শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭২’র সংবিধানকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে’ 

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২২, ০০:১৫

জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী বলেছেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কাল রাত্রিতে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর সামরিক শাসন জারি করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে সংবিধানকে নানাভাবে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। অসাংবিধানিক শাসন কায়েম করে ভুলন্ঠিত করা হয়েছে সংবিধানকে। গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করা হয়। অবৈধ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭২’র আদি সংবিধানের মূল চেতনা ও দর্শনের মূলে কুঠারাঘাত করা হয়। 

শুক্রবার (৪ নভেম্বর) বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হওয়ার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্পিকার এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, পরবর্তীকালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই সকল অবৈধ সামরিক ফরমানবাতিল করে ৭২’র সংবিধানকে অনেকাংশেই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। 

অনুষ্ঠানের সভাপতি প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, সুপ্রিম কোর্ট তার বিপুল সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে কখনো পিছপা হয়নি। যার ফলে সামরিক শাসন অবৈধ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। সেজন্য আজ বিচার-প্রার্থীর অগাধ আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এই সুপ্রিম কোর্ট। সংবিধানের বিশেষ অংশকে প্রত্যেক শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর সংবিধান গৃহীত হওয়ার দিবস। এবার সেই গৃহীত হওয়ার সুবর্ণজয়ন্তী। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের উদ্যোগে সংবিধান গৃহীত হওয়ার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে সুপ্রিম কোর্ট জাজেস কমপ্লেক্সে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সকল সদস্যদের মধ্যে যারা জীবিত রয়েছেন তাদের হাতে এবং যারা মারা গিয়েছেন তাদের স্বজনদের হাতে বিশেষ সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

স্পিকার বলেন, বঙ্গবন্ধুর দর্শন ধারণ করে সংবিধান। যা বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের মধ্য দিয়ে অর্থবহ হয় সেই লক্ষ্য অর্জন করাটাই আমাদের কাজ হবে। এই সংবিধানকে সুরক্ষিত ও সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে আমাদের সদা সচেতন থাকতে হবে। আমরা এই অঙ্গিকার করছি যে সংবিধানের সুফল বাংলার মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেব। এই সংবিধান তখনই সার্থক হবে যখন বাংলার মানুষ ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও বৈষম্য থেকে মুক্ত হয়ে উন্নত জীবন পাবে। তিনি বলেন, দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় রাষ্ট্রের তিন অঙ্গকে সংবিধানে বর্ণিত নিজস্ব পরিধিভুক্ত থেকে পারস্পারিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে আইনের শাসন, সমতা, ন্যায়নুবর্তিতা ও জনগণের কল্যাণের স্বার্থে কাজ করে যেতে হবে। সংবিধানের আলোকে আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ পারস্পারিক সমন্বয় ও কার্যকর ভূমিকার মধ্য দিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের অব্যাহত অগ্রযাত্রা সুসংহত রাখার লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা ব্যতিরেকে কোন সভ্য গণতান্ত্রিক সমাজের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। সংবিধানের বিধানসমূহ সমুন্নত রাখার মাধ্যমে এদেশে আইনের শাসন, গণতন্ত্র, মৌলিক মানবাধিকার, অর্থনৈতিক, সামাজিক সাম্য ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার অবিচল অঙ্গীকারের প্রতিশ্রুতবদ্ধ হয়ে বাংলার মাটিতে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে সুপ্রিম কোর্ট। আর সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা অক্লান্তভাবে তাদের উপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। আর দেশের মানুষ এদেশের বিচারালয়ের উপর যে অগাধ আস্থা রেখেছে এর সবই হচ্ছে সংবিধানের প্রতি আপামর জনগণের আস্থা ও বিচারকদের সুকঠিন পরিশ্রমের কারণে।

সংবিধান নিয়ে ফুটবল খেলার পথ রুদ্ধ হয়েছে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে: আইনমন্ত্রী
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার জনগণকে ৭২’র সংবিধানের চার মূলনীতি ফিরিয়ে দিয়েছে। সংবিধান নিয়ে ফুটবল খেলার পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়েছে। দেশে সাংবিধানিক ও আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করেছেন।
সংবিধান ব্যাখ্যায় মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট বিবেচনা না নিলে সংবিধান হবে যান্ত্রিক, সিদ্ধান্ত হবে ভুল: বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম সংবিধানের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে আপিল বিভাগের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম বলেন, আমরা যারা সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকের দায়িত্ব পালন করছি সংবিধান ব্যাখ্যায় আমাদের সবসময় মননে ও চেতনায় ধারণ করতে হবে দীর্ঘ স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ লাখ লাখ শহীদ ও বীরাঙ্গনাদের আত্মত্যাগ। এটা না হলে সংবিধান হবে যান্ত্রিক, সিদ্ধান্ত হবে ভুল। আমাদের পূর্বসূরি মেধাবী বিচারকদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই যে ইতিপূর্বে অনেক সময় সংবিধান ও আইন ব্যাখ্যায় মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট আদৌও বিবেচনায় না নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছা যায়নি। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত একজনকে নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়াসহ নানা বিষয় রয়েছে। আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে সংবিধান ব্যাখ্যা করলে এ ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকা যাবে।
পাঠ্যসূচীতে সংবিধান ও স্বাধীনতার

ঘোষণাপত্র চান ব্যারিস্টার এম আমীর অনুষ্ঠানে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, দেশের বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যশ্রেণিতে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও সংবিধান পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। তিনি বলেন, সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের। আর সুপ্রিম কোর্টকে সংবিধানই এই ক্ষমতা দিয়েছে।

হাইকোর্টের বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি শুরু থেকেই দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বিচ্যুত বকরার চেষ্টা করেছে। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে সামরিক ফরমানবলে নানা সময়ে সংবিধানকে কাটাছেড়া করেছে। সংবিধানের সেইসব সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেছে সুপ্রিম কোর্ট।

এছাড়া অনুষ্ঠানে আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান, অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. মোমতাজউদ্দিন ফকির বক্তব্য রাখেন। উপস্থিত ছিলেন আপিল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, বিচারপতি মো. বোরহান উদ্দিন প্রমুখ।  

ইত্তেফাক/এমএএম