বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ হিসাবায়নে নতুন পদ্ধতিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২২, ০০:৩০

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান দুটি খাত পণ্য রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আহরণ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার ফলে রিজার্ভের স্ফীতি নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল মানিটরি ফান্ড (আইএমএফ) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবায়ন পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি উত্থাপন করেছে। তারা অ্যাকচুয়াল ভিত্তিতে রিজার্ভ হিসাবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফের পরামর্শ নীতিগতভাবে মেনে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ হিসাবায়নে নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ফলে ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে। নতুন পদ্ধতিতে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ হিসাবায়ন করা হলে দেশের বর্তমানে রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নিচে নেমে আসবে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত রিজার্ভ হিসাবায়নের ক্ষেত্রে দুটি পদ্ধতি প্রয়োগ করে থাকে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে গ্রস রিজার্ভ এবং অন্যটি অ্যাকচুয়াল বা নিট রিজার্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রস রিজার্ভ হিসাবকালে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন প্রকল্পে রিজার্ভ থেকে যে ঋণ প্রদান করা হয়েছে, তাকে অন্তর্ভুক্ত করে। এবং সেই রিজার্ভই বাইরে প্রকাশ করে থাকে। অ্যাকচুয়াল বা নিট হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংক অভ্যন্তরীণভাবে সংরক্ষণ করলেও তা সাধারণত বাইরে প্রকাশ করে না। বাংলাদেশ সফররত আইএমএফ প্রতিনিধিদল আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হিসাবায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য পরামর্শ দিয়েছে। আইএমএফ প্রতিনিধিদল এমন সময় এই পরামর্শ দিলেন যখন বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ সহায়তা প্রদানের জন্য নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছেন। অ্যাকচুয়াল ভিত্তিতে রিজার্ভ হিসাবায়ন করা হলে মোট রিজার্ভের পরিমাণ অনেকটাই কমে যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রস রিজার্ভ হিসাবায়ন পদ্ধতিতে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি ছিল ২০২১ সালের আগস্ট মাসে—৪৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর পর থেকেই রিজার্ভের পরিমাণ ক্রমশ হ্রাস পেতে শুরু করে। পহেলা নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের গ্রস পরিমাণ ৩৫ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে আসে। চলতি সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) পাওনা বাবদ ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হবে। তাহলে রিজার্ভের পরিমাণ ৩৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে আসবে। আইএমএফের হিসাব মোতাবেক প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়াবে ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো। 

অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ যেভাবে হ্রাস পাচ্ছে, তা খুবই উদ্বেগজনক। আর এই পরিস্থিতির জন্য পণ্যরপ্তানি আয় তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি না পাওয়া, রেমিট্যান্স আয় কমে যাওয়া এবং আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধিই মূলত দায়ী। গত এক বছরে জনশক্তি খাতের প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসেনি। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশেই লেনদেন হয়েছে। এদিকে ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে রেমিট্যান্স আহরণের পরিমাণ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। যেমন :২০২১ সালের মে মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ২১৭ কোটি মার্কিন ডলার। এ বছর মে মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ১৮৮ কোটি ডলার। গত বছর জুন এবং এ বছর জুন মাসে রেমিট্যান্স এসেছে যথাক্রমে ১৯৪ কোটি ডলার ও ১৮৩ কোটি ডলার। গত এবং এ বছর জুলাই মাসে রেমিট্যান্স এসেছে যথাক্রমে ১৮৭ কোটি ডলার ও ২০৩ কোটি ডলার। গত বছর এবং এ বছর সেপ্টেম্বর মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ১৭২ কোটি ডলার ও ১৫৪ কোটি ডলার। আগের বছর এবং এ বছর অক্টোরব মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ১৬৪ কোটি ডলার ও ১৫২ কোটি ডলার। কোনোভাবেই রেমিট্যান্স আহরণকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ানো যাচ্ছে না। একটি বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বছরখানেক আগে বলেছিল, রেমিট্যান্স আগমনের এই ‘মধুচন্দ্রিমা’ বেশি দিন থাকবে না। তখন কর্তৃপক্ষীয় পর্যায় থেকে এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, গবেষণাপ্রতিষ্ঠানটির বক্তব্যই সঠিক ছিল। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেছেন, যেভাবে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ কমে যাচ্ছে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, একটি দেশের তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থাকলে তাকে স্বস্তিদায়ক বলা যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ যেভাবে কমছে, তাতে আর কিছুদিন পর তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো রিজার্ভ থাকবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। অনেকেই মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি ব্যয় যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না। কোনো কোনো পণ্য ২০০ ভাগ পর্যন্ত মূল্য বাড়িয়ে আমদানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আমদানি পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য সঠিকভাবে যাচাই না করার ফলেই এমনটি হচ্ছে। ফলে একশ্রেণির অসৎ এবং স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে দেশ থেকে মুদ্রা পাচার করছে। কীভাবে মুদ্রা পাচার করা হচ্ছে, তার একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। চলতি মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ, যা গত মুদ্রানীতির চেয়ে দশমিক ৭ শতাংশ কম। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। পরের মাসে তা ১৯ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের উচ্চ প্রবৃদ্ধির অর্থই হচ্ছে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়া এবং দেশে শিল্প-কলকারখানায় বর্ধিত বিনিয়োগ হওয়া অথবা নতুন কলকারখানা গড়ে ওঠে। কিন্তু উদ্যোক্তাগণ নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করছেন। এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। সেপ্টেম্বর মাসে পণ্য আমদানির জন্য এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার হার কমেছে ৩৩ শতাংশ। আর জুলাই-সেপ্টেম্ব সময়ে শিল্পের ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানির জন্য এলসি খোলার হার কমেছে ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। আগের বছর একই সময়ে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছিল ১৭৭ কোটি মার্কিন ডলার। আর এ বছর তা ৬০ দশমিক ৬৮ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে কাঁচামাল আমদানি কমেছে ১৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি কমেছে ১৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ। তার অর্থ হচ্ছে ব্যক্তি খাতে যে ব্যাংক ঋণ ছাড়করণ করা হচ্ছে, তা শিল্পে ব্যবহৃত না হয়ে অন্য কোনোখানে চলে যাচ্ছে। পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। রপ্তানিকারকগণ যে পণ্য বিদেশে রপ্তানি করছেন আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অনেকেই তার মূল্য কম দেখিয়ে রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশই বিদেশে রেখে দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিং এবং হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আসা বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ চরম সংকটের মধ্যে পতিত হবে। কোনোভাবেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। আমাদের দেশে জাতীয় নির্বাচনের আগের বছর দেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়ে যায়। যারা রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বা দুর্নীতির মাধ্যমে বিত্ত অর্জন করেন তারা জাতীয় নির্বাচনের আগে মুদ্রা স্থানান্তর করে থাকেন নিরাপত্তার স্বার্থে। আগামী জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জটিল এবং কঠিন নির্বাচন হবে বলে অনেকেই মনে করছেন। এই অবস্থায় অবৈধ অর্থ উপার্জকগণ তাদের অর্থ দেশে রাখবেন না, এটাই স্বাভাবিক। আর অর্থ পাচার করতে হলে তা মার্কিন ডলার বা অন্য কোনো বিদেশি মুদ্রার মাধ্যমেই তা করতে হবে। সেক্ষেত্রে রিজার্ভের ওপর চাপ পড়বেই।

আইএমএফের নির্দেশনা বা পরামর্শ মোতাবেক যদি অ্যাকচুয়াল পদ্ধতিতে রিজার্ভ হিসাবায়ন করা হয়, তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা সহজেই অনুমেয়। অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইভয়েসিং নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আগমন কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। পণ্য রপ্তানি করে যে অর্থোপার্জিত হয় তার ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারি এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিতে চলে যায়। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে এই খাতের মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু জনশক্তি রপ্তানি খাত থেকে যে অর্থোপার্জিত হয়, তার প্রায় পুরোটাই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করে। এছাড়া প্রায় সোয়া কোটি বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থান করছে, এটাই-বা কম কীসের? উল্লেখ্য, বৈদেশিক মুদ্রাকে ‘এক্সটার্নাল অ্যাসেট’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোনো দেশ বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের পতিত হলে আন্তর্জাতিকভাবে সেই দেশের মর্যাদা নষ্ট হয়। বিভিন্ন দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বৈদেশিক মুদ্রা সংকটে জর্জরিত দেশকে ঋণ দিতে চায় না। এমনকি তাদের গ্যারান্টিও গ্রহণ করতে চায় না। এটা একটি দেশের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক এবং লজ্জাকর।                    

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড ও অর্থনীতিবিষয়ক 

ইত্তেফাক/ইআ