পাঁচ বছরেও ১৫ খুনের তদন্তে অগ্রগতি নেই

আপডেট : ১৪ জুন ২০১৯, ২২:৪২

মাত্র ৫ বছরে রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির ঘটনার জের ধরে ১৫টি খুনের ঘটনা ঘটে। গত বছরের ১৫ জুন বাড্ডা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ আলীকে প্রকাশ্যে শত শত মানুষের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়। চলতি বছরের ১৮ মার্চ রাতে মেরুল বাড্ডায় জুলহাস হোসেন মোল্লা নামে এক ব্যক্তিকে টারজান গ্রুপের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। ফরহাদ আলীকে হত্যায় জড়িত সন্দেহে নূরুল ইসলাম ও অমিত নামে দুই অস্ত্রধারী কিলার ডিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। আর জুলহাস খুনের সঙ্গে জড়িত থাকা টারজান গ্রুপের প্রধান মনিরও একইভাবে নিহত হয়। তবে ফরহাদ হত্যার এক বছরে তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ফরহাদের স্ত্রী মুর্শিদা বেগম।

গতকাল ফরহাদের স্ত্রী এ ব্যাপারে বলেন, ‘আমার স্বামীকে জুমার নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর শত শত মানুষের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়। কারা তাকে হত্যা করেছে-এটা এলাকাবাসী জানে। এখন এই হত্যার সঙ্গে জড়িত রমজান ও সুজন প্রকাশ্যে বীরদর্পে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের পুলিশ গ্রেফতার করছে না। অথচ তাদের গ্রেফতার করলেই এই খুনের রহস্য জানা যাবে।’

ফরহাদ আলী হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী বাদী হয়ে ৪ জনের নাম উল্লেখ করে বাড্ডা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। আসামিরা হলেন, ফজলুল হক দুলাল ওরফে ল্যাংড়া দুলাল, দুলালের জামাতা মোহাম্মদ বিপ্লব, আব্দুর রহিম ও কামরুল। ল্যাংড়া দুলালের সঙ্গে নিহত ফরহাদের ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। নিহত ফরহাদ আলী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। এই ওয়ার্ড স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমদেও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলে উভয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। মামলায় উল্লেখ করা আব্দুর রহিম বেরাইদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং কামরুল ইসলাম বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের নেতা। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক কারণে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এই দুই জনের নাম মামলায় দেওয়া হয়েছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পরিদর্শক জালাল উদ্দিন বলেন, ফরহাদ কিলিং মিশনে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে আবুল কালাম আজাদ ওরফে অনির, বদরুল হুদা সৌরভ, বিল্লাল হোসেন রনি, জাকির হোসেন ও আরিফ মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এই ঘটনায় আসামি গ্রেফতার করতে গিয়ে নূর ইসলাম ও অমিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। এর বাইরে মানিক, পবন, আরিফ হোসেন, রমজান, পুলক ও মান্নান পলাতক রয়েছেন। এদের মধ্যে মানিক হলেন আমেরিকা প্রবাসী শীর্ষ সন্ত্রাসী মেহেদীর ডান হাত। মেহেদীর ক্যাডার বাহিনীকে মানিক ও রমজান নিয়ন্ত্রণ করে। শীর্ষ সন্ত্রাসী মেহেদীর সঙ্গে ভারতে আত্মগোপন করা শীর্ষ সন্ত্রাসী আশিকের যোগাযোগ রয়েছে।

পাঁচ বছরে ১৫ খুন : ২০১৪ সালের ৩ মে বাড্ডা জাগরণী সংসদ ক্লাবে সন্ত্রাসীরা গুলি করে বাড্ডা থানা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন রাহিনকে হত্যা করে। ২০১৫ সালের ১৩ আগস্ট রাতে বাড্ডার আদর্শনগর পানির পাম্প এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান গামা, বাড্ডার ছয় নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শামসুদ্দিন মোল্লা, ব্যবসায়ী ফিরোজ আহমেদ মানিক ও যুবলীগ নেতা আবদুস সালাম। খুনের সঙ্গে জড়িত মানিক, রমজান, আরিফ হোসেন, পবন, মান্নান ও পুলক এখনও পুলিশের খাতায় পলাতক। ২০১৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মেরুল বাড্ডার মাছের আড়তে আবুল বাশার বাদশাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় নুরুল ইসলাম নুরু নামে একজনকে অস্ত্রসহ জনতা আটক করে। পরে নুরু ডিবি পুলিশের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।

২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল বাড্ডার বেরাইদ বাজারে বেরাইদ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের ছোট ভাই কামরুজ্জামান দুখুকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০১৮ সালের ৯ মে রাতে ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে জাগরণী ক্লাবে ঢুকে আব্দুর রাজ্জাক ওরফে ডিশ বাবুকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ওই ঘটনায় পরবর্তীতে ডিবি পুলিশের সঙ্গে সাফায়েত তামরিন নামে একজন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। প্রতিটি খুনের পিছনে আমেরিকা প্রবাসী শীর্ষ সন্ত্রাসী মেহেদীর হাত রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।