বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী চার জাতীয় নেতা

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২২, ০০:১০

৩ নভেম্বর জেল হত্যা দিবসে বাঙালি জাতির মুক্তির রূপকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার সার্বক্ষণিক পার্শ্বচর, আদর্শিক সহগামী এবং একান্ত আস্থাভাজন জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও কামারুজ্জামানের প্রতি অনিঃশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করছি। সেই সঙ্গে শ্রদ্ধা জানাই দেশমাতৃকাকে ভালোবেসে আত্মবলিদানকারী সব শহিদের প্রতি।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের কালরাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য এবং নিকটাত্মীয় পরিবারের সদস্যদের পর্যন্ত হত্যা করার মধ্যে দিয়ে যে মধ্যযুগীয় নৃশংসতার সূচনা হয়েছিল, তা গড়িয়েছিল সে বছরেরই ৩ নভেম্বর বঙ্গবন্ধুর দক্ষিণ হস্ততুল্য চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও কামারুজ্জামানের হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত। ১৫ আগস্টের রাতে খুনিরা বঙ্গবন্ধু আর তার আত্মীয় পরিবারগুলোর দুগ্ধপোষ্য শিশু বা গর্ভবতী নারীদের পর্যন্ত রেহাই দেয়নি।  অনুরূপভাবে, ১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বর কারারুদ্ধ চার জাতীয় নেতার নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েও তারা চরমতম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে। প্রচলিত সব নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে সেদিন তারা জেলের ভেতরে ঢুকে মেশিনগানের ব্রাশফায়ার করে নিরস্ত্র, নিরপরাধ চার নেতাকে হত্যা করেছিল। 

বঙ্গবন্ধুকে আমরা যদি বাংলাদেশ নামক একটা ভবনের ছাদ বলে মনে করি, তবে এই চার নেতা ছিলেন সে ভবনের চারটে নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ, যাদের ওপর একান্তভাবে নির্ভর করে ছাদটি দাঁড়িয়ে ছিল, আর সবাইকে আশ্রয় ও ছায়া দিয়ে যাচ্ছিল। এই চার নেতাই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অগ্রণী সংগঠক। তারাই ছিলেন মুজিবনগর সরকারের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানি কারাগারে বন্দি, তার অনুপস্থিতিতে এই চার নেতাই আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একাত্তরের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের শত্রুরা সেদিন দেশমাতৃকার সেরা সন্তান জাতীয় এই চার নেতার বুকে শুধু গুলি চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, কাপুরুষের মতো গুলিবিদ্ধ দেহকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল। ইতিহাসের এই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় শুধু বাংলাদেশের মানুষই নয়, স্তম্ভিত হয়েছিল সমগ্র বিশ্বমানবতা। কারাগারে অন্তরীণ অবস্থায় এ ধরনের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন।  

জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতীয় চার নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বহুপরীক্ষিত ছায়াসঙ্গী, একনিষ্ঠ অনুসারী। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর খুনি মোশতাক গং অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে। কিন্তু তারপর মোশতাক গংকে পালটা সামরিক অভ্যুত্থানের ভয় পেয়ে বসে। যদিও তৎকালীন চার জন সিনিয়র নেতাসহ অনেকেই কারাগারে এবং অনেকে আত্মগোপনে ছিলেন। বাকি নেতারা প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদের সঙ্গে সমঝোতা করেন। অনেকে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়ও হয়ে যান। অবশেষে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরবর্তী মাস তিনেকের মাথায় ৩ নভেম্বর তৎকালীন সিজিএস মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে এক পালটা অভ্যুত্থান অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেনাবাহিনীর মধ্যে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা ছিল। সিনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। একদিকে জিয়াউর রহমান এবং অন্যদিকে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ। মোশতাক গং ভেবেছিলেন খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানটি আওয়ামী লীগ বা বাকশালের পক্ষে হচ্ছে। ক্ষমতাসীন মোশতাক বা তার সমর্থকরা চায়নি তাদের বিরোধী আরেকটি শক্তি ক্ষমতায় আসুক। এ ধরনের একটা সরকার হলে, জেলে থাকা চার নেতাই ছিলেন তার সম্ভাব্য কর্ণধার। এটা ভেবেই তারা সেদিনই চার নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তারা মনে করেছিল, এই চার নেতাকে মেরে ফেললে পালটা সামরিক অভ্যুত্থান হলেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার অন্যতম প্রধান হোতা রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনের নেতৃত্বে তারা পাঁচ জনের একটি ঘাতক দল গঠন করে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন পর মোসলেহ উদ্দিনকে অনারারি লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত করা হয়। ১৫ আগস্ট শেখ মনির বাসায় হত্যাযজ্ঞে নেতৃত্ব দিয়েছিল এই মোসলেহ উদ্দিন। মোশতাক গং অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে চার নেতাকে হত্যার নীল নকশা তৈরি করে।

মোশতাক গং খুনের জন্য বেছে নেয় কারাগারের মতো নিরাপদ জায়গাকে, যেখানে সব কয়েদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হেফাজতে থাকে এবং তাদের প্রত্যেককে কারাগারে যথাযথ নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের অবশ্য কর্তব্য বলে বিবেচিত হয়। খুনিরা সেই রাষ্ট্রযন্ত্রকেই ব্যবহার করে কারাগারে অবৈধ অনুপ্রবেশ করে। তারপর সব আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চার নেতাকে কারাগারের ভেতর ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। শুধু ব্রাশফায়ার করেই খুনিরা ক্ষান্ত হয়নি, বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে চার নেতার মৃত্যু নিশ্চিত করেছে, আর তারপর বীরদর্পে বেরিয়ে গেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হেফাজত তথা কারাগারের ভেতর এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ বিরল। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রমকেও বন্ধ করে দিয়েছিল তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমান। 

চার জাতীয় নেতার হত্যাকাণ্ডের বেদনাবহ স্মৃতিভারাতুর দিনে আমরা আবারও কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি আমাদের জাতীয় স্বাধিকার আন্দোলনে ও স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের বিশাল অবদানের কথা। পঁচাত্তরের আগস্টে জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের খন্দকার মোশতাক, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, কোরবান আলীসহ অনেক নেতা আপস করলেও এরা চার জন বঙ্গবন্ধুর রক্তের সঙ্গে কোনোরকম বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। তারা বঙ্গবন্ধুর প্রতি, এই দেশের প্রতি ভালোবাসার ও আনুগত্যের বিরল উদাহরণ রেখে গেছেন। আমরা তাদের কাছে শিখতে পারি দেশপ্রেম, বঙ্গবন্ধুর প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস ও আনুগত্য। ন্যায়নীতির প্রশ্নে কীভাবে অটল আপসহীন হতে হয়, সেটা চার জাতীয় নেতা আমাদের দেখিয়ে দিয়ে গেছেন, এবং যুগ যুগ ধরে তারা আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবেন। 

 

লেখক : সংসদ সদস্য, কুষ্টিয়া-৩ (সদর) এবং যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন