বাংলাদেশের সহিত যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বৎসর উদযাপন উপলক্ষ্যে ঢাকায় আসিয়াছেন প্রয়াত মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড এম কেনেডির পরিবার। কেনিডি পরিবারের সহিত শুরু হইতেই বাংলাদেশের রহিয়াছে এক আত্মিক ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিসংগ্রামে এই পরিবার অকুণ্ঠচিত্তে সমর্থন দান করে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে মার্কিন জনগণের সমর্থনের নিঃস্বার্থ প্রতিনিধি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ভারতের শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে এই দেশের মুক্তিপাগল জনগণের হৃদয় জয় করেন। স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশে আসেন। বাংলাদেশের লড়াকু মানুষ তাহাকে আন্তরিকভাবে অভ্যর্থনা জানান। সেই সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বটগাছের চারা রোপণ করেন। এই গাছটি আজ মহিরুহ হইয়া উঠিয়াছে এবং বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের এক জ্বলন্ত প্রতীক হিসাবে মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইয়া আছে। সেই কেনেডি পরিবারের সদস্যদের বাংলাদেশ আগমনে আমরা যারপরনাই আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত। আমরা স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে তাহাদের আগমনে উষ্ণ অভিনন্দন ও স্বাগত জানাই।
মার্কিন দূতাবাস সূত্রে জানা যায়, গতকাল রবিবার হইতেই সাবেক মার্কিন সিনেটর কেনিডির পরিবারের সদস্যদের সফরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হইয়াছে। তাহারা আগামী ৫ নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক স্থান পরিদর্শন করিবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনসহ বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের সহিত সাক্ষাৎ করিবেন এবং বিভিন্ন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সহিত মতবিনিময়ে অংশ নিবেন। এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতেছেন প্রয়াত সিনেটর এডওয়ার্ড এম কেনেডির ছেলে এডওয়ার্ড এম কেনেডি জুনিয়র। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের স্পিকারস প্রোগ্রামের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য রাখিবেন এবং তাহার স্বনামধন্য পিতার রোপিত সেই বটগাছটি পরির্দশন করিবেন। তিনি এডওয়ার্ড এম কেনেডি সেন্টার ফর পাবলিক সার্ভিস অ্যান্ড দ্য আর্টসে প্রতিবন্ধীদের অধিকারের উপরও বক্তব্য প্রদান করিবেন। তাহার সহিত তাহার পরিবারের অন্য সফরসঙ্গীরা হইলেন এম কেনেডি জুনিয়রের স্ত্রী ড. ক্যাথরিন কিকি কেনেডি, মেয়ে ড. কাইলি কেনেডি, ছেলে টেডি কেনেডি, ভাতিজি গ্রেস কেনেডি অ্যালেন ও ভাতিজা ম্যাক্স অ্যালেন।
আমাদের মনে রাখিতে হইবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পৃথিবীতে স্বৈরাচার ও একনায়কতন্ত্র যেইভাবে জাঁকিয়া বসিয়াছিল, তাহাতে বিশ্ববাসী ছিলেন তটস্থ ও উদ্বিগ্ন। এক পরাশক্তির নিকট তাহারা জিম্মি হইয়া পড়িয়াছিলেন। এমতাবস্থায় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঔপনিবেশিক দেশগুলিকে মুক্ত করিয়া দেওয়ার শর্তে মিত্রবাহিনীর সহিত কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমরা দেখিতে পাইলাম, বিশ্বে এক-এক করিয়া ঔপনিবেশিক দেশগুলি স্বাধীনতা লাভ করিতেছে। ১৯৪৭ সালে ভারত যেই স্বাধীনতা লাভ করে, সেইখানে মার্কিন এই নীতিরই প্রতিফলন ঘটিয়াছে এবং মিত্রবাহিনীর সদস্য ব্রিটেন অবিলম্বে ভারত ছাড়িতে বাধ্য হইয়াছে। তখন হইতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাহার জনগণ সকল সময় মানুষের মুক্তির পক্ষাবলম্বন করিয়া আসিতেছে। ভিয়েতনাম যু্দ্ধ লইয়া এই অঞ্চলে অনেকের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি রহিয়াছে। যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম না দখল করিয়াছিল, না দখল করিতে চাহিয়াছিল। তবে যেই সকল শক্তি ভিয়েতনামের উপর দখলপ্রক্রিয়া বজায় রাখিয়াছিল বা রাখিতে চাহিয়াছিল, তাহাদের হাত হইতে ভিয়েতনামবাসীকে রক্ষা করিবার জন্যই সেইখানে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে লিপ্ত হইতে হয়। ইহা অন্য কেহ বুঝিতে না পারিলেও খোদ ভিয়েতনামবাসী আজ ঠিকই তাহা উপলব্ধি করিতে সক্ষম হইয়াছে; কিন্তু প্রচার-প্রপাগান্ডার কারণে মনে হয়, যেন আমেরিকা ভিয়েতনাম দখল করিয়াছে! যদি তাহাই হইত, তাহা হইলে এখন তাহারা আর মার্কিনপন্থি হইত না। এই পৃথিবীতে বিভিন্ন মতবাদের নামে যেই সমস্ত মানুষকে মৌলিক অধিকার হইতে বঞ্চিত করা হইয়াছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশেষত তাহার জনগণ সর্বদাই তাহাদের পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। এখনো গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকার হারা নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের পক্ষেই জোরালো ও সাহসী ভূমিকা পালন করিতেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউক্রেনের মতো একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশকে এই আধুনিক সভ্যতার যুগে যে কোনোভাবে ও অজুহাতে দখল করা যায় না, তাহার পক্ষে এখনো নিরলস লড়াই চালাইয়া যাইতেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাহার মিত্র দেশগুলি।
আজিকার বাংলাদেশেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া-পাওয়াগুলি সুস্পষ্ট। তাহারা আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করিবার প্রতি সোচ্চার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরোধী। তাহারা বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধির স্বার্থেই কর্মপরিবেশের উন্নয়ন ও শ্রমিক ইউনিয়নের অধিকার রক্ষা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় যেই কারণেই হউক, মিত্রবাহিনীর সদস্য চীনের সহিত যুক্তরাষ্ট্রের একটা নূতন সম্পর্কের বাতাবরণের কারণে তাহারা প্রশাসনিকভাবে পক্ষালম্বন করিতে পারেন নাই; কিন্তু সম্পর্ক রক্ষায় তাহারা না-ও বলেন নাই। তাহার প্রমাণ ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল মার্কিন প্রশাসন কর্তৃক বাংলাদেশকে অবিলম্বে স্বীকৃতি প্রদান এবং একই বত্সরের ১৮ মে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস প্রতিষ্ঠা। কেনেডির মতো বিভিন্ন রাজনীতিবিদ ও মার্কিন জনগণ সরাসরি বাংলাদেশের মুক্তির পক্ষেই ছিলেন। এই সম্পর্কটাই বাংলাদেশ-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আগামী ৫০ বৎসরে আরো উজ্জ্বল ও সুদৃঢ় করিবে নিঃসন্দেহে। এই সম্পর্কের নূতন মাত্রা প্রণয়নে কেনেডি পরিবারের সদস্যগণ বর্তমানে যে বাংলাদেশ সফর করিতেছেন, তাহাতে আমরা কৃতজ্ঞ ও ঋণী।
