গত মাসে আমি ইউরোপের কয়েকটি দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি রাজ্য সফর করেছি। উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ববাজারের সার্বিক অবস্থার কিছুটা পর্যবেক্ষণ। যেহেতু আমি তৈরি পোশাক খাতে ব্যবসায় করি, সেজন্য এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারের বর্তমান অবস্থা সরজমিনে পর্যবেক্ষণ করা এবং স্বভাবসুলভভাবে নতুন ক্রেতার অনুসন্ধান। বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ আবার ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্র আবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ছিল আমার গন্তব্য। যাত্রাপথে নানা মানুষের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে এবার যে উদ্বেগ লক্ষ করেছি—অতীতের কোনো সময়েই তা দেখিনি। কী হবে, কী হচ্ছে—এমন জিজ্ঞাসা ছিল সবার চোখেমুখে। কী এক অজানা আশঙ্কা সবার মধ্যে বিরাজমান।
বাংলাদেশের অনেক উদ্যোক্তা, বিশেষ করে রপ্তানিকারকরা সারা বছরই কোনো না কোনো সময় বিদেশ ভ্রমণে থাকেন। এবার জার্মানির ফ্রাংকফুর্ট থেকে লুফথানসা এয়ারলাইনসে নিউ ইয়র্কের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। পথিমধ্যে বাংলাদেশের আরেক জন ব্যবসায়ীর সঙ্গে দেখা হয়। তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি করেন। কথায় কথায় তিনি তার কারখানার অবস্থার কথা জানালেন। এক ফাঁকে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে তার কারখানার অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন চালাতে গিয়ে তাকে রীতিমতো গলদগর্ম হতে হচ্ছে। এক মাসে ২২২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না তার কারখানায়। এই হিসাব শুধু উৎপাদনকালে। অর্থাৎ তার কারখানায় সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত উৎপাদন চলে। এ সময়ে ২২২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় তাকে ডিজেল চালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এজন্য তাকে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ করতে হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকার মতো। এই হলো এখন আমাদের দেশের অধিকাংশ কারখানার চিত্র। একদিকে আমদানিকারক দেশগুলোতে মন্দার কারণে আমাদের পণ্যের চাহিদা এবং অর্ডার কমছে। অন্যদিকে জ্বালানিসংকটের কারণে কারখানাগুলো ধুঁকছে।
আমাদের একসময় বলা হতো বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে। শতভাগ বিদ্যুৎ দেওয়ার কথাও আমরা শুনেছি। কিন্তু হঠাৎ এমন কী হয়ে গেল যে, আমরা হঠাত্ করে এই দুটি অত্যাবশ্যকীয় সেবার অভাবে পড়লাম। প্রথমে কারখানার জন্য বিদ্যুৎ রেশনিং করা হলো, আবার সে রেশনিংয়ের ওপর লোডশেডিং দেওয়া হলো। পাইপলাইন থেকে গ্যাস উধাও হয়ে গেল। অবশ্য সারা বিশ্বে এখন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের সংকটটা একেবারেই অনভিপ্রেত।
তবে আমাদের দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের যে সংকট বিরাজমান, তা অনেকটা কমিয়ে আনা যায়। এক্ষেত্রে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা অপরিহার্য। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে অপচয়ের পরিমাণ কী? এই দুটি খাতে অবৈধ সংযোগের সংখ্যাই-বা কত? সাধারণ মানুষ এর হিসাব বের করতে না পারলেও বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের নীতিনির্ধারকরা তা কিন্তু ভালোই জানেন। একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টা পরিষ্কার হবে। কিছুদিন আগে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে অবৈধ গ্যাস-সংযোগ উদ্ঘাটনে অভিযান চালিয়েছে। সেখানে যে অনিয়ম বা অবৈধ লাইন আমরা দেখতে পেয়েছি তা চোখ কপালে ওঠার মতো। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে রীতিমতো ২৪ দিন এই এলাকার গ্যাসলাইন বন্ধ রাখতে হয়েছিল। শেষমেশ যা দেখা গেল তাতে চিত্র একেবারেই পরিষ্কার। তিতাস কর্তৃপক্ষ বলছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের চার বর্গকিলোমিটার জুড়ে কামরাঙ্গীরচর এলাকার অবস্থান। সেখানে তারা মোট ৪৬ হাজার অবৈধ গ্যাস-সংযোগ পেয়েছে। তবে এ সংখ্যা ২ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে কর্তৃপক্ষের ধারণা। ২০২১ সালে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ গ্যাসের দাম বাড়ানোর যে প্রস্তাব দিয়েছিল, সেখানে তারা তিতাসের মোট সিস্টেম লসের হার ১৩ শতাংশ উল্লেখ করেছে। তবে সাধারণ মানুষের ধারণা যে, প্রকৃত সিস্টেম লস এর চেয়ে অনেক বেশি। শুধু রাজধানী ঢাকা শহর নয়, গ্যাসের অবৈধ সংযোগ দেশের সর্বত্র। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার এবং দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চল ও ঘনবসতি আবাসিক এলাকায় প্রচুর অবৈধ গ্যাস-সংযোগ রয়েছে। এসব অবৈধ সংযোগের কারণে বৈধ সংযোগগুলোতে গ্যাসের চাপ পাচ্ছে না। অবৈধ গ্যাস-সংযোগগুলো বন্ধ করা হলে গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হবে। এই অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে বর্তমান পরিস্থিতির ২৫-৩০ শতাংশ উন্নতি হবে বলে অনেকে মনে করেন। অথচ এই গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানাগুলো ধুঁকে ধুঁকে মরছে। দেশের শতভাগ কম্পোজিট নিট কারখানাগুলো উত্পাদনের জন্য গ্যাস জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল। স্পিনিং মিলগুলোও ক্যাপটিভ পাওয়ারের ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু খুবই অবাক করার বিষয় হচ্ছে সরকার প্রতিনিয়ত মিডিয়ার সামনে গ্যাস, বিদ্যুতের বিষয়ে নেতিবাচক ব্যাখ্যা দিয়ে আসছে অথচ অবৈধ গ্যাস/বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করে অবস্থার উন্নতি কল্পে কোনো ‘ক্রাশ’ প্রোগ্রাম নিতে দেখা যাচ্ছে না, যা দেশের সাধারণ মানুষকে হতাশ করছে।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এই মুহূর্তে দেশের একমাত্র সমস্যা হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া। এর প্রধান একটি উৎস হলো রপ্তানি খাত। যদি সত্যিকার অর্থে দেশকে সামনের এই কঠিন বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করতে হয়, তাহলে প্রয়োজনে চুলা বন্ধ করে হলেও শিল্প চালু রাখতে হবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিতে যত দেরি করব সমস্যা ততই ঘনীভূত হবে।
বাংলাদেশের গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে আরো অনেক কথা বলা যায়। তবে মোটা দাগে যে কথাটা বলা যায় তা হচ্ছে—গত কয়েক বছরে গ্যাসকূপ খননের তেমন কোনো উদ্যোগ লক্ষণীয় নয়। বিদেশি কোম্পানিগুলো বেশ কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্র ছেড়ে চলে গেছে। আমরা যদি নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস তুলে জাতীয় গ্রিডে না দিই, তাহলে শিল্পকারখানা ধুঁকতেই থাকবে। সেই লক্ষ্যে এখন থেকেই বাপেক্সকে শতভাগ যোগ্যতা সম্পন্ন করে নতুন পুরোনো সব গ্যাসক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত বোরিং অব্যাহত রাখতে হবে। তাহলে চলতে চলতে হয়তো কোনো একদিন নতুন কোনো দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। তবে এ কাজে বিদেশি কোনো কোম্পানিকে ব্যবহারের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। আর অবৈধ সংযোগগুলো বন্ধ করলে অবশ্যই বর্তমান পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হবে।
গ্যাসের পরিস্থিতির মতো বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও একই রকম। এ খাতে প্রচুর অবৈধ সংযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কর্তাব্যক্তিরা এ বিষয়ে আমাদের চেয়ে ভালো জানেন। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বিদ্যুতের কারণে শিল্পকারখানাগুলো যে কীভাবে ধুঁকছে তা বর্ণনা করার মতো নয়। সরকার প্রথমে এ খাতে রেশনিং প্রথা চালু করল। আমরা তখন চিন্তা করলাম, এটি একটি ভালো কাজ হয়েছে। কারণ দিনের কোন সময়টা বিদ্যুৎ থাকবে আর কোন সময়টা বিদ্যুৎ থাকবে না তা আমাদেরও জানা ছিল। কিন্তু সময় যেতে না যেতেই পরিস্থিতি পালটে গেল। এখন এ খাতে শুরু হয়েছে তীব্র লোডশেডিং। দিনের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। ঘন ঘন আসা-যাওয়ার কারণে শিল্পের যন্ত্রপাতির মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। একদিকে গ্যাস নেই, অন্যদিকে বিদ্যুৎ নেই। এর ফলে উদ্যোক্তারা বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছেন। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছেন উদ্যোক্তারা, যা বাস্তবে অপচয়। কিন্তু যাদের সামর্থ্য নেই তাদের অবস্থা একবার ভেবে দেখুন।
সিরাজগঞ্জ, পাবনা, আড়াইহাজার, রূপগঞ্জ, পলাশ, কালীবাড়ী, মাধবদী প্রভৃতি এলাকায় অনেক ছোট ছোট বস্ত্রকল রয়েছে। এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা তাঁতনির্ভর। এসব জায়গায় অবস্থিত কারখানাগুলোর অবস্থা ভয়াবহ। বিদ্যুৎ দিয়েই চলে কারখানাগুলো। অতিরিক্ত পুঁজির অভাবে তাদের জেনারেটর কেনা সম্ভব হয় না। তাদের অবস্থা যে কতটা করুণ তা ভাবা যায় না।
গ্যাসের মতো বিদ্যুৎ খাতের অবস্থাও একই। এখাতে অবৈধ সংযোগ বলি বা সিস্টেম লস বলি, তা দূর করতে পারলে শিল্পের কষ্ট অনেকটা লাঘব হয়। এমনিতে দেশের শিল্প খাত নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়া, আমদানিকারক দেশগুলোতে অব্যাহত মন্দা, ব্যাংকগুলোর পুঁজির স্বল্পতা, মার্কিন ডলারের মানের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতি প্রভৃতি কারণে একপ্রকার দিশেহারা অবস্থা। এ অবস্থাতে আমাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি। আর এ বিষয়টি কোনো উদ্যোক্তার হাতে নেই। সরকার ন্যায়সংগতভাবে একটু কঠোর হয়ে ‘অবৈধ গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংযোগগুলো’ অনতিবিলম্বে বিচ্ছিন্ন করে এই কঠিন সমস্যার অনেকটা সমাধান করতে পারে বলে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের বিশ্বাস।
লেখক : তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা ও সাবেক সহসভাপতি, বিজিএমইএ
