ডলফিন রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ কতদূর?

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২২, ০৫:৩০

শুধু এই জনপদেই নহে, বিরূপ জলবায়ুর কারণে ধ্বংসের মুখে উপনীত হইয়াছে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের প্রাণিকুল। বিশ্বব্যাপী জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হইয়া পড়িয়াছে যদিও, তবে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিতে ইহার দায় যতটা না জলবায়ুর, তাহার চাইতে অনেক বেশি দায়ী জনগণের নির্মমতা কিংবা সচেতনতার অভাব। সাম্প্রতিক সময়ে গভীর উদ্বেগের সহিত লক্ষ করা যাইতেছে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক হারে ডলফিন মারা পড়িতেছে। চলতি বছর কেবল কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতেই ভাসিয়া আসিয়াছে ২০টি মৃত ডলফিন। এই সৈকতে গত বত্সর ২৪ এবং তাহার আগের বত্সর ১৮টি মৃত ডলফিন ভাসিয়া আসিয়াছিল। মৃত ডলফিনের সৈকতে ভাসিয়া আসার এইরূপ চিত্র থামিয়া নাই দেশের অন্যান্য সমুদ্র উপকূলেও। উপরন্তু দেশের নদীগুলিও ডলফিনের জন্য হইয়া উঠিয়াছে ‘ডেথ জোন’। চট্টগ্রামের হালদা নদীতে রুটিন বিরতিতে ডলফিনের মৃত্যুর সংবাদ শোনা যাইতেছে। গবেষকরা বলিতেছেন, অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এই নদীতে এখন অধিক ডলফিন মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটিতেছে। গত বত্সর হালদায় স্থানীয়ভাবে পরিচিত উতোম বা শুশুক নামে পরিচিত একটি ডলফিন মারা গেলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়াছিলেন, দূষণের কবলে পড়িয়াই উহার মৃত্যু হইয়াছে। বিশেষজ্ঞদের কথা পাত্তা পায় নাই বলিয়াই মনে হয়। কেননা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া আমাদের জানা নাই, যাহাতে ডলফিনের নিরাপদ চলাচল ও স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করা যায়। এমনকি হালদায় দূষণ কমাইতে স্থানীয় জনগণকে সচেতন করিতে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় নাই। নির্বিচার দূষণের কবলে পড়িয়া ডলফিনের মৃত্যুর অনুরূপ চিত্র রাজধানীর নিকটবর্তী তুরাগ নদেও দেখা যাইতেছে। অনেকটা শীর্ণ হইয়া পড়া এই নদে প্রবেশ করিয়া মারা পড়িতেছে নিরুপায় ডলফিন। তুরাগের ন্যায় দেশে একাধিক নদনদী রহিয়াছে, শিল্পকারখানার রাসায়নিক মিশ্রিত পানিতে যেইগুলির মুমূর্ষু অবস্থা। বাস্তবিক অর্থেই দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনায় দেশের নদনদীগুলির পরিবেশ-প্রতিবেশ জলজ জীববৈচিত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি হইয়া উঠিয়াছে। এই সমস্ত নদীরূপ মরণফাঁদে পড়িয়া ক্রমবর্ধিষ্ণু হারে প্রাণ হারাইতেছে ‘সমুদ্রের বন্ধু ডলফিন’।

ডলফিনকে বলা হয় ‘সেকেন্ড ইন্টেলিজেন্ট ক্রিয়েচার’। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য, এই প্রাণীকে রক্ষা করিতে আমরা বরাবরই উদাসীন। এই সত্যকে কোনোভাবেই পাশ কাটানো যাইবে না যে, একটি করিয়া ডলফিনের মৃত্যু হইতেছে আর আমরা কেবল দায়সারাভাবে তাহাদের সংখ্যা মৃত্যুতালিকায় লিপিবদ্ধ করিয়াই ক্ষান্ত হইতেছি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের জন্য তেমন কোনো গবেষণা নাই। লক্ষণীয় বিষয় হইল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত ডলফিনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যাইতেছে। নিরীহ ডলফিন কীভাবে, কোথা হইতে এই আঘাতের শিকার হইতেছে, ইহা খুঁজিয়া বাহির করিবার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগী হইতে হইবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বিষয়টি লইয়া ভাবিতেছে বলিয়া মনে হয় না। উপকূলীয় এলাকায় মত্স্য শিকারে বিষ প্রয়োগের কথা কাহারো অজানা নহে, যাহা সম্পূর্ণ বেআইনি ও নিষিদ্ধ, কিন্তু এই ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের নির্লিপ্ততাই দৃশ্যমান। যেই হেতু নদী-সমুদ্রে মাছ ধরা জেলেদের সংখ্যা নেহাত কম নহে, সেই হেতু তাহাদের সচেতন করা ছাড়া বিকল্প নাই। তাহাদের বোঝাইতে হইবে, জালে ডলফিন, হাঙর, শাপলাপাতা মাছ, কাছিমজাতীয় প্রাণী ধরা পড়িলে তাহাদের ছাড়িয়া দিতে হইবে। এই সমস্ত প্রাণী জেলেদের জাল হইতে সুস্থ শরীরে কীভাবে ছাড়িতে হইবে, সেই কৌশলও মত্স্যশিকারিদের বুঝাইয়া দিতে হইবে।

বলিয়া রাখা প্রয়োজন, ডলফিনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের জন্য মৃত ডলফিনের ময়নাতদন্তের অনুরোধ জানাইয়া আসিতেছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বন অধিদপ্তরের গবেষণাগার এবং ভেটেরিনারি প্রতিষ্ঠানগুলিতে কর্মরত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ বিশেষজ্ঞ মতকে শতভাগ গুরুত্ব দিয়া মৃত ডলফিনের ময়নাতদন্ত করিবেন বলিয়া আমাদের বিশ্বাস। সর্বোপরি সমুদ্রে ডলফিনের অবাধ বিচরণ নিশ্চিতে যেমন ব্যবস্থা লইতে হইবে, তেমনি উহারা যেন  ‘ভূতুড়ে’ জালে জড়াইয়া বেঘোরে মারা না পড়ে, সেই বিষয়টিও মাথায় রাখিতে হইবে। ভুলিয়া গেলে চলিবে না, যেই জলাধারে ডলফিন থাকে সেখানকার পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক থাকে। অতএব, পরিবেশ রক্ষার স্বার্থেই ডলফিনকে বাঁচাইতে হইবে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন