সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

কালদিবস মনে রাখিয়া সামনে আগাইতে হইবে

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২২, ০০:৫০

আজ হইতে ৪৭ বৎসর পূর্বের এই দিনে, অর্থাৎ ৩ নভেম্বর বাংলাদেশের জেলখানার অভ্যন্তরে এমন এক নিষ্ঠুর, হৃদয়বিদারক ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল, যাহার দাগ এখনো জাতির শরীর হইতে মুছিয়া ফেলা সম্ভব হয় নাই। ইহা অনপনেয়ও বটে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোররাত্রিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাহার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য এবং নিকট আত্মীয়দের পর্যন্ত হত্যা করার মধ্যে দিয়ে যে মধ্যযুগীয় নৃশংসতার সূচনা হইয়াছিল, তাহা গড়াইয়াছিল দুই মাস ১৮ দিবস পর, অর্থাৎ ৩ নভেম্বর তাহারই বিশ্বস্ত, দক্ষিণ হস্ততুল্য চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও কামারুজ্জামানের হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত। ইহা ছিল সেই ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডেরই ধারাবাহিকতা। প্রচলিত সকল নিয়মকানুনকে উপেক্ষা করিয়া, পেশিশক্তির বলে জেলখানায় প্রবেশ করিয়া মেশিনগানের গুলিতে হত্যা করা হয় এই চার নেতাকে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধকালে এই চার নেতাই ছিলেন দেশ পরিচালনা ও নেতৃত্বের দায়িত্বে। জাতির জন্য আরো মর্মভেদি বিষয় হইল, যাহারা বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং হত্যাকাণ্ডের সুফল পান, তাহারা এই জেল হত্যাকাণ্ডের তদন্ত পর্যন্ত বন্ধ করিয়া দেন। দীর্ঘকাল ধরিয়া এই হত্যাকারীদের বিচার বন্ধ করিয়া রাখা হয়। কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ সম্পর্কে দেশবাসী অবগত। বরং হত্যাকারীরা বিভিন্ন পুরস্কারে-পোস্টিংয়ে ভূষিত হন। এই দেশটিকে স্বাধীন করিতে হইয়াছিল রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়া। যাহারা জীবনের বিনিময়ে এবং জীবনের ঝুঁকি লইয়া স্বাধীনতা আনিয়াছিলেন, উপরিউক্ত ঘটনাবলির মধ্য দিয়া এই দেশে তাহারা দীর্ঘকাল উপেক্ষিত হইয়াছেন। 

যুগে যুগে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কেন্দ্র করিয়া হত্যাকাণ্ড ঘটিয়াছে। ক্ষমতার লোভে, ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করিতে, নিরঙ্কুশ করিতে ভাই ভাইকে, পিতা পুত্রকে অথবা পুত্র পিতাকে হত্যা করিয়াছে। বিশ্বব্যাপী এই ধরনের নৃশংস কাণ্ডের পুনরাবৃত্তিই দেখা গিয়াছে; কিন্তু এই সকল ঘটনা কাহাকেও শিক্ষা দিতে পারে নাই। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র বলিতে একটি কথা চালু আছে। এই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রও থামিতে দেখা যায় না। ইতিহাসের পাতায় পাতায় ইহার পুনরাবির্ভাব দেখা গিয়াছে। যে কোনো দেশেই হউক, এই রকম ঘটনাবলি যে আর ঘটিবে না এমন কোনো নিশ্চয়তা কাহারো নিকট নাই। সুতরাং আমাদের এমন চিন্তা দ্বারা তাড়িত হইতে হইবে, যেন ইতিহাসের ঐ ধারাবাহিকতা হইতে বাহির হইয়া আসিতে পারি। যাহারা দেশ শাসন করিবেন তাহাদের চিন্তা থাকিতে হইবে বাস্তবমুখী। রাষ্ট্রের সিস্টেমগুলিকে সুবিন্যস্তকরত সুপরিচালনার ব্যবস্থা করিতে হইবে। মধ্যযুগে ইউরোপ, অটোমানদের মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনায় শক্তিপ্রদর্শনের যে পরম্পরা ছিল, তাহা কিন্তু ঐ সকল সমাজে আজ অনুপস্থিত। ইউরোপে একের পর এক শাসক আসিতেছেন, চলিয়া যাইতেছেন; কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতা তাহাদের নিকট হইতে কুক্ষিগত করিবার জন্য কেহ তাহাদের হত্যা করিয়া ক্ষমতা হইতে সরাইবার কথা চিন্তা করিতেছে না। ইহার কারণ সেইখানকার সিস্টেম কাজ করিতেছে। উন্নয়নশীল বিশ্বে আজও এই সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা যায় নাই বিধায় আমরা প্রতিনিয়তই বিভিন্ন দেশে ক্ষমতা কুক্ষিগত করিতে অস্ত্র ব্যবহার, কায়িক শক্তির ব্যবহার দেখিতে পাই। বাংলাদেশের ৩ নভেম্বরের শোকের দিবসে আমাদের শোকের পাশাপাশি এমন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা মাথায় রাখিতে হইবে যাহাতে জাতীয় চার নেতা হত্যার মতো কলঙ্কজনক ঘটনা আর কখনোই বাংলাদেশে সংঘটিত হইবার কোনো সম্ভাবনা না থাকে। তাহা হইলেই তাহাদের জীবন দানকে আমরা অর্থবহ করিতে পারিব। আজ প্রয়াত জাতীয় নেতাদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন