অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ এশিয়ান নেশনসের (আসিয়ান) শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে কম্বোডিয়ার রাজধানী নম পেনে অবস্থান করছি। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বিগত তিন বছর আসিয়ান-বিষয়ক শীর্ষ বৈঠকে বসা সম্ভব হয়নি। সে অর্থে দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে পুনরায় এক জায়গায় জড়ো হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন আসিয়ান নেতারা। জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চলতি বছর মার্চের পর দ্বিতীয়বার কম্বোডিয়া সফর করতে পেরে এবং আসিয়ানের শীর্ষ বৈঠকে যোগ দিতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত এবং অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় যুক্ত হতে পারার সুযোগ পেয়ে চরম উচ্ছ্বসিত আমি।
বলা বাহুল্য, আসিয়ান চেয়ার কম্বোডিয়ার মহৎ ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কারণেই এই বছর শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সামদেচ আক্কা মোহা সেনা পাদেই টেকো হুন সেনের নেতৃত্বে কম্বোডিয়া শুধু আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গেই নয়, এতদাঞ্চলের বাইরের সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গেও সহযোগিতা ও সমন্বয় সাধন করেছে, যা আসিয়ান চেয়ার হিসেবে দেশটির জন্য গৌরব বয়ে এনেছে। উল্লেখ করার মতো বিষয়, অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর নেতাদের একত্রিত করার জন্য কম্বোডিয়া এমন একটি ক্ষেত্র, ফোরাম সৃষ্টি করেছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করার কাজকে দেশগুলোর জন্য সহজ করে তুলেছে।
আসিয়ান চেয়ার হিসেবে মিয়ানমারের ক্রমবর্ধমান নাজুক পরিস্থিতি এবং প্রতিকূল হয়ে ওঠা বেশ কিছু ইস্যু সমাধানের বিষয়ে দৃষ্টি রেখেছে কম্বোডিয়া, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির এই অগ্রণী ভূমিকার জন্য আমি প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাই। একই সঙ্গে কম্বোডিয়ান সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ কম্বোডিয়ার আপামর জনগণের বিবেচনার প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।
আগামী বছর জাপান এবং কম্বোডিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৭০তম বার্ষিকী সামনে রেখে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক যে কোনো পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করছে জাপান। পাশাপাশি আগামী দিনগুলোতে কম্বোডিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা এবং অংশীদারত্ব আরো জোরদার করার ব্যাপারে জাপান সংকল্পবদ্ধ। শুধু জাপান এবং কম্বোডিয়ার জন্যই নয়, জাপান এবং আসিয়ানের জন্যও আগামী বছরগুলো গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠবে বলে জাপান বিশ্বাস করে। এ কথা সর্বজনবিদিত, জাপান হলো আসিয়ানের প্রাচীনতম বন্ধু। এই ধারাবাহিকতায় আগামী বছর আসিয়ান-জাপান বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ৫০তম বছর তথা সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করব আমরা। এ সংবাদ পরমানন্দের।
আমি যখন বিগত অর্ধশতাব্দীর সহযোগিতামূলক পথচলার ইতিহাসের দিকে তাকাই, তখন এই সময়কালে আসিয়ান দেশগুলোর হাত ধরে অর্জিত উন্নয়নের জন্য প্রশংসা না করে পারি না। আমি গর্বিত এই কারণে যে, উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রশ্নে আসিয়ানের সঙ্গে জাপান পা মিলিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বিশেষ করে, আসিয়ানের একটি উদ্যোগকে জাপান শুরু থেকেই সাধুবাদ জানিয়ে আসছে—সংযুক্তি কর্মসূচি। আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে যেসব দেশ স্বল্পোন্নত, সেসব দেশের তরুণ কূটনীতিক এবং সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়াই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। সন্তোষজনক বিষয় হলো, এই কর্মসূচির অধীনে বহু স্নাতক বর্তমানে নিজ নিজ সরকারে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে। এই চিত্র বেশ উত্সাহজনক।
আসিয়ান দেশগুলোর অভূতপূর্ব উন্নয়ন আজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান। ধারাবাহিক উন্নয়নের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল প্রায় ৩৫ শতাংশ অগ্রগতি সাধন করেছে। ক্রমবর্ধমান বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে আসিয়ান অঞ্চল। ঐক্য ও কেন্দ্রীয় প্রয়াস ধরে রাখার মাধ্যমে এ অঞ্চল বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিকে সমুন্নত রাখার পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান বিশ্ব অর্থনীতির চালিকা শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আসিয়ান এবং জাপান সম্মিলিতভাবে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্বর্ণযুগ’ গড়ে তুলছে—এ নিয়েও ব্যাপক আলোচনা চলে।
দুর্ভাগ্যবশত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একটি অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি ইউক্রেনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিচ্ছে রাশিয়া, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মনে রাখতে হবে, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য।
পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার কমিয়ে আনার ব্যাপারে সব সময়ই আহ্বান জানিয়ে আসা হলেও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দিকে তাকালে আমরা দেখি, এ অঞ্চল এবং গোটা বিশ্ব আজ বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। যেমন—উত্তর কোরিয়ার ব্যাপক পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রম। একতরফাভাবে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে স্থিতাবস্থা ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক জবরদস্তির পথে চলছে দেশটি। এই উদাহরণ দেখায়, আমরা এমন একটি পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে, যা আমাদেরকে ক্রমাগতভাবে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি আসিয়ান অঞ্চলের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সম্মিলিত অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ।
ইতিহাসের এই অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের যৌথভাবে কাজ করা উচিত। বিশেষ করে, আইনের শাসনের ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা রক্ষা করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি বজায় রাখা যেমন সহজ হবে, তেমনি ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক (এফওআইপি)’ গঠনের পথ সুগম হবে। জাপান প্রস্তাবিত এফওআইপি উদ্যোগ ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি কেড়েছে। এফওআইপির পক্ষে ব্যাপক সমর্থন এবং অনুমোদন পেয়েছে জাপান। আগামী দিনগুলোতে এফওআইপির প্রতি আসিয়ান দেশগুলোর অব্যাহত সহযোগিতা বিশেষভাবে কাম্য। উল্লেখ করা প্রয়োজন, আসিয়ান দেশগুলোর জন্য যে ‘আসিয়ান ইন্দো-প্যাসিফিক (এওআইপি)’ আউটলুক তৈরি করা হয়েছে, তার সঙ্গে এফওআইপি বেশ প্রাসঙ্গিক। বাস্তবিক অর্থে, উভয় উদ্যোগ একই ধরনের মৌলিক ধারণা নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। আর এ জন্য আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার পরিবেশ বজায় রাখা অতি জরুরি।
জাপান, আসিয়ানের সকল সদস্য এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বার্থে আসিয়ান দেশগুলোর প্রতি অব্যাহত সহযোগিতা জোরদারের ব্যাপারে জাপান বরাবরই বদ্ধকরিকর। বিশেষত, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক সহযোগিতা, মানসম্পন্ন অবকাঠামো বিনিয়োগের মাধ্যমে সংযোগ রক্ষা এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্য-সুরক্ষা নিশ্চিত, জলবায়ু পরিবর্তনসহ স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি ক্ষেত্রে সম্মিলিত সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করে এসডিসিতে (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য) অবদান রাখতে জাপান তার কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাবে। প্রতিরোধ ব্যবস্থা, দুর্যোগ হ্রাস; সর্বোপরি অর্থনৈতিক ফ্রন্টে আসিয়ান এবং জাপানের মধ্যে বিস্তৃত ক্ষেত্রগুলো আরো প্রসারিত করে অবারিত সহযোগিতাকে অধিকতর জোরদারের ব্যাপারে আমরা অতি আগ্রহী। যেমন—সাপ্লাই চেইনের প্রসারণ, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার ইত্যাদি উদ্যোগের মাধ্যমে সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, বিশেষ করে যার মধ্যে স্মার্ট সিটি উদ্যোগের ধারণা বিদ্যমান, করার মতো বিষয়গুলোতে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে চাই। মোটকথা, ডিজিটাল গার্ডেন সিটি গড়ে তোলার মতো দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি সব জাতির জন্য খাদ্য ও শক্তি নিরাপত্তা জোরদার করা আমাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় ওপরের দিকে রয়েছে।
আগস্ট মাসে আসিয়ান-জাপান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে আসিয়ান-জাপান বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন উপলক্ষ্যে অফিশিয়াল লোগো উন্মোচন করা হয়। একই সঙ্গে আসিয়ান এবং জাপান যৌথভাবে ‘গোল্ডেন ফ্রেন্ডশিপ, গোল্ডেন অপারচুনিটিস’ ক্যাচফ্রেজ (বিশেষ সম্পর্ককে নির্দেশ করতে ব্যবহৃত টাইটেল) ঘোষণা করে। এ ঘোষণা উভয়ের জন্য অত্যন্ত গৌরবের।
আসিয়ান-জাপান সম্পর্ক সর্বসাধারণ কর্তৃক সমর্থিত ও স্বীকৃত। বছরের পর বছর এই সম্পর্ক আস্তা ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে দ্যুতি ছড়িয়ে চলেছে। ঘোষিত ক্যাচফ্রেজ তারই ইঙ্গিত। সত্যিকার অর্থেই এই ক্যাচফ্রেজ ‘সোনালী’ সম্ভাবনায় পূর্ণ। ২০২৩ সাল হবে জাপান এবং আসিয়ান উভয়ের জন্যই যুগান্তকারী বছর। বছরটিতে আসিয়ান-জাপান মৈত্রী ও সহযোগিতার ৫০তম বছরকে বরণ করার পাশাপাশি জাপানে আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এই উপলক্ষ্যকে স্মরণে রেখে প্রধানমন্ত্রী হুন সেনসহ আসিয়ান দেশগুলোর নেতৃবৃন্দকে আমি আন্তরিকভাবে জাপানে স্বাগত জানাই এবং একই সঙ্গে আসিয়ান-জাপানের প্রতি ধারাবাহিক ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি অব্যাহত রাখার জন্য শীর্ষ সম্মেলনে আগত নেতৃবৃন্দের প্রতি আমার উদাত্ত আহ্বান।
লেখক : জাপানের প্রধানমন্ত্রী
খেমার টাইমস থেকে অনুবাদ : সুমৃত্ খান সুজন
