‘কঠিন চ্যালেঞ্জ’ মোকাবিলায় সম্ভাব্য উপায় যাচাই জরুরি

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২২, ০১:১০

আধুনিক সময়ে বিদ্যুৎ ব্যতীত সকল কিছুই অচল। উন্নত দেশ গঠনে বিদ্যুৎই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ রসদ। যেই দেশ এখন জ্বালানি তথা বিদ্যুতে শক্তিশালী ও স্বনির্ভরশীল, সেই দেশের অর্থনৈতিক শক্তি ও উন্নয়নের গ্রাফ তত অধিক ঊর্ধ্বমুখী। প্রাকৃতিক গ্যাসের পর বাংলাদেশে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত দ্বিতীয় প্রধান অনবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পদ হইল কয়লা। আগামী কিছুদিনের মধ্যেই মেগা প্রকল্পের ভিত্তিতে বাস্তবায়নকৃত বেশ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র উৎপাদনে আসিবার কথা রহিয়াছে। যদিও জ্বালানি পণ্যের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিষয়টিকে জটিল করিয়া তুলিয়াছে। আবার আমদানিনির্ভর কয়লা দিয়া বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচও পড়ে অনেক বেশি। অথচ বাংলাদেশে এখনো বিপুল পরিমাণ কয়লার মজুত অব্যবহৃত রহিয়া গিয়াছে। মানের দিক হইতেও এই সকল কয়লা সর্বোত্কৃষ্ট বলিয়া সর্বশেষ সমীক্ষায় উঠিয়া আসিয়াছে। সুতরাং বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের মূল্যে যেই অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়াছে, তাহাতে স্থানীয় পর্যায়ে কয়লা উত্তোলন বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি বলিয়া অনেকেই মনে করিতেছেন। 

যদিও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে নিরুত্সাহিত করা হয়; কিন্তু আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য নিজস্ব জ্বালানি শক্তির ব্যবহার না করাটা পিছনের দিকে হাঁটিবার মতো। উন্নত বিশ্ব যুগের পর যুগ ধরিয়া বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করিয়া কলকারখানা চালাইয়া নিজের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করিয়াছে। তাহাদের বিপরীতে উন্নয়নশীল বিশ্ব এত অধিক যোজন যোজন পথ পিছাইয়া রহিয়াছে যে, কয়েক শত বৎসর ধরিয়া কয়লাশক্তি ব্যবহার করিলেও শিল্পোন্নত দেশগুলির ইতিপূর্বে ব্যবহার করা জ্বালানিশক্তির ধারেকাছে ঘেঁষিতে পারিবে না। প্রতিবেশী একটি বৃহৎ দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী বলিয়াছেন যে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আরো কয়েক দশক কয়লার উপর নির্ভর করিতেই হইবে। কারণ সকলের নিকট বিদ্যুৎ পৌঁছাইয়া দিতে উন্নয়নশীল দেশগুলির ‘কঠিন চ্যালেঞ্জ’। সুতরাং এই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কয়লা হইতে পারে আমাদের সবচাইতে বড় সহায়ক শক্তি—যদি আমাদের নিজস্ব কয়লা থাকে। আর এইখানেই সম্প্রতি নূতন সুখবর আসিয়াছে। উহা হইল জামালগঞ্জের কয়লা খনি। জাতিসংঘ ও তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বিশেষজ্ঞদের অনুসন্ধানে জামালগঞ্জে কয়লা খনি আবিষ্কৃত হইয়াছিল ১৯৬২ সালে। এরপর খনিটিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অনুসন্ধান চালানো হয় ২০১৫ সালে। ১৯৬২ সালের প্রথম অনুসন্ধানে খনির আয়তন নির্ধারণ করা হয়েছিল ১১ দশমিক ৬৬ বর্গকিলোমিটার। পরের জরিপে এর সম্ভাব্য আয়তন নির্ধারণ হয় ৬৪ বর্গকিলোমিটার। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ কয়লার সবচাইতে বড় মজুত বলিয়া অনুসন্ধানে উঠিয়া আসিয়াছে জয়পুরহাটের জামালগঞ্জের কয়লা খনিটি। বিশ্বে কয়লার সবচাইতে বড় খনি ধরা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইয়োমিংয়ের নর্থ অ্যান্টিলোপ রোশেল কোল মাইনকে। সেইখানে কয়লার উত্তোলনযোগ্য মজুত ১৭০ কোটি টন। অন্যদিকে জামালগঞ্জে কয়লার সম্ভাব্য মোট পরিমাণ ৫৫০ কোটি টন। ইহার মধ্যে যদি এক-দশমাংশও অর্থাৎ ৫৫ কোটি টন কয়লা উত্তোলন করা যায়, তাহা হইলেও খনিটি উত্তোলনযোগ্য কয়লার মজুতের দিক হইতে বিশ্বের শীর্ষ ১০ খনির তালিকায় উঠিয়া আসিবে। এই খনিটির কয়লাও অনেক বেশি উচ্চমানসম্পন্ন বলিয়া জানাইয়াছেন বিশেষজ্ঞরা। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের হাইড্রোকার্বন ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, জামালগঞ্জের কয়লার ক্যালোরিফিক ভ্যালু বা শক্তি উত্পাদনক্ষমতা নির্ধারণ হইয়াছে প্রতি পাউন্ডে ১১ হাজার ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (বিটিইউ/পাউন্ড)। এই ধরনের কয়লার গঠন শুরু হইয়াছিল পারমিয়ান যুগে, অর্থাৎ ২৫ কোটি বৎসর পূর্বে। অত্যন্ত উচ্চমানের এই কয়লায় সালফারের পরিমাণ খুবই সামান্য। 

সুতরাং খনিটিকে যথাযথ কাজে লাগানো সম্ভব হইলে তাহা দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চলমান ও ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় বড় ধরনের ভূমিকা রাখিবে বলিয়া আশাবাদ ব্যক্ত করাই যায়। যদিও খনিটির গভীরতা অনেক বেশি। তবে ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলিতে এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশেও ইহার চাইতে গভীর খনি হইতে কয়লা উত্তোলন করা হয়। সুতরাং জ্বালানি পণ্যের বর্তমান বাজার বিবেচনায় এই ধরনের খনিগুলি লইয়া নূতন করিয়া চিন্তাভাবনা করা জরুরি।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন