মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত: জাতীয় নিরাপত্তায় কতটুকু হুমকি?

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৪

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে 'সার্বভৌমত্ব' শব্দটি কেবল মানচিত্রের সীমানা রক্ষা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, সার্বভৌমত্ব হলো একটি রাষ্ট্রের তার ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা এবং নাগরিকদের জানমালের নিরঙ্কুশ নিরাপত্তা প্রদানের সক্ষমতা। কিন্তু বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে গত কয়েক দশকে, বিশেষ করে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত যা ঘটছে, তা আমাদের সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞাকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ৯ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে মিয়ানমারের রাখাইন (সাবেক আরাকান) রাজ্যে যে নতুন মাত্রার সংঘাত শুরু হয়েছে, তা কেবল প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা নয়, বরং বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জননিরাপত্তার ওপর এক সুদূরপ্রসারী আঘাত।

রাখাইন রাজ্য, যা ঐতিহাসিকভাবে আরাকান নামে পরিচিত, তা সব সময়ই মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য একটি মাথাব্যথার কারণ ছিল। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থানে থাকা এই অঞ্চলটি এখন কেবল জান্তা বনাম আরাকান আর্মির লড়াইয়ের ময়দান নয়, বরং এটি এখন বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্রবিন্দু।

বিগত দুই বছর ধরে বিদ্রোহী আরাকান  আর্মি (এএ) রাখাইনের একের পর এক শহর জান্তা সরকারের আয়ত্ত থেকে দখল করে নিয়েছে। মিয়ানমার জান্তা সরকার জাতিগত নির্মূলের উন্মাদনায় রোহিঙ্গাদের অত্যাচার নির্যাতনের মধ্য দিয়ে দেশান্তরী করে কার্যত রাখাইন অঞ্চলে নিজেদের নিরাপত্তার ভারসাম্য চিরতরে নষ্ট করেছে। একসময়ের শক্তিশালী এই জনপদ থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দেওয়ার ফলে যে জনশূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহী 'আরাকান আর্মি'র (এএ) জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় পর্যায়ের কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রতিরোধ না থাকায় বিদ্রোহীরা অতি দ্রুত তাদের আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পায়। রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার মধ্য দিয়ে তারা আসলে আরাকান আর্মিকে একটি উন্মুক্ত যুদ্ধক্ষেত্র উপহার দিয়েছে, সেটি জান্তা বাহিনী এখন উপলব্ধি করছে কি না জানি না। তবে এর ফলে আজ রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ জান্তার হাত থেকে কার্যত ফসকে গেছে।

২০২৪ সালে উভয় পক্ষের যুদ্ধের মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে যখন মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিজিপির ৩৩০ জন সদস্য বাংলাদেশে পালিয়ে আসে, তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে জান্তা বাহিনী সেখানে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। কিন্তু ৯ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। এবারের লড়াই আর কেবল জান্তা বনাম বিদ্রোহী নয়। এবারের লড়াই হচ্ছে 'এলাকা দখলের লড়াই'। আরাকান আর্মি এখন রাখাইনের অঘোষিত শাসক। তারাও জান্তা সরকারের মতো রোহিঙ্গাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা নিজ ভূমিতে ফেরার তাগিদে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির এই একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে কয়েকটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী— যেমন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন— আরএসও, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি-আরসা এবং আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি—এআরএ। বিভিন্ন মাধ্যমে যেটি জানা যাচ্ছে; তাতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মিয়ানমার জান্তা বাহিনী নিজেদের পরাজয় ঠেকাতে এখন 'বিভাজন ও শাসন' নীতি গ্রহণ করেছে। তারা রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দিচ্ছে এবং আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে রাখাইন এখন এক চতুর্মুখী লড়াইয়ের ক্ষেত্র, যার বুলেটের শব্দ প্রতিদিন বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মানুষের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে।

এদিকে রাখাইন রাজ্যের বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে শক্তিশালী পক্ষ হলো আরাকান আর্মি। বৌদ্ধ জাতিগত পরিচয়ে ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বাহিনীটি আজ মিয়ানমারের জান্তা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। তাদের লক্ষ্য হলো 'আরাকান ড্রিম' বাস্তবায়ন করা, যার অর্থ রাখাইন রাজ্যের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতা। বর্তমানে রাখাইনের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু বর্তমানে যে প্রতিরোধের মুখে পড়ছে, তা তাদের জন্য অভূতপূর্ব। আগে লড়াই ছিল কেবল জান্তা বাহিনীর সঙ্গে, এখন লড়াই হচ্ছে ঐসব গোষ্ঠীর সঙ্গে, যারা নিজেদের এলাকায় প্রভাব ধরে রাখতে চায় ।

কয়েক বছর সীমান্তের ওপারে যে অবিরাম গোলাগুলি চলছে, তা সরাসরি বাংলাদেশের নাগরিকদের জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। এই ৯ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই দফার সংঘাত কেবল মিয়ানমারের গহিন অরণ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা এখন আমাদের জিরো লাইনের খুব কাছে চলে এসেছে।

টেকনাফে শিশুটি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। যখন কোনো দেশের সীমানার ভেতরে অন্য দেশের বুলেট এসে পড়ে, তখন সেটি আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় 'সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন' (Violation of Sovereignty)। ৯ জানুয়ারির পর থেকে যে ৪৯ জন সশস্ত্র সদস্য বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে, তারা মূলত পরাজয় থেকে বাঁচতে অথবা আমাদের ভূখণ্ডকে 'বাফার জোন' হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। ২০২৪-এর ফেব্রুয়ারিতে ২৬৪ জন বিজিপি ও সেনাসদস্যের প্রবেশের  ঘটনাটি ছিল কেবল সরকারি বাহিনীর পলায়ন । কিন্তু বর্তমানের এই ৪৯ জন বা তার বেশি সশস্ত্র সদস্যের প্রবেশ অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এদের কোনো রাষ্ট্রীয় পরিচয় নেই, এরা মিলিশিয়া বা বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এরা বাংলাদেশে প্রবেশ করে আমাদের শরণার্থী শিবিরগুলোতে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে কিংবা পাহাড়ি অঞ্চলে আত্মগোপন করতে পারে। 

সীমান্ত এখন মাইনে বিদ্ধ। মিয়ানমার জান্তা বাহিনী আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে জিরো লাইনে মাইন পুঁতে রেখেছে। এই ল্যান্ডমাইনগুলো কেবল তাদের শত্রুদের জন্য নয়, এগুলো আমাদের সীমান্তবর্তী মানুষের পঙ্গুত্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীন ও ভারতের অবস্থান এখানে দ্বিমুখী। রাখাইনে চীনের বিশাল বিনিয়োগ কয়কপু (Kyaukpyu) সমুদ্রবন্দর ও পাইপলাইন রয়েছে। 

অন্যদিকে ভারতও তাদের 'কালাদান মালটি-মোডাল প্রজেক্ট' নিয়ে চিন্তিত। এই পরাশক্তিগুলো মূলত তাদের নিজ নিজ স্বার্থ দেখছে, যেখানে বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা  বা রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন অনেকটা গৌণ হয়ে পড়েছে। 

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন ৩৩০ জন বিজিপি সদস্য এসেছিল, 'তাদের ইন্টারনিস' ('Internees' যা অন্য দেশের সীমান্তে এসে আশ্রয় নেয় বা ধরা দেওয়া) হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু ৯ জানুয়ারি ২০২৬-এর পর যে ৪৯ জন বা তার বেশি সশস্ত্র সদস্যের অনুপ্রবেশ ঘটেছে, তাদের পরিচয় এখনো ধোঁয়াশায়। তারা যদি কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্য না হয়ে কেবল বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্য হয়, তবে তাদের অনুপ্রবেশকে ‘সশস্ত্র আগ্রাসন' হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, বাংলাদেশ এই ইস্যুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি আলোচনার দাবি তুলতে পারে।

রাখাইন যদি যদি পুরোপুরি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়, তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আগামী এক দশকের জন্য অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। ওপার থেকে আসা গুলিতে এপারে আমাদের শিশু বিদ্ধ হওয়া প্রমাণ করে যে, এখন সময় এসেছে আমাদের সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতার একটি দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর। মিয়ানমার সীমান্ত-সংকট আজ আমাদের জাতীয় ঐক্যের এক অগ্নিপরীক্ষা। রাখাইনে ৯ জানুয়ারি থেকে যে এলাকা দখলের লড়াই চলছে, তাকে পুঁজি করে কোনো পক্ষ যাতে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি নষ্ট করতে না পারে, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে।

সার্বভৌমত্ব কেবল মানচিত্রে অঙ্কিত একটি রেখা নয়; এটি একটি জীবন্ত প্রতিশ্রুতি যা রাষ্ট্র তার নাগরিকদের দেয়। টেকনাফে গুলিবিদ্ধ শিশুটি বা মাইনে পা হারানো সেই অসহায় নাগরিকটি আমাদের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বেরই প্রতিচ্ছবি। মিয়ানমার সীমান্তসংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একবিংশ শতাব্দীতে টিকে থাকতে হলে আমাদের দরকার অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, কৌশলী কূটনীতি এবং সর্বে একটি অবিচল নৈতিক অবস্থান।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট

ইত্তেফাক/এএইচপি