সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বর্জ্য নিয়ে গবেষণায় বৈশ্বিক সম্মাননা

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২২, ২০:৩৬

রাজধানীবাসীর জীবনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে দৈনন্দিন বাসা বাড়ি দোকানপাট সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে আসা বর্জ্য। যেগুলোর প্রথমে ঠাঁই হয় শহরের প্রধান সড়কগুলোর পাশে। তারপর চলে যায় সিটি কর্পোরেশনের নির্ধারিত ল্যান্ডফিলগুলোতে। কিন্তু ল্যান্ডফিলগুলোতে যাওয়ার আগে ঢাকার বাতাসে যে পরিমাণ দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পরে তাতে ঐ রাস্তা দিয়ে চলাচল করাটা হয়ে পড়ে দুর্বিষহ। তাছাড়া বৃষ্টির দিনে এসব ময়লাই ভেসে ড্রেনে গিয়ে পড়ে। এতে ড্রেনগুলো বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে ভয়াবহ রকমের। ফলে, একটু বৃষ্টি নামলেই রাজধানীবাসীর জন্য জরুরি প্রয়োজনেও রাস্তায় বের হওয়াটা অত্যন্ত দুশ্চিন্তার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের জন্য নির্ধারিত মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল এবং আমিন বাজারের চারপাশের পরিবেশের বেশ ভয়াবহ রকমের ক্ষতি করছে এই বর্জ্য। আশপাশের আবাদি কৃষি জমি ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ভয়াবহ বিষাক্ততা।

একদিকে বর্জ্য যেখানে মানুষের জীবনে শুধু সমস্যাই সৃষ্টি করে যাচ্ছে সেখানে জারীন তাসনীম শরীফ এই বর্জ্য নিয়ে গবেষণা করেই অর্জন করেছেন আন্তর্জাতিক সম্মাননা। আয়ারল্যান্ড ভিত্তিক ‘গ্লোবাল আন্ডার-গ্রাজুয়েট অ্যাওয়ার্ড’র আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইন বিভাগে তার গবেষণা পত্রটি সেরা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। ২০০৮ সাল থেকে শুরু হওয়া এই অ্যাওয়ার্ডের এটাই প্রথম কোনো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সাফল্য। ‘জুনিয়র নোবেল প্রাইজ’ও বলা হয় একে। ২৫টি বিভাগে ভাগ করা অ্যাওয়ার্ড আয়োজনে এবার দুই হাজারের বেশি গবেষণাপত্র জমা পড়েছিল।

জারীন তাসনীম শরীফ পড়ালেখা করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে। তিনি তার চূড়ান্ত বর্ষের থিসিস প্রজেক্ট হিসেবে দেখিয়েছেন, পরিকল্পিতভাবে আগালে দেশের বর্জ্য সমস্যাকে কিভাবে সম্পদে রূপান্তর করা যায়। তার এই প্রকল্পটি ল্যান্ডফিল’র জমি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ল্যান্ডফিল মাইনিং পদ্ধতিকে অবলম্বন করে ডিজাইন করা হয়, যাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ফলাফল অর্জন করা সম্ভব।

জারিনের প্রকল্প

যেমন, ১. সম্পূর্ণ পরিমাণ বর্জ্য  এবং বিপজ্জনক ভগ্নাংশ অপসারণ, বর্জ্যকে রিফিউসড ডিরাইভড ফুয়েল (আরডিএফ)-এ রূপান্তর; ২. ল্যান্ডফিলে উপস্থিত রিসাইকেলযোগ্য উপকরণ পুনরুদ্ধার; ৩. জমি পুনরুদ্ধার করে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি পুনর্জীবিত করা। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিনটি ধাপে ডিজাইন করা প্রকল্পটি চূড়ান্ত পর্যায়ে ২০৪৩ সালের মধ্যে সমস্ত বর্জ্য রূপান্তরিত হবে জ্বালানির জন্য রিফিউসড ডিরাইভড ফুয়েল, রিসাইকেলযোগ্য কাঁচামাল এবং কম্পোস্টে। পাশাপাশি আরবান এগ্রিকালচারাল হাব গড়ে তোলা হবে মাতুয়াইলের মানুষের এক সময়ের হারিয়ে যাওয়া কৃষি চর্চাকে পুনর্জীবিত করতে।

বর্জ্য পৃথকীকরণ প্ল্যান্টটি আধুনিক প্রযুক্তির একটি হাইব্রিড হিসাবে ডিজাইন করা হয়েছে এবং মেশিনারিগুলো স্থানীয় রিসাইক্লিং এবং আপ-সাইক্লিং সেটাপের সাথে একীভূত করা হয়েছে। একটি স্বয়ংক্রিয় মেশিন কোর ডিজাইন করা হয়েছে, যা থেকে বর্জ্যের কোনো দূষণ বা দুর্গন্ধ বাইরে না যায়।

জারীন শরীফ তার গবেষণাপত্রের এমন একটা বৈশ্বিক পুরস্কার পাওয়ার বিষয়ে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে, আমার দেশের যে বর্জ্য সমস্যা দিনকে দিন প্রখর হচ্ছে সেখানে তার একটা সুন্দর এবং পরিবেশসম্মত সমাধান বের করতে পেরেছি।’

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন