প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯-২০ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে জনকল্যাণমূলক হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহত্ এই বাজেট যথাযথভাবে বাস্তবায়নে সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবেন। যাতে বাংলাদেশটাকে আমরা আমাদের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারি। এটা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে জাতির পিতার সোনার বাংলাদেশ হিসেবেই আমরা প্রতিষ্ঠা করার পথে এগিয়ে যাব। সবদিক থেকেই বাংলাদেশ যে অগ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে সেই গতিটা যেন চলমান থাকে সেজন্য তিনি বাজেট বাস্তবায়নে সকলের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।
গতকাল শুক্রবার বিকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র ২০১৯-২০ অর্থ বছরের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ: সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’ শ্লোগান সম্বলিত নতুন অর্থ বছরের জন্য ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়। বাজেটের পরের দিন অর্থমন্ত্রী বাজেটের খুঁটিনাটি বিষয় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন- এমনটা এতদিন হয়ে আসলেও এদিন তিনি অসুস্থ থাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিক সম্মেলন করে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। বৃহস্পতিবার বর্তমান সরকারের নতুন মেয়াদের প্রথম বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী অসুস্থ বোধ করলে প্রধানমন্ত্রী তাঁর পক্ষে বাজেট বক্তৃতার বাকি অংশ পাঠ করে ব্যতিক্রমী নজির সৃষ্টি করেন।
এই বাজেট অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগীদের পক্ষে গেছে কিনা একজন সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নাম উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে কিছু লোক থাকে, যাদের একটা মানসিক অসুস্থতা থাকে, তাদের কিছুই ভালো লাগে না। আপনি যত ভালো কাজই করেন, তারা কোনো কিছু ভালো খুঁজে পায় না। গবেষণা করে তারা দেশের জন্য কী আনতে পেরেছে- এমন প্রশ্ন রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারপরও তাদের একটা কিছু বলতে হবে। তো সেটা ভালো- এত সমালোচনা করেও আবার বলবে- ‘আমরা কথা বলতে পারি না’।
বাজেট নিয়ে সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার কথা হচ্ছে, আমার সাধারণ জনগণ খুশি কিনা। সাধারণ মানুষগুলির ভালো করতে পারছি কিনা। এটা হচ্ছে বড় কথা।’
আওয়ামী লীগ সরকার যে এবার নিয়ে টানা ১১ বারের মত বাজেট দিল- সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যা করছি, তার সুফলটা কিন্তু মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। আর এই ভালো না লাগা পার্টি যারা, তাদের কোনো কিছুতেই ভালো লাগবে না।
সিঙ্গেল ডিজিট সুদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে যাবে সরকার
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সবসময় চেষ্টা করেছি, যাতে সুদটা সিঙ্গেল ডিজিটে থাকে। এ জন্য ব্যাংকগুলোকে সুবিধাও দিয়েছি। কিন্তু অনেক বেসরকারি ব্যাংক সেটা মানেনি। এবার বাজেটে নির্দেশনা দেওয়া আছে-এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে যাওয়া হবে। ব্যাংকগুলোকে নিয়ম মেনে চলতে হবে। তাহলে আমাদের বিনিয়োগ বাড়বে। বেশি আর চক্রবৃদ্ধি আকরে সুদ হতে থাকলে মানুষ আর ব্যবসা করতে পারবে না। অনেক আইন আমরা সংশোধন করবো।
পুঁজিবাজারে সুশাসন চান প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা পুঁজিবাজারে সুশাসন দেখতে চাই। একটি শক্তিশালী অর্থনীতির পাশাপাশি আমরা দেখতে চাই একটি বিকশিত পুঁজিবাজার।’ শিল্পে বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ সংগ্রহের আদর্শ মাধ্যম হচ্ছে পুঁজিবাজার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদের ঋণ সংগ্রহে ঋণগ্রহীতাদের উত্সাহ প্রদানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’ প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য অনেক প্রণোদনা থাকছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ আয় করমুক্ত থাকবে। বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশের ওপর দ্বৈত কর পরিহার করা হবে।’ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে উত্সাহ দিতে বিশেষ প্রণোদনা অব্যাহত থাকবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় প্রণোদনা স্কিমের আওতায় ৮৫৬ কোটি টাকা আবর্তনশীলের ভিত্তিতে পুনর্ব্যবহারের জন্য ছাড় করা হয়েছে।’
কর্মসংস্থান আছে বলেই ধান কাটার লোক পাওয়া যায় না
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে বেকার নেই এবং কর্মসংস্থান আছে বলেই ধান কাটার লোক পাওয়া যায় না। দিনে ৪০০/৫০০ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি তিন বেলা খাওয়া দেওয়া হলেও ধান কাটার লোক পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমরা কর্মসংস্থানের কথা বললেই সবার ধারণা হয়ে যায় চাকরি দেওয়ার কথা। আমার ১০০টি অঞ্চল তৈরি করছি বা প্রতিনিয়িত প্রজেক্টগুলো করছি। একটা প্রজেক্ট সম্পন্ন হলে কত মানুষের কাজ হবে, চাকরি হবে।
বন্ধ থাকা এমপিওভুক্তির কাজ শুরু হয়েছে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশে উন্নীত করা। শিক্ষা খাতে জোর দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আগামী অর্থবছরে এ খাত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।’ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবির প্রেক্ষিতে বন্ধ থাকা এমপিওভুক্তির কাজ শুরু হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবার স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। স্বাস্থ্য উন্নয়নের মাধ্যমে চিকিত্সা ও অন্যান্য সামাজিক সুবিধা নিশ্চিতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা-কক্সবাজার রুটে দ্রুতগামী বুলেট ট্রেন পরিচালনা করা যায় কি-না, এ বিষয়ে একটা সমীক্ষা করা হবে। রেলওয়ের সার্বিক উন্নয়নে সরকার ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৬-৪৫ পর্যন্ত ৩০ বছরব্যাপী মহাপরিকল্পনা নিয়েছে।
অপ্রদর্শিত অর্থ পাচার না করে বিনিয়োগ করুন, প্রশ্ন করব না
অপ্রদর্শিত অর্থ দেশের বাইরে পাচার না করে দেশে বিনিয়োগ করা হলে কোনো প্রশ্ন করা হবে না বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতেও যেন এ বিষয়ে তাদের প্রশ্ন করা না হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেশ থেকে অর্থ পাচার ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, অর্থপাচার ঠেকাতে আলাদা কমিটি আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, অ্যাটর্নি জেনারেলে কার্যালয় সবাইকে মিলিয়েই কমিটি আছে। আন্তর্জাতিক কমিটিও আছে। সবাই মিলে ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে অর্থপাচার যেখানেই হচ্ছে, ধরা পড়ছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশ থেকে যেন অর্থ পাচার হয়ে না যায়, সে কারণে অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শনের সুযোগও দেওয়া হচ্ছে।
মিডিয়ার মালিকেরা কত টাকা ঋণ শোধ দেননি জানতে চান প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ১০ বছরেও সরকার খেলাপি ঋণের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যাঁরা এখানে পত্রিকা ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় কাজ করেন, তাঁদের একটি কথা জিজ্ঞেস করব, আপনারা কি একটি খবর নেবেন যে আপনাদের পত্রিকার মালিকেরা কে কোন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন এবং শোধ দিয়েছেন কি না? বা খেলাপি হয়ে সেটাকে আবার পুনরায় ই (পুনঃতফসিল) করে গেছেন। আপনারা দয়া করে সব ব্যাংক থেকে এই তথ্যটি বের করেন, যত মিডিয়া এখানে আছেন, যত পত্রিকা, প্রত্যেকেই বলবেন (মালিকদের) যে এটা আমি অনুরোধ করেছি।’ তিনি বলেন, তারা (মিডিয়া মালিকরা) যেন তাদের টাকাটা শোধ দিয়ে তারপরে তাদের পত্রিকায় এ ব্যাপরে (খেলাপি ঋণ নিয়ে) লেখেন, সে ব্যাপারে আমার অনুরোধ থাকবে। বেশি বেশি ঋণ খেলাপি হওয়ার কারণ তুলে ধরে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান শেখ হাসিনা।
একটি অনলাইন নিউজপোর্টালের এক সাংবাদিক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীকে লিখিত প্রশ্ন করলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রেজিস্ট্রেশন ছাড়া অনলাইন পত্রিকা চলতে পারে না। যত্রতত্র গজিয়ে উঠছে। এগুলো রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। আগে রেজিষ্ট্রেশন করেন, পরে উত্তর দেব।
বেশি চিনি খেলে ডায়াবেটিস হয়, তাই চিনি আমদানিতে শুল্ক
২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে চিনি আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী খানিকটা রসিকতা করেই বলেন, চিনি খেলে ডায়াবেটিস হতে পারে বিধায় এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্যের বিষয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধানের গুদাম নির্মাণ হচ্ছে। ধান ক্রয় করার লক্ষ্য আমরা নিয়েছি। প্রায় চার লাখ মেট্রিক টন ধান ক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়া হয়। কৃষকদের নিজেদের অল্প অর্থই ব্যয় হয়। বলতে গেলে সরকারই সবচেয়ে বেশি অর্থ দিয়ে থাকে। কৃষকের সব রকমের সুযোগ-সুবিধা আমরা দিয়ে থাকি।
শব্দ বিভ্রাটে বিরক্ত প্রধানমন্ত্রী
সাংবাদিক সম্মেলনে ‘শব্দ বিভ্রাটে’ বিরক্ত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুক্রবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সংবাদ সম্মেলন চলাকালে এই শব্দ বিভ্রাটের ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন শুনতে পাচ্ছিলেন না। বারবার ইকো (শব্দের পুনরাবৃত্তি) হচ্ছিল।
সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূইয়া। অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
