সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিশ্বাস ও আস্থার পুনর্বহাল অত্যন্ত জরুরি

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২২, ০১:১০

বিশ্বাস ও আস্থা। ছোট্ট এই দুইটি শব্দের গুরুভার আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে বিপুল ও বিশাল। বিশ্বাসের ব্যাপারে জন মিল্টন যেমন বলিয়াছেন—বিশ্বাস জীবনকে গতিময় করে আর অবিশ্বাস জীবনকে করিয়া তোলে দুর্বিষহ। প্রকৃত অর্থে, ‘বিশ্বাস’ করিতে পারি বলিয়াই আমরা এক পায়ের উপর ভরসা করিয়া অন্য পা সামনের দিকে বাড়াইয়া দিতে পারি; কিন্তু আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক জীবন হইতে যদি বিশ্বাসের আয়নায় চিড় ধরে, তাহা হইলে সেইখানে ডাবল প্রতিবিম্ব তৈরি হইয়া যায়। আসলে বিশ্বাস করা সহজ; কিন্তু কাহাকে বিশ্বাস করা যায়, তাহা বুঝা কঠিন। আর বিশ্বাসে যদি কেহ অমর্যাদা করে, তাহা হইলে তিনি হইয়া পড়েন মোচড়ানো সাদা মসৃণ কাগজ—যাহাকে কোনোভাবেই আর সোজা সুন্দররূপে ফিরাইয়া আনা সম্ভব হয় না। আব্রাহাম লিংকন যেমন বলিয়াছেন, যে-কাউকে বিশ্বাস করা বিপজ্জনক; কিন্তু সকলকে ‘অবিশ্বাস’ করা আরো অধিক বিপজ্জনক। আমরা কি সেই ‘অবিশ্বাস্য’ বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে প্রবেশ করিতে যাইতেছি? এই গৌরচন্দ্রিকার মূলে রহিয়াছে দেশে দেশে ভোটের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের অভাব। 

আমরা দেখিতে পাইতেছি, বিশ্বের অধিকাংশ জনপদের মানুষের ভোটের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস হ্রাস পাইতেছে। নেতা বা তাহাদের প্রতিনিধিদের প্রতি আস্থা কমিতেছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু দেশে অনেক ভোটারের ভোটকেন্দ্রে যাইবারই সাহস থাকে না। এই ধরনের ভোটারের ভয় থাকে যে, বিপক্ষের লোকেরা তাহাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করিতে পারে; কিন্তু প্রশ্ন হইল—বিপক্ষের লোকেরা কতজনকে মারিবে? ইহা তো ভাবিয়া দেখেন না ভীতু ভোটারের দল! তাহারা তো এক জন, দুই জন নহে—বিপুল তাহাদের সংখ্যা। এইখানেও তাহাদের নিজেদের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থার সংকট দেখা যায়। আর তাহাতে যাহা ঘটে, সেই ঘটনায় ভোটের প্রতি বিশ্বাস আর আস্থা কমিয়া যায়। আর এই অবস্থা বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই কমবেশি দৃশ্যমান। এখন উন্নত বিশ্বেও ভোটের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হইয়া যাইতেছে। এই যদি অবস্থা হয়, তাহা হইলে এই বিশ্বে কী করিয়া গণতন্ত্র টিকিবে? গণতন্ত্রকে বলা হয় বিশ্বের সবচাইতে গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোসেফ সুম্পিটার ১৯৪৬ সালে তাহার ‘ক্যাপিটালিজম, সোশ্যালিজম অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ গ্রন্থে বলিয়াছেন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হইতেছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, যেইখানে জনগণের ভোট পাইবার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা লাভ করে। গণতন্ত্রের তিনটি উপাদানকে মৌলিক বা বুনিয়াদি বলিয়া বিবেচনা করা হয়—তাহার মধ্যে প্রথমটি হইল—সর্বজনীন ভোটাধিকার। ইহার পরে রহিয়াছে অবাধ, প্রতিযোগিতামূলক, বহুদলীয় নির্বাচন। এখন আমরা উন্নত বিশ্বেও দেখি ভোট লইয়া নানান ধরনের মেকানিজম করা হয়, মিথ্যাচার করা হয়। মিথ্যায় মিথ্যায় সয়লাব করা হয় জনগণের মনোজগৎ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যাহারা নির্বাচিত হইয়া আসেন, তাহাদের কার্যক্রম অবশ্যই নিয়মতান্ত্রিক হইতে হইবে; কিন্তু তাহা কতখানি ব্যত্যয় হইতেছে—ইহার দৃষ্টান্তের শেষ নাই। মিথ্যাশ্রয়ী নেতারা আদৌ শাস্তি পান না। দেখা যাইতেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মিথ্যার মেকানিজম করা নেতারা বহাল তবিয়তেই থাকিয়া যাইতেছে। সার্বিকভাবে নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার ক্রমেই অবনতির কারণে মানুষ নির্বাচন ও গণতন্ত্র লইয়া সংশয়ের মধ্যে পড়িয়া যাইতেছে।

কিন্তু এইভাবে আর কতদিন। সকল কিছুরই একধরনের ইলাস্টিসিটি থাকে—অধিক টানিলে উহা ছিঁড়িয়া পড়িতে বাধ্য। সুতরাং এই সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাকে যদি বিশ্বাসযোগ্য করা না হয়, তাহা হইলে অবশ্যই একটি সময় আসিয়া নৈরাজ্য দেখা দিবে। এখন যাহা ঘটিতেছে, যেইভাবে আস্থাহীনতা ও বিশ্বাসহীনতার পরম্পরা চলিতেছে—তাহা এইভাবে চলিতে থাকিলে একটি সময় আসিয়া প্রবল ঝড় সৃষ্টি করিবে, জন্ম দিবে নূতন বিপ্লবের। সুতরাং সময় থাকিতে বিশ্বাস ও আস্থার পুনর্বহাল অত্যন্ত জরুরি।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন