বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত সিলেট অঞ্চলে শিল্প বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। যথাযথ বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে দেশে কর্মসংস্থান, আয়স্তর, উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন করা সম্ভব হবে।
২০২১ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫ দশমিক ২৩ শতাংশ কর্মহীন-বেকার ছিল। একটি ব্রিটিশ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় অথবা কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারী বেকারত্বের হার ছিল ৪৭ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারী বেকারত্বের হার যথাক্রমে ৩০ শতাংশ, ২৮ শতাংশ, ২০ শতাংশ এবং ৭ দশমিক ৮ শতাংশ । শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তেমনভাবে সৃষ্টি হচ্ছে না। দেশীয় উদ্যোক্তাগণের বিনিয়োগ, প্রবাসীগণের বিনিয়োগ অথবা বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি পেলে দেশে শিক্ষিত কর্মহীন বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে উত্সাহ প্রদান এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীগণকে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একান্ত প্রয়োজন।
মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে ছিল দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান প্রভৃতি দেশের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ। মালয়েশিয়ার অটোমোবাইল সেক্টরে বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে এবং এই সেক্টরে মালয়েশিয়ার ৩০ হাজার কর্মহীন শিক্ষিত বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হয়েছে। সিলেট অঞ্চলে প্রবাসী বিনিয়োগের দৃষ্টান্ত রয়েছে। এজন্য এখানে একটি প্রাইভেট স্পেশাল ইকোনমিক জোন তৈরি করা আবশ্যক বলে অনেকে মনে করেন।
সম্প্রতি ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর এবং কনফেডারেশন অব ব্রিটিশ ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট লর্ড কারান বিলিমোরিয়া সিলেট চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগে পরিচালিত একটি মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানটিতে সিলেট অঞ্চলের অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সংক্রান্ত তথ্য ও উপাত্ত উপস্থাপনের সুযোগ আমার হয়েছিল। লর্ড কারান এর আগে রানী এলিজাবেথের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় লন্ডন সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন। তিনি বাংলাদেশে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী। সিলেটে তাদের বিনিয়োগের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এ জন্য ইতিমধ্যে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দসহ বিশিষ্টজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেছেন।
আমরা জানি, সিলেট অঞ্চলের জিডিডির পরিমাণ প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট অঞ্চলের মাথাপিছু নমিনাল জিডিপির পরিমাণ ৩০৫০ মার্কিন ডলার। সিলেট অঞ্চলে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জনগণের বেকারত্বের হার ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। সিলেট অঞ্চলে ছোট, বড় অথবা মাঝারি ধরনের মোট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার ৫০০টি। ২০২১ সালে প্রবাসীগণের মাধ্যমে প্রেরিত সিলেট অঞ্চলের মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা। এ অর্থের একটি বিরাট অংশ এসেছে ইংল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব থেকে। দেশের মোট রেমিট্যান্সে সিলেট অঞ্চলের অবদান ছিল ৮ দশমিক ০৩৬ শতাংশ। ২০২১ সালে সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন ব্যাংকগুলোতে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৫৩,৩৫৯.৭২ কোটি টাকা এবং ঋণ আকারে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রদান করা হয়েছে ১৪,৫৮৮.৫৫ কোটি টাকা। ঋণ আমানতের অনুপাত ০.২৫৪। সিলেট অঞ্চলে শিল্প খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ৬ শতাংশ।
একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, আমেরিকাতে ১০ কোটি টাকার অধিক বিনিয়োগ করতে সক্ষম এমন বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন প্রায় ২৭ হাজার, ইংল্যান্ডে প্রবাসী রয়েছেন প্রায় ১৩ হাজার এবং জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশে এর সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। সম্ভাব্য এ সব বৃহৎ বিনিয়োগকারীগণের কাছ থেকে যদি মাত্র ১ কোটি টাকা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করানো সম্ভব হয় তবে দেশে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ হবে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। তাছাড়া সম্ভাব্য ক্ষুদ্র প্রবাসী বিনিয়োগকারীগণ রয়েছেন যারা বিনিয়োগ করতে সক্ষম।
সিলেট অঞ্চলে সম্ভাব্য বিনিয়োগের খাত হিসেবে ২০টি চিহ্নিত করা যায়। খাদগুলো হলো আগর আতর শিল্প, সিরামিক শিল্প, রাবার শিল্প, কৃষিজাত শিল্প, পর্যটন শিল্প, আইটি খাত, বেত শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা খাত, শিক্ষা খাত, কৃষি যন্ত্রপাতি শিল্প, ব্যাটারি এবং টায়ার উৎপাদন, ইট উৎপাদন, প্লাস্টিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, ক্যাবল শিল্প, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, বায়ো-ফার্টিলাইজার প্ল্যান্ট, গবাদি-পশুজাত শিল্প, চারকোল ইন্ডাস্ট্রি, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প ইত্যাদি। এছাড়াও গ্লাস ও সিমেন্ট উৎপাদন, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, টেক্সটাইল শিল্প, পাওয়ার ও সোলার প্ল্যান্ট ইত্যাদিতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
সিলেট অঞ্চলে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য একটি প্রাইভেট স্পেশাল ইকোনমিক জোন প্রয়োজন। সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালকগণ মনে করেন, ইংল্যান্ডে অবস্থানরত প্রায় ৫ লাখ সিলেট অঞ্চলের প্রবাসীগণ এবং বাংলাদেশে ইংল্যান্ডের বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সিলেট অঞ্চলে একটি ‘ব্রিটিশ স্পেশাল ইকোনমিক জোন’ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। প্রবাসীগণের বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রবাসীগণের পরবর্তী প্রজন্মের সম্পর্ক বজায় থাকবে। বিষয়টি অনুধাবন করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন।
লেখক : অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
