সাধন সরকার
বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা, হাওর-বাঁওড়সহ প্রাকৃতিক জলাধারগুলো এ দেশের প্রাণ। অথচ গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও শহর পর্যায়ে একের পর এক জলাভূমি ভরাট করা হচ্ছে। ‘প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০’ অনুযায়ী কোনো পুকুর-জলাশয়, নদী-খাল ভরাট করা বেআইনি। আবার বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-২০১০ অনুযায়ী জাতীয় অপরিহার্য স্বার্থ ছাড়া কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারি বা আধা সরকারি, এমনকি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বা ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুর বা জলাধার ভরাট করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু আইন অমান্য করে প্রাকৃতিক জলাভূমিগুলো ধ্বংস করে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে।
চারপাশের বাতাসকে শীতল রাখা, বর্ষা মৌসুমে বন্যা প্রতিরোধ, শহরে জলাবদ্ধতা নিরসন, পানির চাহিদা পূরণ ও আবর্জনা পরিশোধনে জলাভূমিগুলোর গুরুত্ব অনেক। যদি জলাধারগুলো নষ্ট হয়ে যায় এবং শহরে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে তাহলে তাত্ক্ষণিকভাবে এক ফোঁটা পানিও কি পাওয়া যাবে! জলাভূমিগুলো তো নগরের তাত্ক্ষণিক পানি সরবরাহের সবচেয়ে বড় উত্স। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে একের পর এক জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। রাজধানীতে একসময় প্রায় ২ হাজার পুকুর, ৫২টি খাল ও অসংখ্য ঝিল ছিল। এর বেশিরভাগই এখন আবাসনের চাহিদা মেটাতে নিচু জায়গা ভরাট করতে করতে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। শুধু ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকা থেকে বছরে প্রায় ৫ হাজার একর জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। আর সারা দেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪২ হাজার একর জলাধার ভরাট করা হচ্ছে। রাজধানী ঢাকা শহরে জলাভূমি ভরাটের বিরূপ প্রভাব পড়েছে। বেশিরভাগ খাল ও নিচু জায়গা ভরাট করে ফেলার ফলে এখন একটু বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতায় পড়তে হয় নগরবাসীকে। চারপাশের নদীগুলোর সঙ্গে খালগুলোর সংযোগ কাটা পড়েছে। ময়লা-আবর্জনায় ভরে গিয়ে খালগুলো যেন মশা তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে! অথচ পরিকল্পনামাফিক উদ্যোগ গ্রহণ করলে খালগুলো হতে পারত বিনোদনের এক একটি ক্ষেত্র। একটি জলাধারকে যে কত সুন্দর, আকর্ষণীয় ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে তা ঢাকার ভেতরে হাতিরঝিলের মতো বিনোদনকেন্দ্রের দিকে তাকালে বোঝা যায়। জলাভূমিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিনোদনকেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে অনেক হাওর। টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীসহ অর্থনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় ৪৪ লাখ হেক্টর জলাভূমি রয়েছে। অন্যতম বৃহত্ জলাধার চলনবিলের আয়তন আগের চেয়ে অনেক সংকুচিত হয়েছে। আবার বিভিন্ন সময় লিজ বা ইজারা দেওয়ার ফলে লাভের চেয়ে জলাধারগুলোর বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়েছে বেশি! ফলে উদ্ভিদ ও জলজ প্রাণীর বংশবৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি দেশি মাছের বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হয়েছে, বেড়েছে বিদেশি মাছের উত্পাদন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে জলাভূমি সংরক্ষণ ও দেখাশোনার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একের পর এক জলাভূমি হারিয়ে যাওয়া মানে জেনে-বুঝে দেশের ক্ষতি ডেকে আনা। তাই জলাভূমি রক্ষায় প্রচলিত আইনের প্রয়োগ ঘটাতে হবে। জলাভূমিগুলো আমাদের সম্পদ, জীববৈচিত্র্যের আধার। জলাধার থেকে ব্যক্তি, স্থানীয় জনগণ ও সরকার যাতে লাভবান হতে পারে এবং জলাধারও রক্ষা পায় এমন সব উদ্যোগের কথা ভাবতে হবে। যেমন, জলাধারগুলো ছোট ছোট পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। আবার এগুলোতে মাছ ধরার লাইসেন্স দিয়ে শৌখিন মানুষদের আকর্ষণ করা যায়।
ঢাকা
