বিশ্ব মিডিয়ার দৃষ্টিতে ২০২৩ সালের আর্থিক মন্দা 

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২২, ০০:৪০

সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহল কিংবা বৈশ্বিক পরিসরে যারা শত শত দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি কিংবা পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কাজ করেন, তাদের সবার কপালেই দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে আসন্ন অর্থনৈতিক মন্দা। ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার সম্ভাবনা ক্রমেই যেন স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা এখন বলা যায় বিতর্কের ঊর্ধ্বে। যদিও এই অর্থনৈতিক মন্দার পেছনের কারণগুলো নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আর এই বিতর্কগুলো তথা বিশ্বমন্দার কথা ক্ষণে ক্ষণে সামনে নিয়ে আসছে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন গণমাধ্যম।

বিশ্বের নামী সংবাদ সংস্থা এবং ঐতিহ্যগতভাবে অনেক পুরোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান ২০২৩ সালকে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অন্যান্য বিচারে একটি সংকটময় সাল ধরে নিয়ে অনবরত নানা রকম গবেষণাপত্র, তথ্য-উপাত্ত ও  পূর্বাভাস প্রকাশ করছে। প্রকাশিত গবেষণার ফলাফলকে কেন্দ্র করে প্রতিবেদন করছে হাজারো সংবাদমাধ্যম, যা ছড়িয়ে পড়ছে লাখো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এমনই এক প্রেক্ষাপটে আজ খুঁজে দেখব সাম্প্রতিক কালে বিশ্ব মিডিয়ায় কীভাবে আলোচিত হচ্ছে ২০২৩ সালের আসন্ন বৈশ্বিক মন্দার বিষয়টি।

বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা নেদারল্যান্ডসের আমসটেলভিনে (Amstelveen) প্রতিষ্ঠিত এবং বর্তমানে ইংল্যান্ডের লন্ডনভিত্তিক বেসরকারি অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা কেপিএমজি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (KPMG International Limited)। সংস্থাটি চলতি অক্টোবর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে পশ্চিমা বিশ্বের, বিশেষত আমেরিকার খ্যাতনামা বাণিজ্যিক সংস্থার কর্ণধার বা চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসারদের (সিইও) সঙ্গে ২০২৩ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করে, জরিপ পরিচালনা করে এবং এর ফলে উঠে আসা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, এসব স্বনামধন্য সিইওর মধ্যে আমেরিকার শতকরা ৯১ জন এবং বিশ্বব্যাপী শতকরা ৮৬ জন মনে করেন যে, আগামী ১২ মাসের মধ্যে পৃথিবীতে একটি বড় অর্থনৈতিক দুর্যোগ নামতে যাচ্ছে। এই আশঙ্কা থেকে কয়েক জন নামিদামি সিইও নিজ নিজ কোম্পানির কর্মী ছাঁটাই এবং নতুন কর্মী না নেওয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছেন।

আমেরিকার নিউইয়র্কভিত্তিক মূলত অর্থনীতিবিষয়ক বিশ্বখ্যাত সাময়িকী ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর অর্থনৈতিক রিপোর্টার হেরিয়েট টরি (Harriet Torry) এবং ডাটা নিউজ এডিটর অ্যান্থনি ডি বারোসের (Anthony De Barros) লেখা একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় গত ১৬ অক্টোবর। এই গবেষকদের মতে, উচ্চমাত্রার মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক সংকোচন এবং ব্যাপক হারে কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রেক্ষাপটে আগামী ১২ মাসের মধ্যে আমেরিকায় অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, নানা সময়ে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা উঁকি দিলেও ২০২০ সালের পর এই সম্ভাবনা ৫০ শতাংশের নিচেই ছিল। 

আমেরিকার নিউইয়র্কভিত্তিক অর্থনীতিবিষয়ক থিংক ট্যাংক ব্লুমবার্গ ( Bloomberg) ১৭ অক্টোবর ২০২২ তারিখে প্রকাশ করে জোশ উইংগ্রোভের লেখা একটি চিন্তাজাগানিয়া প্রতিবেদন। তার মতে, এক বছরের মধ্যে আমেরিকায় অর্থনৈতিক ধস নামার সম্ভাবনা ১০০ শতাংশ, যা সে দেশের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জন্য একটি দুঃসংবাদ এবং নভেম্বরে নির্ধারিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে একটি বড় আঘাত। জোশ উইংগ্রোভ উল্লেখ করেছেন, পূর্ববর্তী গবেষণায় এমন মন্দার সম্ভাবনা ছিল ৬৫ শতাংশ, কিন্তু বর্তমান (১৭ অক্টোবর ২০২২) বাস্তবতায় ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসের মধ্যে এমন মন্দার সম্ভাবনা শতভাগ। ব্লুম্বার্গ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের ৪২ জন বিশেষজ্ঞের মতামত ও জরিপের ভিত্তিতেও ধারণা করছে যে, আগামী ১২ মাসের মধ্যে আর্থিক মন্দার সম্ভাবনা ৬২ শতাংশ, যা এক মাস আগেও ছিল ৫০ শতাংশ। সামষ্টিক অর্থনীতির ১৩টি উপাদান এবং অর্থনীতি ও পুঁজি প্রবাহের অন্যান্য সূচকের ভিত্তিতে ব্লুম্বার্গের এই আশঙ্কা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তার দলের আর্থিক সক্ষমতার চিত্রকে বড় প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে।

কাতারভিত্তিক মিডিয়া হাউজ আল-জাজিরার সিনিয়র বিজনেস প্রডিউসার রাডমিলা সোলায়মান ওভারের লেখা একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ১০ অক্টোবর ২০২২ তারিখে। এই প্রতিবেদনে নিউ ইয়র্কভিত্তিক বৈদেশিক মুদ্রাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ওয়ান্ডার (OANDA) জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক এডওয়ার্ড মুয়ার (Edward Moya) বরাতে লেখা হয়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে জনজীবনে সৃষ্ট চাপ সহজে দূরীভূত হবে না। ওয়াশিংটনের থিংক ট্যাংক দ্য হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের গবেষক ই জে অ্যান্টোনির (E J Antoni) দৃষ্টিতে জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি আমরা যা কিনি বা যে কাজ করি, সবকিছুরই দাম বাড়িয়ে দেবে। তিনি আরো মনে করেন, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আমেরিকা আর্থিক মন্দা প্রত্যক্ষ করলেও কিছুটা ইতিবাচক মনে হয়েছিল সপ্তম থেকে নবম মাসের  (জুলাই-অক্টোবর) আর্থিক ব্যবস্থাপনা। কিন্তু সামনের দিনগুলো নিয়ে রয়েছে ব্যাপক শঙ্কা।

ইংল্যান্ডের ওয়েলস রাজ্যের তৃণমূল পর্যায়ের বাসিন্দাদের সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে বিবিসির সংবাদদাতা হু থমাস (Huw Thomas) ১৩ অক্টোবর একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। এই প্রতিবেদনে প্রান্তিক পর্যায়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের এক করুণ প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক মন্দায় সবকিছুর দাম বেড়ে গেলে সাধারণ কফি শপের চা-কফি তৈরির খরচও বেড়ে যাবে। তবে বিক্রেতারা লাভের আশায় বা বাড়তি খরচ জোগাতে যদি চা-কফির দাম বাড়ায়, তবে সাধারণ মানুষ বাড়তি দামে চা-কফিও কিনবে না। এমন হাজারো সমস্যার কথা ভেবে দুশ্চিন্তায় দিন পার করছে ওয়েলসের বাসিন্দারা। আর সেখানকার বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা এবং বিভিন্ন মেয়াদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রাক্তন মন্ত্রী ও বর্তমানের অর্থমন্ত্রী ভন গেথিং (Vaughan Gething) জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক মন্দা এক চরম সংকটময় দিনের দিকে আমাদের ধাবিত করবে। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে প্রকাশিত বিবিসির আরেক প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়, সেখানকার ব্যাংক থেকে টাকা ধার নিতে যে সুদের অঙ্ক গুনতে হয়, তা বিগত ১৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। আর দ্রব্যমূল্য ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্কাই নিউজের সাবেক পলিটিক্যাল এডিটর এবং বর্তমানে বিবিসির ইকোনমিকস এডিটর ফয়সাল ইসলাম এই প্রতিবেদনের শেষাংশে যুক্ত করেন যে, সবার নজর এখন আসন্ন নভেম্বর মাসের দিকে। এই মাসে ব্যাংকগুলো মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসকল্পে সরকার গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মূল্যায়ন করবে। তার শঙ্কা, দ্রব্যমূল্য বাড়াটা অবশ্যম্ভাবী; তবে কতবার বাড়বে, কত ক্ষেত্রে বাড়বে কিংবা কতটুকু পর্যন্ত বাড়বে সেটাই প্রশ্ন।

আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক ইয়াহু ২০ অক্টোবর ২০২২ তারিখে ইয়াহুর এডিটর অ্যাট লার্জ ব্রায়ান সুজির  লেখা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনের একটি অংশে আমেরিকার বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক ও আর্থিক পরিষেবা সংস্থা জেফ্রিজ গ্রুপ এলএলসির জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ থমাস সিমন্সকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি নাগাদ আমেরিকার আর্থিক মন্দা একটা বাজে পর্যায়ে চলে যাবে এবং ২০২৪ সাল শুরুর আগে তা শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে প্রাক্তন ফেডারেল রিজার্ভের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যালান ব্লাইন্ডার (Alan Blinder)ও ব্যাংক অব আমেরিকার সিইও ব্রায়ান ময়নিহান (Brian Moynihan) মনে করেন, মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াই কষ্টকর হলেও এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা কোনো ভয়াবহতার দিকে নিয়ে যাবে না। 

বিগ ফোর নামে পরিচিত আমেরিকার সবচেয়ে বড় চারটি ব্যাংকের একটি এবং বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগকারী ব্যাংক হিসেবে ১৫০ বছরের বেশি সময় (১৮৭১-২০২২) ধরে দাপটের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করছে জে পি মরগান। এই ব্যাংকের সিইও এবং আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় ধনী ব্যবসায়ীদের একজন জেমি ডিমন চলতি অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে যোগ দিয়েছিলেন লন্ডনে অনুষ্ঠিত জে পি টেক স্টারস কনফারেন্সে। এ সময় আমেরিকার চ্যানেল সিএনবি সির রিপোর্টার জুলিয়ানা ট্যাটেলবামকে তিনি একটি সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। তিনি বলেন, ২০২৩ সালের এই বিশ্বমন্দা হবে গুরুতর, যা আমেরিকা ও পৃথিবীতে আঘাত হানবে। তিনি মনে করেন, ইউরোপ জুড়ে এই আর্থিক মন্দা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং আগামী ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে আমেরিকায়ও একই ধরনের অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে। তবে মন্দা কত দিন থাকবে, তা নিশ্চিতভাবে বলতে না পারলেও এর প্রভাব যে হালকা থেকে তীব্রতর হবে, তা প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করেন তিনি। অন্যদিকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ কোন দিকে গড়ায়, তার ওপরও  অনেক কিছু নির্ভরশীল বলে তার অভিমত।  

একাধিক ভাষায় সংবাদ ছড়িয়ে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা পেয়েছে আমেরিকার টেলিভিশন চ্যানেল দ্য ক্যাবল নিউজ নেটওয়ার্ক, সংক্ষেপে সিএনএন। এই টিভি চ্যানেলের অর্থনীতি ডেস্ক ২৪ অক্টোবর আমেরিকার ১৫৪ বছরের পুরোনো (১৮৬৯-২০২২) এবং পৃথিবীর অন্যতম ও অভিজাত বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের (Goldman Sachs) অর্থনৈতিক মন্দাবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। ব্যাংকটির দৃষ্টিতে ২০২৩ সালে মুদ্রাস্ফীতির দুটি মূল উপসর্গ বাসস্থান বা বাড়িঘর ক্রয় বা ভাড়া এবং স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় আমেরিকার জনগণকে অস্বস্তিকর পর্যায়ে নিয়ে যাবে। তবে মন্দার প্রশ্নে অন্য যেকোনো ব্যাংক বা সংস্থার তুলনায় অনেক কম ঝুঁকি অনুভব করেন গোল্ডম্যান স্যাকস। তাদের মতে, আমেরিকার ভয়াবহ রকমের অর্থনৈতিক মন্দা দেখার সম্ভাবনা ৩৫ শতাংশ মাত্র। 

লেখক :গবেষক, বিশ্লেষক

 

ইত্তেফাক/ইআ