সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সময় এখন শক্ত করিয়া সিটবেল্ট বাঁধিবার

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২২, ০১:০২

বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়া যাইবার সময় শক্ত করিয়া সিটবেল্ট বাঁধিতে হয়, যাহাতে বিপদ ঘটিলেও ক্ষতি কম হয়। সম্প্রতি আইএমএফের ম্যানেজিং ডিরেক্টর একটি সম্মেলনে বিশ্বের ১৯০টি দেশের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করিয়া বলিয়াছেন শক্ত করিয়া সিটবেল্ট বাঁধিতে। কারণ, মহামারির পর হইতে যেই অর্থনৈতিক সংকট লইয়া বিশ্বব্যাপী এত দুর্ভাবনা—তাহা ক্রমশ প্রকট হইতেছে। এই অবস্থায় বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে সমগ্র পৃথিবীর অর্থনীতি ‘স্লো ডাউন’—অর্থাৎ আয়, কর্মসংস্থান, নিয়োগ, বিনিয়োগ, উৎপাদন—সকল কিছুই হ্রাস পাইতেছে। কেবল বৃদ্ধি পাইতেছে মুদ্রাস্ফীতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে দেশে জীবনযাত্রার সংকট গভীর হইতেছে। বিশ্ববাজারে খাদ্য, জ্বালানিসহ পণ্যসামগ্রীর দাম ও জাহাজভাড়া বৃদ্ধি পাওয়া এবং সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হইবার কারণে সংকট জটিলরূপ ধারণ করিতেছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের জের ধরিয়া আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস, তৈল ও খাদ্যশস্যের মূল্য বাড়িয়াই চলিতেছে। স্বাভাবিকভাবেই আমদানিনির্ভর দেশগুলি অধিক বেকায়দায় পড়িয়াছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেন লাগামহীন ঘোড়ার মতো ছুটিয়া চলিতেছে। 

কিন্তু সাধারণ মানুষকে তো বাঁচিতে হইবে। তাহারা এত কিছু বুঝিতে চাহে না। তাহারা চক্ষু মেলিয়া বিশ্বটিকে দেখিতে চাহে না। ভুখা মানুষের অন্তর্দৃষ্টি থাকে না। তাহারা কেবল ক্ষুধা বুঝে; কিন্তু অন্ধ থাকিলে তো প্রলয় বন্ধ হইবে না। সমস্যায় পড়িলে তো অভিযোগ আসিবেই। আমরা দেখিতে পাইতেছি, কেবল উন্নয়নশীল বিশ্বেই নহে, পৃথিবীময় অভিযোগের পাহাড় জাগিয়া উঠিতেছে। পৃথিবীময় সকল দেশের সরকার হিমশিম খাইতেছে এই সংকটকে প্রশমিত করিতে, একটুখানি স্বস্তির সহিত সামলাইতে; কিন্তু তাহার পরও পরিস্থিতি বাগে আনা যাইতেছে না। সুতরাং অভিযোগ করা হইতেছে বটে, তাহা করিবার অধিকার সকলেরই রহিয়াছে; কিন্তু কী করিবার আছে? কী আছে বিকল্প উপায়? খারাপ অবস্থায় অভিযোগ করা যাইবে না, উহা মানিয়া লইতে হইবে—আমরা তাহা বলিতে চাহি না; কিন্তু আমাদের ভাবিতে হইবে—এই পরিস্থিতিতে আমাদের কী করিবার আছে। তাহার জন্য চক্ষু মেলিয়া দেখিতে হইবে এই বিশ্বের পরিস্থিতিকে। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র। তাহাদের শ্রম বিভাগ সম্প্রতি জানাইয়াছে—সর্বশেষ মে মাসে গত বৎসরের একই সময়ের তুলনায় খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশ ও জ্বালানির দাম ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে। সেই দেশে ১৯৮১ সালের পর এতটা মূল্যস্ফীতি আর দেখা যায় নাই। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলির মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ৮ দশমিক ১ শতাংশ। নিউজিল্যান্ডে ২২, তুরস্কে ২৪, আর যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে ৪০ বৎসরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ মূল্যস্ফীতি দেখা যাইতেছে শ্রীলঙ্কায়। অন্য দেশগুলির মধ্যে পাকিস্তানে ১৩ দশমিক ৮, ভারতে ৭ দশমিক ৭৯, নেপালে ৭ দশমিক ২৮, বাংলাদেশে ৬ দশমিক ২৯। এই অবস্থায় প্রত্যেক দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহার করিয়া চলিতে হইতেছে। বাংলাদেশের জনগণকেও কৃষি উৎপাদনের স্বার্থে উচ্চমূল্যে সার, জ্বালানি ও ভোজ্য তৈল ক্রয় করিতে হইতেছে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে দেখিয়াছি যে, সেই দেশের মানুষের হাতে নগদ অর্থ তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে ক্রয়ক্ষমতা যাহাতে নষ্ট না হয়। অর্থনৈতিক পরিভাষায় এই পদক্ষেপগুলিকে বলা হয়—ফিসক্যাল স্টিমুলাস। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০-২০২১ সালে সরকার হইতে প্রতিটি করদাতাকে ‘স্টিমুলাস চেক’-এর মাধ্যমে ৩ হাজার ৭০০ ডলার করিয়া সরাসরি দেওয়া হইয়াছিল; কিন্তু ইহাতে অর্থশাস্ত্রের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ‘মনিটরি স্টিমুলাস’—অর্থাৎ সুদের হার ক্রমশ বাড়িয়া যাইতে থাকে। এই জন্য আমরা দেখিয়াছি গত মার্চ হইতে আমেরিকায় পাঁচ বার সুদের হার বৃদ্ধি করা হইয়াছে।

সুতরাং সমগ্র বিশ্বেরই পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। এই অবস্থায় সমস্যা লইয়া আমরা আলাপ করিব, অবশ্যই অভিযোগ করিব; কিন্তু ইহার পাশাপাশি নিজের কাছে মনে মনে জিজ্ঞাসা করিব—আমি যদি দায়িত্বে থাকিতাম তাহা হইলে কী করিতে পারিতাম? বিষয়টি স্ব স্ব অবস্থান হইতে চিন্তা করিতে হইবে।  

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন