সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সময়ের সহিত তাল মিলাইতে অনীহা কেন

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২২, ০০:৪০

‘ইনফরমেশন ইজ পাওয়ার’—ইহা একবিংশ শতাব্দীর স্লোগান। ইহার মর্মকথা হইল, তথ্যকে যেই জাতি যত বেশি কার্যকরভাবে কাজে লাগাইতে পারিবে তাহারা তত আগাইয়া যাবে। আর ইহার পূর্বশর্ত—যোগাযোগমাধ্যমের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা, তথ্য আদান-প্রদানে সুরক্ষার বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া। অথচ আমাদের দেশে এই ক্ষেত্রে উপেক্ষার চিত্রই অধিক লক্ষণীয়। বিশেষ করিয়া, গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগমাধ্যম ইমেইলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করিবার প্রশ্নে অবহেলার কোনো সীমা নাই। আজিকার বিশ্বে অফিস-আদালতের তথ্য-উপাত্ত স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ইমেইল সর্বাধিক প্রচলিত মাধ্যম হওয়ার কারণে ইহার সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কিন্তু এমন অনেক কর্মকর্তা-আমলা রহিয়াছেন, যাহারা সরকারি ইমেইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সতর্কতা অবলম্বন করেন না। সরকারি কিংবা রাষ্ট্রমালিকানাধীন দপ্তরসমূহের নিজস্ব ইমেইল ব্যবহারের বিষয়ে তাহাদের একপ্রকার অনীহা রহিয়াছে। সুনির্ধারিত নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও মন্ত্রণালয় কিংবা দপ্তর-অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ নথি, এমনকি রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর তথ্য-উপাত্ত, চালাচালির ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন তো করিতেছেনই না, অধিকন্তু এইগুলি সুরক্ষিত-নিরাপদ রাখিবার বিষয়েও তাহারা ভাবনাহীন।

অধিকাংশ সময় লক্ষ করা যায়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রার্ড ইমেইল ব্যবহারের পরিবর্তে ব্যক্তিগত ইমেইলে তথ্য আদান-প্রদান করেন কর্মকর্তারা, যাহা সম্পূর্ণরূপে নিয়মবহির্ভূত। এরূপ বিপজ্জনক ও বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ড করিয়াই তাহারা ক্ষান্ত হন না, বরং এমনটিও ঘটিতে দেখা যায়—কোনো কর্মকর্তা বদলি হইবার পর তাহার স্থলাভিষিক্ত নূতন কর্মকর্তা অফিসের নির্ধারিত ইমেইলের পাসওয়ার্ড খুঁজিয়া পাইতেছেন না তথা নূতন কর্মকর্তাকে পাসওয়ার্ড বুঝাইয়া না দিয়া তাহা সঙ্গে করিয়া লইয়া যাওয়া হইয়াছে, যাহা ঝুঁকিপূর্ণও বটে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নথি যেই ইমেইলে সংরক্ষিত থাকে তাহা লইয়া এহেন অবজ্ঞা-অবহেলা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নহে। ইমেইল, ওয়েব পাসওয়ার্ড কিংবা সুরক্ষা কোডকে উপেক্ষা করিবার পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হইতে পারে, তাহা নিকট অতীতে দেখিয়াছি আমরা—বাংলাদেশকে বিপুল অর্থের মাশুল গুনিতে হইয়াছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই সংক্রান্ত বৃহৎ কেলেঙ্কারির একাধিক নজির রহিয়াছে বিশ্বে। সর্বক্ষেত্রেই দেখা গিয়াছে, বেহাত হওয়া ইমেইল দুষ্কৃতকারীদের হাতে পড়িলে মহা সর্বনাশ অনিবার্য। 

সরকারি ইমেইলের পরিবর্তে ব্যক্তিগত ইমেইল এবং ইহার যথেচ্ছ ব্যবহার যে কত বড় বিপদ ডাকিয়া আনিতে পারে, তাহা কল্পনারও বাহিরে। ইমেইলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করিতে না পারিবার কারণে মার্কিন রাজনীতিক হিলারি ক্লিনটন চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। সম্প্রতি ব্রিটেনেও দেখা গিয়াছে লঙ্কাকাণ্ড। সরকারি নথি ব্যক্তিগত ইমেইলে আদান-প্রদান করিবার কারণে মাশুল গুনিতে বাধ্য হন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুয়েলা ব্রাভারম্যান। সেই ঘটনায় সুয়েলা পদত্যাগ করিতে বাধ্য হন। ঘটনা এখানেই থামিয়া থাকে নাই। নূতন প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক সুয়েলাকে মন্ত্রিসভায় স্থান দিলে অতীতের ‘ইমেইল ইস্যু’কে সামনে আনিয়া নূতন করিয়া সমালোচনার ঝড় উঠিয়াছে। এই ঘটনাগুলির মতো ইমেইল বিড়ম্বনার বহু অতীত দৃশ্য রহিয়াছে। বাস্তবতা হইল, ইমেইল ব্যবহারে অবজ্ঞার সুযোগকে কাজে লাগাইয়া ইমেলকে কবজা করিতে তৎপর রহিয়াছে বহু দুষ্ট গোষ্ঠী। 

প্রযুক্তির ব্যবহার দ্বিপাক্ষিক-বহুপাক্ষিক যোগাযোগ সহজ করিবার পাশাপাশি অধিকতর গতিশীল করিয়াছে অফিশিয়াল কাজকর্মকে। একবিংশ শতাব্দীতে বাস করিয়া ইমেইলের মতো বহু প্রযুক্তিগত সুবিধাকে কাজে লাগাইয়া সরকারি-বেসরকারি অফিস-সংস্থা ব্যাপকভাবে উপকৃত হইতেছে—এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। সত্যিকার অর্থেই বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলাইয়া চলিতে যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে কাজে লাগানো অপরিহার্য। আগেকার দিনে দাপ্তরিক ফাইলপত্র স্থানান্তর করিতে যেইখানে দিনের পর দিন লাগিয়া যাইত, সেইখানে বর্তমানে সেকেন্ডের ব্যবধানে তাহা করা যাইতেছে। আধুনিক বিশ্বে ইমেইলের মতো মাধ্যমগুলি শুধু প্রয়োজনীয়ই নহে, অফিস-আদালত পরিচালনার ক্ষেত্রে তাহা সরকারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গের ন্যায়। সুতরাং ইমেইল ব্যবহারে সতর্ক হইতে হইবে। জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য স্থানান্তরে ব্যক্তিগত ইমেইল ব্যবহার হইতে বিরত থাকিতে হইবে। এখন দিনে এই বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া অতি জরুরি হইয়া উঠিয়াছে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন