সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিভেদ বাড়াইবার রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিত্যাজ্য

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২২, ০১:১০

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বিচারক চার্লস ডব্লিউ পিকারিং তাহার এক অবজারভেশনে বলিয়াছিলেন, সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য প্রয়োজন একটি শালীন সমাজব্যবস্থা—আর ইহার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ, উদারভাবে চিন্তা ও সহনশীলতা। তাহার এই উক্তি শুধু আশাই জাগাইতে পারে, কিন্তু বাস্তবসম্মত নহে। কারণ বিশ্বব্যাপী রাজনীতির ইতিহাসে এই উদারতা, সহনশীলতা পুরাদস্তুর আমরা দেখি নাই। যেইখানে ক্ষমতার রাজনীতি আছে এবং ছিল, সেইখানেই ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতায় টিকিয়া থাকার লড়াই ঝগড়াঝাঁটির মধ্য দিয়াই সুরাহা হইতে দেখা যায়। এবং যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়াটাই শেষ কথা হইয়া থাকে। তথাপি দেশভেদে বিগত শতকে একটা ন্যূনতম মূল্যবোধ আমরা দেখিয়াছি। কিন্তু বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে অধিকাংশ দেশেই রাজনৈতিক বৈরিতা জিঘাংসায় পরিণত হইতে দেখা যাইতেছে। উহা রাজনীতির মাঠ ছাড়িয়া ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে শত্রুতায় পর্যবসিত হইতেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট দ্য গ্যল বলিয়াছিলেন, রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতেই ছাড়িয়া দেওয়া উচিত। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে দেশে দেশে জনগণের বিশাল অংশ কেবল ভোট প্রদান করিয়া বা সমর্থন দিয়াই অথবা নিজ দলের পক্ষে প্রচার করিয়াই ক্ষান্ত হইতেছে না, নিজেরাও জনগণের মধ্যে সামাজিক, পারিবারিক বিভাজন করিয়া লইতেছে। উন্নত দেশ যুক্তরাষ্ট্রে রাজনীতিতে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট-সমর্থকদের মধ্যে সামাজিক যোগোযোগ পর্যন্ত বন্ধ হইবার উপক্রম হইয়াছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিগত নির্বাচনের পর আমরা দেখিয়াছি রিপাবলিক পার্টির কয়েক শত সমর্থক ফলাফল না মানিয়া ক্যাপিটল বিল্ডিংয়ে সহিংস অনুপ্রবেশ করে, যাহা দেশটির ইতিহাসে আর কখনোই দেখা যায় নাই। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির স্বামীকে ঘরে ঢুকিয়া যিনি হাতুড়ি দিয়া আক্রমণ করিয়াছেন, তিনি কোনো বড় রাজনৈতিক কর্মী নহেন। অথচ হাতুড়ি তুলিয়া লইয়াছেন রাজনৈতিক বিষয় লইয়াই। আন্তর্জাতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী ব্রাজিলের মানুষ ভাগ হইয়া গিয়াছে গত রবিবারের নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করিয়া। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট জায়ার বলসনারোকে চুলচেরা ব্যবধানে পরাস্ত করিয়াছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও দুর্নীতির দায়ে ৫৮০ দিন কারাগারে দিন কাটানো লুলা ডি সিলভা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট বলসনারোর সমর্থকরা তাহাকে ‘চোর’ বলিয়া স্লোগান দিয়া চলিয়াছে, যাহা জনগণকে দ্বিধাবিভক্ত করিয়া চলিয়াছে। অথচ নির্বাচনের পর যে যাহার কর্মে চলিয়া যাইবার কথা। নির্বাচনের ফলাফলই যদি মানিয়া লইব, তাহা হইলে ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্টকে অপমান করিবার হেতু কী? 

এই সমস্যা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে আরো প্রকট, আরো সরেস হইয়া উঠিয়াছে। রাজনীতিতে খুনাখুনি, হানাহানি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে নিত্যনৈমিত্তিক। কিন্তু দিন যত যাইতেছে জনগণের মধ্যে বিভক্তি, ফারাক যেন ক্রমশই আরো আক্রোশপূর্ণ হইয়া উঠিতেছে। সমাজ, সমাজের চলাফেরা এমনকি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যবসায়-বাণিজ্য পর্যন্ত বিভক্ত হইয়া পড়িতেছে। এমন সংবাদও প্রকাশ হইতে দেখা যায় যে স্ত্রী স্বামীর পছন্দের দল বা প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ায় তালাকের সম্মুখীন হইয়াছেন। কেবল কেহ একটি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করিবার কারণে চাকরি হারাইবার উদাহরণও বিরল নহে। বিগত দিনে আমরা দেখিয়াছি, চাকরি পাইবার যোগ্যতাও বিবেচিত হইয়াছে দলীয় পরিচয়ের উপর ভিত্তি করিয়া। এমনকি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে প্রশাসনের কর্মচারীদেরও তাহাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিফলন ঘটাইতে দেখা যায়, যাহা একটি দেশের চলমান রাষ্ট্র পরিচালনব্যবস্থাকে ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করিয়া থাকে। রাজনীতির এই সাংস্কৃতিক পতন গোটা বিশ্বকেই  কমবেশি পিছাইয়া দিতেছে। এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিকে ফেলিতেছে পঙ্গু করিয়া। প্রতিটা জাতিরই শেষ পর্যন্ত কিছু ক্ষেত্রে ঐক্য থাকে। যেমন জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায়। বর্তমানে বিশেষ করিয়া উন্নয়নশীল দেশগুলিতে জাতীয় স্বার্থের ব্যাপারেও জনগণকে বিভক্ত দেখিতে পাওয়া যায়।  সকল দেশকে এই ব্যাপারে সচেতন হইতে হইবে। জাতির মধ্যে মতপার্থক্য থাকিবে, এমনকি মতবিরোধও থাকিবে। কিন্তু সামাজিক কর্মকাণ্ডে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে, পারিবারিক জীবনে বা প্রশাসনে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হইলে উহা যে কোনো জাতির সম্মুখে আগানোকে বাধাগ্রস্ত করিবে, ইহাই স্বাভাবিক।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন