বৈশ্বিক মন্দা মোকাবিলায় বাংলাদেশের করণীয়

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২২, ০০:৫০

কোভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে যখন বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা করে তাদের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করছিল, এমন সময়ে হঠাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারি (২০২২) রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ায় ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়ে উঠেছে। এবং আগামী বছর বৈশ্বিক মন্দা সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশসমূহে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে গেছে। ১৯৭৩ সালে ওপেক গঠনের পর শিল্পোন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশসমূহে যেমন বৈশ্বিক মন্দার কবলে পড়েছিল, তার চেয়েও দ্রুততম সময়ে মূল্যস্ফীতির হার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেড়ে গেছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে দ্রব্যের চাহিদা ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে ও আমদানি করার চাহিদাও কমে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ দ্রব্যের মূল্য বেড়ে যাচ্ছে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশসমূহ এবং উন্নয়নশীল দেশসমূহে ক্রমান্বয়ে আঘাত হানতে শুরু করেছে। এই আঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও ধীরে ধীরে গ্রাস করেছে।

যদিও সরকার চেষ্টা করছে; কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির ঘাত-প্রতিঘাত থেকে বাংলাদেশের পক্ষে কখনো দূরে থাকা সম্ভব নয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি, যদি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ না হয়ে আরো দীর্ঘমেয়াদি হয়, তবে বাংলাদেশের মতো দেশে এই দুঃখজনক বোঝা আগামী বছরেও আরো বাড়বে এবং মন্দা অবস্থার সৃষ্টি হবে। এক্ষণে এ দেশের প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে আগামী বছরে দুর্ভিক্ষ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন, যাতে দুর্ভিক্ষ না হয় সেজন্য স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানের আওতায় স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং সবাইকে খালি জায়গায় খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্যাদি উত্পাদনের আহ্বান জানিয়েছেন। তার এই আহ্বান অত্যন্ত যৌক্তিক। এটি বাস্তবায়নে অবশ্যই স্থানীয় প্রশাসনকে নিষ্ঠার সঙ্গে জনগণকে নিয়ে কাজ করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে ডাটাবেজ তৈরি করে যারা বেকার রয়েছেন—তাদের জন্য কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির ন্যায্যতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় দুর্নীতিমুক্তভাবে চালু করতে হবে। পাশাপাশি সঞ্চয় প্রক্রিয়ায় সবাইকে অংশগ্রহণ করতে হবে। কৃষি, খাদ্য এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে একযোগে কাজ করতে হবে, যাতে দেশের জনগণের চাহিদা অনুপাতে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। 

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাকাব এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের উচিত হবে তাদের ব্যাংকিং কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনা এবং জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্যতম কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যোৎপাদন, স্থানীয় পর্যায়ে কৃষিনির্ভর শিল্পোৎপাদন এবং যারা বিদেশে চাকরির জন্য যেতে পারেন তাদের যথাক্রমে সহায়তা করা। বস্তুত কুটিরশিল্প, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরি গঠনে সহায়তা করতে হবে। মাঠ পর্যায়ে উঠান বৈঠকের ব্যবস্থা করে নতুন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার, যাতে তারা নিত্যব্যবহার্য পণ্য কেবল উৎপাদন করবেন না, বরং পণ্য বাজারজাতকরণ ও বিপণনেও সহায়তার ব্যবস্থা ও দায়িত্ব সেবা প্রদানের বিনিময়ে সার্ভিস চার্জ নিয়ে ব্যাংককে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। অনেক সময়ে দেখা যায়, ঋণ গ্রহণের পর ঋণগ্রহীতারা আর ব্যাংকমুখী হন না, বরং ঋণখেলাপি হয়ে পড়েন। ঐসব ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি তৃতীয় সেক্টর হিসেবে দেশি-বিদেশি এনজিওগুলোকে একযোগে সরকারি-বেসরকারি খাতের জনগণের মধ্যে কর্মপরিবেশ প্রতিষ্ঠা, সমাজিক উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক পরিবেশের ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়েছে। মুদ্রানীতি এবং রাজস্বনীতিকে এমনভাবে সমন্বয় সাধন করা প্রয়োজন, যাতে দিনমজুর, মেহনতি শ্রমজীবী মানুষ থেকে আরম্ভ করে নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়। কেননা তাদের স্বাবলম্বী হওয়া প্রয়োজন। যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতাদি পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে। তারা নির্দিষ্ট সময়ে বেতন-ভাতাদি পেলে মানি মালটিপ্লেয়ারের কারণে অন্যদের মধ্যেও কিছুটা কাঙ্ক্ষিত ক্রয়ক্ষমতা বাড়তে পারে।

মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি রোধকল্পে কৃচ্ছ্রসাধনের বিকল্প নেই। সরকারি গাড়িসগুলোর অপব্যবহার এবং পুলের গাড়ির যথেচ্ছ ব্যবহার যে কোনো উপায়ে বন্ধ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে সরকারি গাড়ি এবং পুলের গাড়িগুলোর পৃথক নম্বরপ্লেটের ব্যবস্থা করতে হবে। বিদেশে প্রশিক্ষণ, শিক্ষাগ্রহণ ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে অন্তত এক বছরের জন্য বন্ধ রাখা প্রয়োজন। অভ্যন্তরীণ পণ্য-উৎপাদন যেমন বাড়ানো দরকার, তেমনি আমদানি বিকল্পায়ন শিল্পপ্রতিষ্ঠায় তৃণমূল থেকে উচ্চপর্যায়ে পর্যন্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। যেহেতু পূর্বাভাস রয়েছে—বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের আমদানি কমাবে, অর্থাৎ আমাদের দেশে রপ্তানিতে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে, সেহেতু বিদেশে কী ধরনের পণ্যের চাহিদা বাড়তে পারে—সেদিকে লক্ষ্য রেখে, বাজার যাচাই করে রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। এ লক্ষ্যে বিদেশস্থ আমাদের দূতাবাসসমূহকে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দূতিয়ালির মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ও সংকট মোচনের জন্য একযোগে কাজ করতে হবে। যারা অপ্রাসঙ্গিকভাবে পণ্য আমদানি করতে চাইবেন, তাদের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হবে। অসাধুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইনের আশ্রয় নিতে হবে। দেশ থেকে যাতে আর অর্থ পাচার না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। সম্ভব হলে বিদেশে যেসব অর্থ পাচার হয়ে গেছে তা ফেরত আনতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে কাজ করতে হবে। সংকট মোচনের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ চেতনায় বিশ্বাসী সৎ অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে—যার নেতৃত্বে থাকতে পারেন ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন সাহেব। তার নেতৃত্বে সামগ্রিক অর্থে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মনিটরিং এবং সুপারভিশন প্রয়োজন। প্রয়োজনবোধে সরকারের চিন্তা-চেতনার সঙ্গে আর্থিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় কাজ করার অধিকার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। দেশের অভ্যন্তরে পণ্যের সরবরাহজনিত সমস্যা দূর করতে হবে। কালোবাজারি ও মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

ইতিমধ্যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে, জাপান ও চীন ছাড়া এশিয়ার দেশসমূহে বার্ষিক ভিত্তিতে প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন ৬ দশমিক ২ শতাংশ ২০২১ সাল থেকে হ্রাস পেয়ে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ হবে ২০২২ সালে এবং ২০২৩ সালে হবে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। যদিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আর্থিক কাঠামো ও পরিবেশ ভিন্ন কিন্তু গুটিকয়েক দেশ ছাড়া অন্য সব দেশই মন্দার থাবা থেকে বেরোতে পারবে না। ইতিমধ্যে ইউরোপে যে উচ্চমূল্যস্ফীতি ঘটছে, মধ্যপ্রাচ্যে মূল্যস্ফীতির হার অধিক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ধীরে ধীরে মূল্যস্ফীতির উচ্চ হারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তার নেতিবাচক প্রভাবে আস্তে আস্তে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঢেউ আছড়ে পড়ছে। আবার এদেশে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী আছেন যারা সিন্ডিকেট ও কার্টেল করে পণ্যের দাম বিভিন্ন সময়ে বাড়াচ্ছেন। এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

পূর্বাভাসে দেখা যায়, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরও চলতি বছরের শেষ দিকে মন্দাবস্থায় আক্রান্ত হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন মন্দা অবস্থার কঠিন পরিস্থিতির আবর্তনে গেলে আর্থিক নিরাপত্তা বলয়টি সুসংহত করতে  আবারও এদেশের কৃষি ও কৃষিনির্ভর শিল্পের ওপরই বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং এনজিওগুলোকে স্থানীয় পর্যায়ে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। তবে জাপানের তার স্থিতিশীলতা ধরে রাখার সম্ভাবনা আছে, যেটি আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ব্যাংক অব জাপানের’ মডেল অনুসরণ করতে পারে। মূল্যস্ফীতির মধ্যে ব্যাংকের সুদের হার বাড়ানো উচিত নয় বরং আইএমএফের থেকে ঋণ যত কম নেওয়া যায় ততই ভালো বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন। সঠিক মানবপুঁজি গঠনে সরকারের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকস উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে যে দায়িত্বশীল ভূমিকা স্নাতক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে কাজ করে চলেছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেখানে বিনিয়োগ-পরবর্তী সময় মানবীয় মূলধনে সহায়ক বিধায় সরকারি সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন। আমরা বিশ্বাস করি, যার যার স্থানে থেকে সত্ভাবে কাজ করলে মন্দাবস্থা সামাল দেওয়া কঠিন হবে না। তবে দুর্নীতিবিরোধী চক্রের মূল উৎপাটন করতে হবে।

লেখক : সাবেক ভিসি, প্রেসিডেন্সিয়াল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা। সামষ্টিক অর্থনীতিবিদ, উদ্যোক্তা ও আইটি বিশেষজ্ঞ

 

ইত্তেফাক/ইআ