জ্যৈষ্ঠের মৎস্যগন্ধা ডোবা থেকে গভীর তৃপ্তির পর ও উঠে আসে উৎকট মহিষ। অভূতপূর্ব সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেও কিন্তু একসময় মানবের চোখ বুজে আসে। আমি মোবাইল ফোনে সঞ্চিত ছবিগুলো মুগ্ধ চোখে দেখি কিন্তু একটি দেখেই আরেকটির জন্য আঙুল ছুটে যায়। আগেরটির কথা মনে থাকে না। মহা স্বাদের কাচ্চি তিন দিন একনাগাড়ে খাওয়া যায় না। কেন এমন হয়?
ছোটবেলা যখন শুনতাম, এক নদীতে নাকি দুই বার নাওয়া যায় না। তখন ভাবতাম, এটা ঠিক নয়। আব্বা তখন চাকরিসূত্রে জামালপুরে ছিলেন। আমাদের বাসার উলটো দিকে পাবলিক লাইব্রেরির পেছনে শুকনো ব্রহ্মপুত্র নদী ছিল। দুপুরে খাবার পর বাঁধানো ঘাটে বসে দেখতাম একটা লোক রোজ গায়ে লাইফবয় সাবান দিয়ে একটা নির্ধারিত জায়গায় জলে নেমে গামছা দিয়ে গা ঘষত। রোজ একই জায়গায়। আর আমি নিজে ইচ্ছে করেই ঘাটের একই জায়গায় ডুব দিয়ে লীলাকে বলতাম, দেখলি, একই নদীতে দুবার কেন বহু বার ডোবা যায়। খামোখা! কথাটার অর্থ অনেক পরে বুঝেছি। ব্যাপারটা হলো এই যে, আমি জলে নামামাত্র জল সরে গেছে, সে জল আবার হয়তো বয়েও গেছে অন্যত্র। ঐ নদী বদলে গেছে পরদিন সেখানে আগের জল আটকে রাখতে পারেনি। এক দিন আগে তাতে যে রোদ পড়েছিল এক দিন পর তা ছিল না। আর তারপর দিন তো বৃষ্টিই ছিল। এক কণা পালটে গেলেও তাহলে সে আর এক নদী তো আর থাকল না।
আমরা যেদিন জন্মদিন পালন করি সেদিন আসলে কোনো দিনই ফিরে আসে না। কোনো কিছুই এক থাকে না। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু লাইজুর বাড়ি লৌহজেং যেমন একটি খাল ছিল। এখানে লন্ডনে আমাদের বাড়ির কাছাকাছি কোনো নদী নেই, কিন্তু সেরকম একটি খাল আছে। আমি আর সেলিম (আমার জীবনসঙ্গী ড. সেলিম জাহান) শ্বাস নেওয়ার জন্য প্রায়ই হেঁটে হেঁটে সে বো-ক্রিকের পাড়ে যাই। সেখানে আমস্টারডামের মতো ভেসে যায় কত মানুষের নৌকাবাড়ি। দেখি ঐটুকু নৌকোরই মাথার ওপরে আছে তাদের হার্ব বাগান, গুটানো সাইকেল, পাটাতনে লোমশ কুকুর। বোটের ভেতর থেকে ফিশ অ্যান্ড চিপস-এর গন্ধ ভেসে আসে। আমি তাদের দেখি আর ভাবি, ওদের কি জলে ভাসা পদ্মের জীবন রেখে ডাঙায় বাস করতে ইচ্ছে করে না? আমারও কিন্তু তাদের মতো বা রবীন্দ্রনাথের মতো বোটে করে ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করে। আসলে মানুষের কোনো কিছুতেই শান্তি নেই। তৃপ্তি নেই। একটার পর আরেকটি কিছু তার চাই-ই চাই।
অত্যধিক মানুষের অতি ক্ষুদ্র একটি দেশ বাংলাদেশ। এখানে অধিকাংশ মানুষের পা রাখার জায়গাই নেই। তাই দুর্নীতি, হানাহানি অন্যের সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য এত লাফালাফি। জমির দাম হয়ে গেছে সোনার মতো। পারিবারিক জমিন পেয়ে ডেভেলপারদের দিয়ে ডজন ডজন ফ্ল্যাট বানিয়ে ভাগবাঁটোয়ারা করেও অনেকে অকস্মাৎ অর্থবান হয়ে গেছেন। নিজেদের কোনো কাজ করতে হয় না। মাস শেষে তাদের ব্যাংক ভরে যায়। এরা ইলিশ কেনে হালি করে। শপিং করেন পিংক সিটিতে। কোরবানি দেন কোটি টাকার পশু।
এদিকে চাষের জমি ভাগ হতে হতে তা তস্য এক টুকরো লেগো হয়ে গেছে। ওখানে ট্রাক্টর কেন, গরুর মাথাও ঘোরানো যায় না। তাই চলছে আইল নিয়ে মারামারি। কার আইলে কে শিম লতা তুলে দিয়েছে, সেটাও বিষয়। কার আইল চ্যাপটা, কারোটা বেঁকে গেছে, কারটা ছুটে গেছে এসবই এখন আসল ব্যাপার! আমাদের নেতা-নেত্রীরা লিপ্ত তাদের দমনমুখী রাজনীতি, সমাজনীতি, কৃষ্টি ও কলাকৈবল্যনীতি, বুদ্ধিনীতি, দুর্নীতি এসবের মালিকানা নিয়ে। এরও যে শেষ আছে তা তারা মনে রাখেন না। কথা হলো, মানুষের ভাবনা ও উপলব্ধি সমান কথা নয়। যারা ভোগ করে তারা ‘ভাবে’, কিন্তু ‘উপলব্ধি’ করে না। যারা উপলব্ধি করে তাদের হাতে কোনো ক্ষমতাই নেই। এ পর্যায়ে এসেই শুরু হয়েছে নানান অজুহাতে মূল মালিক তাড়ানো। অনুপস্থিত মালিক হলে আর কথাই নাই। সাংঘাতিকভাবে গত দেড় বা দুই দশক ধরে বাংলাদেশে অন্যের স্বত্ব দখলের কাজ চলছে একদম নির্বিঘ্নে। আমাদের চার ভাইবোনদের মোহাম্মদপুর হাউজিং সোসাইটিতে পাঁচ কাঠার প্লট ছিল। সেখানে নকল কাগজপত্র বানিয়ে তা বিক্রিবাট্টা করে সুরম্য চারতলা দালান তুলে তা ভাড়াও দেওয়া হয়ে গেছে। এদিকে আমরা চার জন প্রচুর কিস্তি শোধ করেছি। এখন আমরা অর্থ দান বন্ধ করেছি। দেনদরবার বাদ দিয়েছি। ধরেই নিয়েছি, যা দিয়েছি তা আর ফেরত পাব না এবং এমনকি দখলও পাব না। ধুরন্দর সেই সোসাইটি বলে, মামলা করুন আমরা সঙ্গে আছি আর বকেয়া শোধ করুন। আরো? জি না। থাক ভিক্ষে, ভাই রে কুকুরটাই সামলে রাখ। তাই দেশে আমার ও আমাদের নিজস্ব কোনো জমি বা বাড়ি নেই। কিছু নেই।
দেশ তো নদী নয়। দেশ বদলায় না। আমার তাতে বারবার অবগাহন করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তার কোনো উপায় রাখেনি দুর্বৃত্তরা।
লেখক :লন্ডন প্রবাসী সাহিত্যিক
