সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

খাদ্য অনিরাপদ হইলে জীবনও অনিরাপদ হইবে

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২২, ০২:২৬

আয়তনে বাংলাদেশ বিশ্বের ৯৪তম দেশ হইলেও জনসংখ্যায় অষ্টম। এই দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ২৬৫ জন মানুষ বসবাস করেন। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার ভিতর দিয়াই গত ৫১ বৎসরে উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের গড় আয়ুও তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রায় বৃদ্ধি পাইয়াছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টিকসই উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা রহিয়াছে। ইহার জন্য দক্ষ মানবসম্পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এই মানবসম্পদ গড়িতে প্রয়োজন সুস্থ দেহ। এই ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্যসুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের করা একটি গবেষণায় বাংলাদেশের একটি জেলায় চাষ করা জনপ্রিয় একটি সবজিতে ক্ষতিকর সিসা, ক্যাডমিয়াম ও নিকেলের উপস্থিতি পাওয়া গিয়াছে। 

মনে করা হইতেছে, সবজি উৎপাদন করিতে গিয়া সার, কীটনাশক বা বালাইনাশক ও পানির মতো যেই সকল উপাদান ব্যবহার করা হয়—তাহা হইতে ভারী ধাতু চলিয়া আসিয়াছে। ইতিপূর্বে নানান সময়ে মুরগি, মাছ, দুধ, হলুদের গুঁড়াতেও ক্ষতিকর ধাতবের উপস্থিতি পাওয়া গিয়াছিল। কিছু খাদ্যে মাত্রার চাইতে অধিক পারদ ও আর্সেনিক পাইবার বিষয়টি লইয়াও আলোচনা হইয়াছে। বিশেষজ্ঞরা বলিয়া থাকেন, মানবদেহের জন্য ভারী ধাতু সবচাইতে অধিক ক্ষতিকর। কারণ, সবজি সিদ্ধ করিলে বা পানিতে অনেক বার ধোয়ার পরও ভারী ধাতু থাকিয়া যায়। খাদ্য হইয়া তাহা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। ক্ষতিকর ভারী ধাতু শিশু ও গর্ভবতী নারীদের অধিক ক্ষতি করিয়া থাকে। ইহা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষতিকর ভারী ধাতু মানবদেহে ক্যানসার সৃষ্টির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখিতে পারে। 

শুধু বাংলাদেশে নহে, বিশ্ব জুড়িয়াই খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য লইয়া দুশ্চিন্তা তৈরি হইয়াছে। বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সকলের জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করিবার জন্য পরিকল্পনা করেছে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি পুষ্টিনিরাপত্তার সহিত অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্যনিরাপত্তা-সংক্রান্ত সরকারি নজরদারি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও নিয়মান্ত্রিক বলিয়া বিবেচনা করা হয়। ইহা কিন্তু রাতারাতি হয় নাই। ১৯০৫ সালে আপ্টন সিনক্লেয়ার নামের একজন লেখক প্রকাশ করেন ‘দ্য জাঙ্গাল’ নামের একটি গ্রন্থ। প্রকাশিত বইটি লেখা হইয়াছিল অভিবাসীদের লইয়া, যাহারা শিল্পাঞ্চলে বসবাস করিত। বইটির লেখক ছদ্মবেশ লইয়া শিকাগোর একটি মাংসের খামারে কর্মচারী হিসাবে কাজ করিয়া দেখিয়াছিলেন—সেইখানে অস্বাস্থ্যকর উপায়ে মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বিপণন করা হইতেছে। এই অভিজ্ঞতা হইতেই তিনি লিখেন ‘দ্য জাঙ্গাল’ বইটি। বইটি একসময় নজরে আসে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের। ইহার পরই রুজভেল্ট উদ্যোগ গ্রহণ করিয়া ‘পিওর ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাক্ট’ এবং ‘ফেডারেল মিট ইন্সপেকশন অ্যাক্ট’ পাশ করান। ইহার পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ খাদ্যের জন্য আলাদা কোনো আইন ছিল না। পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে যুক্ত হইয়াছে আরো নানান আইন। সর্বশেষ ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জমানায় নিরাপদ খাদ্যের জন্য আরেকটি আইন পাশ হয় ‘ফুড সেফটি অ্যান্ড মডার্নাইজেশন অ্যাক্ট’ নামে। এই আইনগুলির সঠিক প্রয়োগের কারণেই সেই দেশটিতে খাদ্য তুলনামূলক নিরাপদ।

মনে রাখিতে হইবে, একটি খাদ্য তখনই নিরাপদ হইবে যখন উহার উৎপাদন প্রক্রিয়া হইতে শুরু করিয়া, বিপণন, রান্না, পরিবেশন এবং খাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি পদে উহা নিরাপদ থাকিবে। স্পষ্টতই, অসাধু বা অসচেতন উৎপাদক বা ব্যবসায়ীদের কারসাজি ছাড়াও নানা কারণে খাদ্য দূষিত বা অনিরাপদ হইতে পারে। ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’ আমাদের দেশেও আছে; কিন্তু তাহার প্রয়োগ ও সচেতনতা সীমিত। এই জন্য আমাদের দেশে কৃষক তথা উৎপাদক, পরিবহন ও সংরক্ষণের সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রথমে সচেতন করিতে হইবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা যাইতে পারে। ইহার সহিত দরকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ।

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন