সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘কপ’-এর কাঁধে পৃথিবী রক্ষার মহাদায়িত্ব   

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২২, ০১:১০

পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনকে মোকাবিলা করিবার বিষয়টিকে এই ধরিত্রীর বুকে মানুষের বাঁচা-মরার সহিত তুলনা করা হইয়া থাকে। এই ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা একটি ব্যাপারে একমত যে, বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাস করিতেই হইবে। যদিও সৃষ্টির শুরু হইতে এখন অবধি পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটিয়াছে শতসহস্রবার। ইহা প্রকৃতির একটি নিরন্তর খেলা। বিজ্ঞানীরা ধারণা করিয়া থাকেন, এখন অবধি পাঁচ বার পৃথিবীতে প্রাণের মহাবিলুপ্তি ঘটিয়াছে। আমরা নুহ নবির (আ.) নৌকার কথা জানি, যখন পৃথিবীতে মহাপ্লাবন হইয়াছিল। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, পৃথিবীতে জলবায়ুর পরিবর্তনের জন্যই একেক সময় প্রাণের মহাবিলুপ্তি ও মহাপ্লাবনের মতো ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়াছিল; কিন্তু প্রায় ৩০০ বৎসর পূর্বে শুরু হওয়া শিল্পায়নের পর হইতে এখন অবধি পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রায় দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়িয়াছে। বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, জলবায়ুর পরিবর্তন পৃথিবীর স্বাভাবিক ঘটনা হইলেও উহা যত আস্তে-ধীরে হইবার কথা, বৈশ্বিক শিল্পায়নের কারণে তাহা হইতেছে অতি দ্রুত। আর ইহাই মানুষের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হইয়া উঠিতেছে বলিয়া মনে করেন বিশ্বের অধিকাংশ জলবায়ুবিষয়ক বিজ্ঞানী। 

এই ধরিত্রীকে রক্ষা করিতে প্রথম জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হইয়াছিল জার্মানির বার্লিনে, ১৯৯৫ সালে। এইবার মিশরের শারম-আল-শেখে গত রবিবার হইতে শুরু হইয়াছে ২৭তম জলবায়ু সম্মেলন, যাহার আনুষ্ঠানিক নাম কনফারেন্স অব পার্টিজ-২৭ বা কপ-২৭। সম্মেলনে অংশ লইতেছেন ১৯৮টি দেশের প্রায় ৩০ হাজার প্রতিনিধি। কপ সম্মেলনকে মনে করা হয় জলবায়ু পরিবর্তন লইয়া বৈশ্বিক পদক্ষেপ গ্রহণের একটি বাঁচা-মরার লড়াই। বিশ্বের যেই সকল দেশ জলবায়ু পরিবর্তনে সবচাইতে অধিক ঝুঁকিতে রহিয়াছে, বাংলাদেশ তাহাদের মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশে এখন দুর্যোগ অধিক হইতেছে, নদীভাঙন বাড়িতেছে, বেশি বেশি ঝড়, দীর্ঘমেয়াদি বন্যা হইতেছে। ইহার সহিত উত্তরবঙ্গে তৈরি হইতেছে মরু শুষ্কতা এবং দক্ষিণবঙ্গে বাড়িতেছে লবণাক্ততা। এই সকল কিছুই হইতেছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে; কিন্তু এই জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য যত কার্বন নিঃসারণ হয়, সেইখানে বাংলাদেশের মতো দেশগুলির দায় খুবই সামান্যই; কিন্তু ভোগান্তি অনেক বেশি। এই কারণেই সংকট মোকাবিলায় তহবিল বরাদ্দ ও তাহার ব্যয়ের উপর জোর দিতেছে ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহ। যদিও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ নামে যেই নূতন তহবিলের কথা আলোচনা হইতেছে, তাহা এই বত্সরও সম্মেলনের মূল আলোচ্যসূচিতে জায়গা পায় নাই। অন্যদিকে কার্বন নিঃসারণ কমাইবার যেই শর্ত—তাহা বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় অত্যন্ত কঠিন। অনেক বিজ্ঞানী বলিয়া থাকেন, প্রাক-শিল্পায়নের যুগ হইতে এখন অবধি প্রায় ৩০০ বৎসরের হিসাব দিয়া জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট সমীকরণ টানিবার সুযোগ নাই। কারণ পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। 

অন্যদিকে কার্বন নিঃসারণ কমাইবার শর্তের মধ্যে বৈষম্যও দেখিতে পাইতেছে উঠতি শিল্পোদ্যোগী দেশসমূহ। কারণ, যাহারা ইতিপূর্বে শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হইয়াছে, তাহারা এতকাল নির্বিচারে কার্বন নিঃসারণ করিয়াছে; কিন্তু যাহারা এখন শিল্প-কলকারখানার মাধ্যমে তাহাদের অর্থনীতিকে উন্নতির কাতারে লইয়া যাইতে শুরু করিয়াছে, তাহারা কেন এখন এত রকম শক্ত শর্ত মানিবে? এই প্রশ্ন উঠতি শিল্পোদ্যোগী দেশগুলি হইতে আসিতেছে। তবে জলবায়ুর যেই পরিবর্তন ঘটিতেছে এবং তাহা একটু দ্রুতই ঘটিতেছে—এই ব্যাপারে কাহারো দ্বিমত নাই। মনে রাখিতে হইবে, আমাদের একটাই প্ল্যানেট। ‘প্ল্যান-এ’ সফল না হইলে হয়তো ‘প্ল্যান-বি’ লইয়া ভাবা হয়; কিন্তু আমাদের যেইহেতু একটাই প্ল্যানেট, সুতরাং ‘প্ল্যানেট-বি’ বলিয়া কিছু নাই বিধায় পৃথিবীকে রক্ষা ব্যতীত আমাদের সামনে বিকল্পও কিছু নাই। একদিকে পৃথিবীকে রক্ষা করা এবং অন্যদিকে উঠতি অর্থনীতির দেশগুলিকে পিছু টানিয়া না ধরিবার যেই জটিল অবস্থা চলমান—তাহার যুক্তিযুক্ত একটি মীমাংসা করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। ‘কনফারেন্স অব পার্টিজ’-এর কাঁধে রহিয়াছে ইহা মীমাংসার মহাদায়িত্ব। তাহা পৃথিবীর রক্ষারও মহাদায়িত্ব বটে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন