সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করিতে হইবে 

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২২, ০১:১০

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন গত শনিবার সিলেট নগরীর মীরের ময়দানে মেট্রোপলিটন পুলিশের নবনির্মিত ছয়তলা ব্যারাক ভবনের উদ্বোধন করিয়াছেন। পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদানের কথা আমরা বহু দিন ধরিয়াই বলিয়া আসিতেছি। যেই সকল পুলিশ ব্যারাকে থাকেন, তাহাদের সীমাহীন কষ্টের কথা কাহারো অজানা নহে। এই ধরনের আধুনিক ব্যারাক ভবন নির্মাণের মাধ্যমে তাহাদের কষ্ট কিছুটা লাঘব হইবে বলিয়া আমরা মনে করি। সিলেটের সেই অনুষ্ঠানে আইজিপি সাহেব সন্ত্রাসী-অপরাধীদের বিরুদ্ধে সকল সময় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের কথা পুনর্ব্যক্ত করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, কেহ যদি নির্বাচনের সময় বা যে কোনো সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করিয়া থাকেন, তাহা হইলে তাহার বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তাহাই নিবে বাংলাদেশ পুলিশ। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানও অব্যাহত থাকিবে বলিয়া তিনি ঘোষণা করিয়াছেন।

বর্তমান আইজিপি অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ অফিসার। কিন্তু দেশে কেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি লইয়া প্রশ্ন উঠিবে? সমস্যাটা কোথায়? আসলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়, বিশেষত জেলা-উপজেলা পর্যায়ে থানার ভূমিকা কতটা কার্যকর তাহা লইয়া পরীক্ষানিরীক্ষা করা প্রয়োজন। স্থানীয় তথা গ্রামগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাহারা কি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করিতে পারিতেছেন? প্রত্যন্ত থানাগুলিতেও একজন অফিসার্স-ইন-চার্জ বা ওসি ও ওসি-তদন্ত রহিয়াছেন। তাহাদের পাশাপাশি রহিয়াছেন একাধিক এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল। একটি থানায় বিভিন্ন পর্যায়ের ৪০-৫০ জন জনবল রহিয়াছে। তাহাদের সহযোগিতা প্রদান করিয়া থাকেন বিভিন্ন গোয়েন্দা বিভাগের লোকজনও। ফলে একটি থানার পুলিশ বাহিনী নিজ নিজ থানার খবরাখবর আমাদের চাইতে হাজার গুণ বেশি জানেন। সন্ত্রাসী বা অপরাধীদের ব্যাপারে তাহাদের নিকট অনেক গোপন তথ্যই থাকে। মাদক ব্যবহারকারী ও কারবারিদের গতিবিধিও তাহাদের নখদর্পণে। তাহা হইলে সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারি কীভাবে বহাল তবিয়তে রহিয়াছে? কাহারা তাহাদের প্রশ্রয় দিতেছে? ইহার জন্য থানা আসলে কতটা দায়ী বা দায়ী নহে, সেটা আইজিপি সাহেব তাহার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অনুযায়ী বিচার-বিশ্লেষণ করিয়া দেখিবেন বলিয়া আমরা আশা রাখি।

যদিও আমরা জানি, এই পরিস্থিতির জন্য আমাদের আধাসামন্তবাদী সমাজও কম দায়ী নহে। শিক্ষাদীক্ষার অভাবে থানাপুলিশ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে এখনো সচেতনতা আসে নাই। দূর হয় নাই আড়ষ্টতা। আর্থিক সংগতি না থাকিবার কারণেও মানুষ অনেক সময় থানামুখী হইতে চাহেন না। তথাকথিত প্রভাবশালীর চাপে থানা মামলা না নিলে যে জেলা বা কোর্টে যাওয়া যায়, এই সম্পর্কেও অনেকে বে-ওয়াকিবহাল। মোদ্দা কথা, মাদকের কারবার বা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ থানার অজ্ঞাতে হইতে পারে না। কিন্তু দেখা যায়, সকল অফিসার আইনের মধ্যে থাকিয়া অনেক সময় কাজ করিতে পারেন না। কেহ কেহ তাহাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেন, যাহা আইজিপি সাহেবের অজানা—এমনটি মনে করিবার কারণ নাই। আবার সকল কিছু তাহার নিয়ন্ত্রণে—এমনটিও আমরা বলিতে চাহি না। তাহাদের উপরমহলের নির্দেশনা মানিয়া চলিতে হয়। বিশেষত, যাহারা যখন ক্ষমতায় থাকেন, তাহারা যাহা বলিবেন, তাহাদের তাহাই করিতে হইবে। অন্যথায় তাহারা স্ট্যান্ড রিলিজ হইয়া যাইতে পারেন। এই সকল সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মনে রাখিতে হইবে, আইজিপি সাহেব সরকারের অতীব নিকটের লোক। কিন্তু তাহার বাহিনী চাহিলে তাহাদের ফাঁক দিয়া কোনো অপরাধী কি বাহির হইতে পারে? পুলিশ বাহিনীতে সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষ কতখানি আন্তরিক—এই প্রশ্নও তোলা যাইতে পারে। তাহাদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ ব্যতীত এই বাহিনীর সকলকে কি শৃঙ্খলার মধ্যে আনয়ন করা সম্ভব? উপজেলা, ইউনিয়ন কিংবা থানা পর্যায়ের পুলিশ যাহাতে যথাযথ নিয়ম মানিয়া দায়িত্ব পালন করিতে পারে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন