একজন অনুপ্রবেশকারী গত শুক্রবার ভোরে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির ক্যালিফোর্নিয়ার বাড়িতে প্রবেশ করে হাতুড়ি দিয়ে তার স্বামী পল পেলোসির মাথা ফাটিয়ে দেয়। পেলোসি ঐ সময় ওয়াশিংটন ডিসিতে কাজে ব্যস্ত থাকায় তিনি এই আক্রমণ থেকে বেঁচে যান। ঘটনার পর স্পিকারের অফিস থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পল পেলোসির মাথার খুলি ভেঙে গেছে। ডান বাহু ও হাতে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন তিনি। পলের শরীরে অস্ত্রোপচার করার দরকার পড়েছে এবং তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবেন বলে আশা করা হচ্ছে।’
পলের ওপর হামলাকারীর নাম ডেভিড ডিপেপ, যিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ষড়যন্ত্রমূলক তথ্য-তত্ত্ব ছড়ানোর দায়ে অভিযুক্ত। পলের ওপর হামলার পর গোঁধরা পিপেপকে বলতে শোনা গেছে, ‘ন্যান্সি বাড়িতে না আসা পর্যন্ত আমি এখানে অপেক্ষা করব।’ কী সাংঘাতিক!
সান ফ্রান্সিসকো পুলিশ ডিপার্টমেন্টের (এসএফপিডি) প্রধান উইলিয়াম স্কট বলেছেন, ‘হত্যার চেষ্টা, মারাত্মক অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ, বয়োজেষ্ঠ্যের প্রতি সহিংসতা এবং আরো কিছু অপরাধের কারণে ডিপেপকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।’ যা হোক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো জায়গায় ন্যান্সি পেলোসির মতো রাজনীতিবিদের বাড়িতে অনুপ্রবেশকারীর আক্রমণ এবং ৮২ বছর বয়সী একজন ব্যক্তিকে গুরুতর জখম করার মতো মর্মান্তিক ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই বিস্মিত সবাই।
এরূপ মর্মন্তুদ ঘটনা মার্কিন মুলুকে এবারই প্রথম নয়, বরং মার্কিন রাজনীতিবিদদের এবং বিশেষ করে নারী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান আক্রমণ ও সংঘর্ষের সর্বশেষ নজির পেলোসির বাড়িতে হামলার ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন নারী রাজনীতিবিদদের অনেকেই যে ইন্টারনেটে অকথ্য মন্তব্যের সম্মুখীন হচ্ছেন এবং কখনো কখনো তা যে শারীরিক হুমকি বা সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে, পলের ওপর হামলা সত্যিকার অর্থে এই দাবির বাস্তব চিত্র।
ইউএস ক্যাপিটল পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল—এই সময়কালে কংগ্রেস সদস্যদের প্রতি সহিংসতার হুমকি ১৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, হুমকির মুখে থাকা আইনপ্রণেতাদের বেশির ভাগই নারী ও অন্য বর্ণের মানুষ। আততায়ীর হামলায় বাড়ির জানালা ভাঙার ঘটনার পর রিপাবলিকান সেন সুসান কলিন্স ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’কে বলেছিলেন, ‘বিদ্রূপ ও অভিমান-অবজ্ঞাজনক ফোন কল দিয়ে যার শুরু হচ্ছে, তা সহিংসতা ও সক্রিয় হুমকিতে রূপান্তরিত হচ্ছে।’ তিনি বলেছিলেন, ‘আমি অবাক হব না যদি কোনো সিনেটর বা হাউজের সদস্যকে হত্যার মতো ঘটনা ঘটে।’
এর আগে এ রকমই এক হুমকির সম্মুখীন হন ডেমোক্রেটিক নেতা প্রমিলা জয়পাল। তার বাড়ির বাইরে বহুবার বন্দুক হাতে আততায়ীকে দাঁড়িয়ে থাকেত দেখা গেছে। সেই ঘটনার পর জয়পালের স্বামী বলেছিলেন, তিনি দুই জন লোকের কণ্ঠস্বর শুনেছেন, যারা চিৎকার করে অশ্লীল কথাবার্তা বলছিল। ‘প্রমিলা জয়পাল আত্মহত্যা করলেই কেবল আমরা হট্টগোল থামাব’ বলে ওই হন্তারকদের চেঁচাতে শুনেছেন জয়পাল। ঘটনার পর জয়পাল ‘টাইমস’কে বলেন, ‘যখন আমরা এ ধরনের ঘটনা ঘটার বিষয়ে কথা বলি, তখন তাকে খুব একটা বড় ঘটনা না-ও মনে হতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কাউকে বন্দুক হাতে আপনার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা কিংবা আপনার প্রতিবেশীদের ভয় দেখানো, আপনার কর্মীদের ভয় দেখানো এবং স্পষ্টভাবে আপনাকেই ভয় দেখানোর চেষ্টা করার মতো ঘটনা যে কতটা ভয়াবহ, তা কেবল ভুক্তভোগীই জানেন।’
এ ধরনের ঘটনা ঘটে গত বছরও। সাউথ ক্যারোলিনার রিপাবলিকান ন্যান্সি মেস অভিযোগ করেছিলেন, তার বাড়িতে অশ্লীল, অকথ্য গ্রাফিতি (বিশেষ উদ্দেশ্যে দেওয়াললিখন) আঁকা হয়। চালানো হয় ভাঙচুর। নিউ ইয়র্কের ডেমোক্রেটিক আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ এত বেশি হুমকি পান যে তিনি একটি সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দল রাখতে বাধ্য হয়েছেন। এমনকি পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে, প্রায়শই তিনি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় রাত কাটাতে বাধ্য হন! ম্যানিপুলেট করা একটি ভিডিওর কারণেই মূলত আলেকজান্দ্রিয়ার এই দুরবস্থা!
সাম্প্রতিক সময়ে যে হারে সহিংসতা বেড়ে গেছে এবং তা সংঘাতে রূপ নিচ্ছে, তাতে একটা বিষয় পরিষ্কার যে, অনলাইনের অপব্যবহার বিশ্বকে নারীদের জন্য অনিরাপদ করে তুলছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, মিডিয়ায় সহিংস ঘটনা দেখার ফলেই মূলত সহিংসতা বা আগ্রাসন বাড়ছে। আর সব থেকে দুঃখজনক বিষয় হলো, নারী রাজনীতিবিদেরা অনলাইনে অপব্যবহার এবং বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা-প্রবাহের সম্মুখীন হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি, যা নিতান্তই অনাকাঙ্ক্ষিত।
পেলোসি ডানপন্থিদের ঘৃণার একটি বিশেষ লক্ষ্য। ২০১৯ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে তিনি রীতিমতো লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। এই লড়াই থেকেই মূলত যত বাজে পরিস্থিতির উদ্ভব। একের পর এক ‘ম্যানিপুলেট করা ফেক’ ভিডিওর মাধ্যমে পেলোসিকে আক্রমণ করা হয়। এজাতীয় ভিডিওর সুবিধা লুফে নেন খোদ ট্রাম্প ও তার ব্যক্তিগত আইনজীবী রুডি গিউলিয়ানি। তাদের হাত ধরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ভিডিও বিশ্বব্যাপী ভাইরাল হয়ে যায়। গত বছরের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার সময় ট্রাম্পের সমর্থকেরা যখন অফিসে ভাঙচুর করেছিল, তখন তাদের চিৎকার করে বলতে শোনা গেছে—‘তুমি কোথায়, ন্যান্সি?’
শুক্রবার পেলোসির বাড়িতে হামলার সময় ডিপেপের মুখ থেকেও এই শব্দগুলোর উচ্চারণ শোনা গেছে বারবার—‘ন্যান্সি কোথায়?’ এই ঘটনার পর এটা সন্দেহাতীতভাবে স্পষ্ট হয় যে, হয়রানি, ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সহিংসতা বন্ধ করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। মিডিয়া সংস্থাগুলোর ভাষ্য, তারা তাদের সাইটে সহিংসতা কিংবা বিদ্বেষ, হয়রানি-ঘৃণার কোনো উপাত্ত সমর্থন করে না। তাদের দাবি এমন যে, তারা এ ধরনের ঘৃণা সহ্যই করে না। অথচ বাস্তবতা বলছে পুরোপুরি ভিন্ন কথা। এটা জলের মতো পরিষ্কার, এ ধরেনের বিষয় বা কন্টেন্ট অহরহ ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের প্ল্যাটফরমে। সুতরাং স্পষ্ট করে বলতে গেলে, এরূপ অপব্যবহার বন্ধ করতে কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই দ্রততার ভিত্তিতে সঠিক ও কার্যকর উপায় গ্রহণ করতে হবে। বাস্তবিক অর্থেই আমাদের এমন ব্যবস্থার উপায় খুঁজে বের করতে হবে, যাতে করে সোশ্যাল প্ল্যাটফরমগুলোতে বিদ্বেষমূলক কন্টেন্ট প্রবেশের সুযোগ না পায়। কিংবা খুব সহজেই ঘৃণা ও সহিংসতামূলক কন্টেন্ট প্ল্যাটফরম থেকে সরিয়ে নেওয়া যায়।
পল পেলোসির ওপর যে ধরনের ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা অবশ্যই অত্যন্ত দুঃখজনক। এই অবস্থায় এফবিআইয়ের উচিত অনলাইন-অফলাইন উভয় প্ল্যাটফরমেই নারীর প্রতি বিদ্বেষ- ঘৃণার তদন্ত ও বিচার করা। এই কাজ করতে সংস্থার যদি বড় তহবিলের প্রয়োজন পড়ে, তবে সেক্ষেত্রে কংগ্রেসের উচিত হবে তার ব্যবস্থা করা। এই উদ্যোগের সম্প্রসারণে তহবিল বাড়ানোর স্বার্থে সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলোর ওপর কর আরোপ করার মতো ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে। যেসব আইনপ্রণেতাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে, তারা এজাতীয় বিলের পক্ষে ভোট দিতে পেরে খুশি হবেন বলেই আমি মনে করি।
পেলোসির বাড়িতে অকল্পনীয় আক্রমণের ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, কংগ্রেস সদস্যদের প্রতি সহিংসতা কী মাত্রায় বাড়ছে! এ ঘটনা আরো সাক্ষ্য দেয় যে, অতিসত্ত্বর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারলে সংগ্রেস সদস্যদের নিরাপত্তা নাগালের বাইরে চলে যাবে। তাই সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর উচিত সহিংসতাকে উসকে দিতে পারে এমন কন্টেন্ট প্রচার বন্ধ করা। এই ঘটনা তো বটেই, অতীতের ঘটনাগুলোর পাশাপাশি হুমকি ও আক্রমণের মুখে থাকা প্রতিটি ঘটনাকেই তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনতে হবে। এ বিষয়ে সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করা এফবিআইএর জন্য অবধারিত হয়ে পড়েছে। এই ভয়ংকর প্রবণতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে কালবিলম্ব করাটা সুখকর পরিস্থিতির হবে না আদৌ। বরং সেন কলিন্সের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়ে ওঠার আগেই যা করার করতে হবে। একে থামাতেই হবে। সত্যিকার অর্থেই সংঘাতের কবলে পড়ে কোনো একজন কংগ্রেস সদস্যের মৃত্যু হওয়া অবধি হাত গুঁটিয়ে বসে থাকাটা হবে চরম নির্বুদ্ধিতা।
লেখক : হফস্ট্রা ইউনিভার্সিটির লরেন্স হার্বার্ট স্কুল অব কমিউনিকেশনের সহযোগী অধ্যাপক ও ট্রেজারি বিভাগের (ওবামা প্রশাসনের) সাবেক আন্তর্জাতিকবিষয়ক মুখপাত্র
সিএনএন থেকে ভাষান্তর :সুমৃৎ খান সুজন
