রোগও হতে পারে। অস্বাস্থ্যকর স্ট্রিট ফুড, তৈলাক্ত বা মসলাদার ভাজাপোড়া ধরনের খাবার এবং ক্যাফিনযুক্ত পানীয় একেবারে রুটিন করে এড়িয়ে চলুন। এছাড়া জ্বর বাড়লে কিছু সময় পরপর পানি দিয়ে শরীর মুছে নেবেন। মুখে খাওয়ার অবস্থায় না থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সাপোজিটরি ব্যবহার করা যেতে পরে। ব্যথার উপশম করতে অ্যাসপিরিন-জাতীয় ওষুধ কোনোভাবেই গ্রহণ যাবে না ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া। যাদের আগে থেকে হার্ট, লিভার বা কিডনিতে সমস্যা আছে, তারা ওষুধ সেবনের আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নেবেন।

ডেঙ্গু কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। কেবল ভাইরাসবাহী এডিস মশার কামড়েই ডেঙ্গু হতে পারে। তাই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। মশারির বাইরে বের হলে ফুল হাতা পোশাক পরতে হবে। সুরক্ষার জন্য মশা মারার স্প্রে বা জেল ব্যবহার করা যেতে পারে। 

ডেঙ্গুর সূত্রপাত বিষয়ে সবাই কম-বেশি জানেন। এডিস মশার প্রজনন যাতে বৃদ্ধি না পায়, সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। মশার কামড় থেকে বেঁচে চলতে হবে। ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী এডিস মশাগুলো বাসাবাড়ি ও আঙিনার বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করে, বংশবিস্তার করে। দীর্ঘদিন কোনো জায়গায় পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশা ডিম পাড়ে। তাই ডাবের খোল, ক্যান, টায়ার, ফুলের টবসহ পানি জমে থাকে এমন জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। ডেঙ্গু নির্মূল করতে হলে সবাইকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে আমাদের গাছের টবে পানি জমে থাকলে তা ফেলে দিতে হবে। দিনের বেলায় শুয়ে থাকলে মশারি টানাতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, একবার ডেঙ্গু হয়ে গেলে পুনরায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে ভ্যাকসিন নেওয়া নিরাপদ। 

লেখক :হোমিও চিকিৎসক ও সংগীতশিল্পী

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন